kalerkantho

ব্রেক্সিট নিয়ে কি আবার গণভোটের আয়োজন হবে

অনলাইন থেকে

১০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্রিটেনের লেবার ও টোরি (ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি) দুই পক্ষই দলীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের ওপরে স্থান দেয়। তাদের আচরণের কারণেই ব্রেক্সিট ক্রমেই জনগণের কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে একেবারে শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সময় আরো কিছুটা বাড়িয়ে দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যাতে করে আমরা ইইউ থেকে চুক্তি ছাড়াই বের হয়ে না যাই। কিন্তু আমরা আবারও সেই দুই সপ্তাহ আগের অবস্থানে গিয়েই দাঁড়িয়েছি। আগামী শুক্রবার সেই সময়ও শেষ হতে চলেছে। তার আগে আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা ইইউ হয়তো সময় আরো কিছুটা বাড়িয়ে দেবে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা পুরো দেশকে গ্রাস করেছে। দুই প্রধান দলেই বিভক্তি আর বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। বরাবরের মতো আমরা এবারও লক্ষ করছি, সংকট সামাল দিতে যথাযথ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব রয়েছে ব্রিটেনে।

বিশ্বাস করা কঠিন, ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের গণতন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাও সামনে চলে এসেছে। অচলাবস্থা নিরসনে সঠিক প্রস্তাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা।

ব্রেক্সিট হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ বাদ দিয়ে দলীয় ব্যবস্থাপনাকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখার কাহিনি। ব্রেক্সিট সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের মনোভাব শুরু থেকেই ছিল অনেকটা এমন যে কোনোভাবেই আর্টিক্যাল ৫০-কে অতিক্রম করা যাবে না। ইইউভুক্ত দেশগুলোর নাগরিক ও ব্রিটিশদের চলাচল এবং কাস্টমস ইউনিয়ন প্রসঙ্গে মে এই ধারাকে লক্ষণরেখা হিসেবে ধরে নিয়েছেন। ব্রেক্সিটের কারণে এমনিতেই জাতি বিভক্ত। মের এই অবস্থান বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এত দিন পার করার পর এখন এই বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে যে মের নিজ দলের মধ্যেও এমন বহু এমপি রয়েছেন, যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর আনা ব্রেক্সিট চুক্তির পরিবর্তে চুক্তি ছাড়াই ইইউ ছাড়তে রাজি আছেন। এ পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার পরই বিরোধী লেবার পার্টির সঙ্গে আলোচনায় বসতে সম্মত হন মে। তবে গত শুক্রবার সরকারপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর লেবার নেতারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ঘোষণায় কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব তাঁদের দেওয়া হয়নি। তাঁরা মনে করেন, ভবিষ্যতে বিলম্বের জন্য তাঁদের ওপর দোষ চাপানোর অভিসন্ধি থেকেই তাঁদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। 

লেবার পার্টিরও কৌশল নির্ধারণ করা হয় দলীয় স্বার্থকে মাথায় রেখে। দলীয় ভোটারদের অসন্তুষ্টি এড়াতে লেবার নেতা জেরেমি করবিন দীর্ঘদিন ব্রেক্সিট প্রসঙ্গে তাঁদের অবস্থান অস্পষ্ট করে রাখেন। লেবার পার্টি এত দিন এমন ভাব ধরে ছিল যেন চাইলেই তারা সব সুযোগ-সুবিধা ধরে রেখেই ব্রেক্সিট কার্যকর করার মতো ক্ষমতা রাখে। কিন্তু দলটি ব্রেক্সিট চুক্তির বিষয়ে নেতৃত্ব প্রদানকারী অবস্থান গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের ছায়া মন্ত্রিসভাও এ বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত।

একটি গণভোটের পক্ষে সমর্থন দেবে কি না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে লেবার পার্টির সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে টোরি পার্টির মধ্যেও এখন চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। লেবার পার্টিতে করবিনের হাতেই প্রায় সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। তিনি চাইলেই এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন। মের আনা চুক্তির ব্যাপারে লেবার এমপিদের রাজি করানোর ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁর শর্ত থাকতে পারে যে চুক্তিটি গণভোটের জন্য তুলতে হবে। দুই দল থেকেই এই গণভোটের ব্যাপারে সমর্থন পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নীতিগতভাবে লেবারের জন্য এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যথার্থ বলে প্রতীয়মান হতে পারে। ব্রেক্সিটের যে শর্তগুলো এখন আমাদের সামনে আসছে, ২০১৬ সালের জুন মাসে আমরা যখন ইইউ ছাড়ার প্রশ্নে গণভোটে অংশ নিই তখন সেগুলো ছিল না। প্রচারের সময় ভোটারদের বিভ্রান্ত করে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এখন ভোটারদের অনুমোদন ছাড়া নতুন শর্তে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করা ঠিক হবে না।

নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এগোনোর বিষয়টি লেবার দাবি করতেই পারে। তিন-চতুর্থাংশ লেবার ভোটার মনে করেন, ইইউ ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়ে ব্রিটেন ভুল করেছে। লেবার পার্টিকে দুটি বিষয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। হয় তারা গণভোটের দাবি জানাবে নয়তো একটি নমনীয় ব্রেক্সিটের সঙ্গে সমঝোতা করবে।

ইইউ আমাদের দীর্ঘ সময় দিলেও এই ঝুঁকি থেকে যায় যে আমরা সেই সময় আবারও নষ্ট করব। আগামী কয়েক মাস পর আমরা আবারও আজকের অবস্থানে এসেই উপস্থিত হব। দীর্ঘ সময় সব ক্ষেত্রেই ভালো ফল বয়ে আনে না। এমপিদের উচিত আরেকটি গণভোটের পক্ষে একাট্টা হওয়া। জনগণ যদি প্রত্যাহারের চুক্তির পক্ষে ভোট দেয়, তাহলেও ইউরোপের সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। পার্লামেন্টের উচিত জনগণের সঙ্গে একটি জাতীয় আলোচনার আয়োজন করা। সে আলোচনার ভিত্তিতেই ইইউর সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ করা হবে। ব্রেক্সিট নিয়ে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তা আমাদের রাজনীতির প্রতি জনসাধারণকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য