kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

বদলেছে সময় ভেনিজুয়েলায় চীনা সেনাদল

এম কে ভদ্রকুমার

৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বদলেছে সময় ভেনিজুয়েলায় চীনা সেনাদল

সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় সেনা মোতায়েন করেছে চীন। বিশ্ব-রাজনীতিতে এটি বড় একটি ঘটনা। বিদেশে সেনা মোতায়েনের অভিজ্ঞতা রয়েছে রাশিয়ার, কিন্তু চীনের নেই। ফলে ঘটনাটি চীনা পরিপ্রেক্ষিতে খুবই বিরল। আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় চীনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগক্ষেত্র জঙ্গিদের হুমকির মধ্যে রয়েছে। তার পরও চীন সেসব জায়গায় সেনা মোতায়েন করেছে, এমন খবর নেই।

প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চীনা সেনাদলের সদস্যসংখ্যা ১২০। ত্রাণসামগ্রী ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার জন্য গত ২৮ মার্চ ক্যারিবীয় সাগরে ভেনিজুয়েলার মার্গারিতা দ্বীপে পৌঁছায় তারা। ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করার পর দলটিকে ভেনিজুয়েলার একটি সামরিক স্থাপনায় নিয়ে যাওয়া হয়। ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ প্রত্যাশিত ঘটনা। তবে চীনা সেনা পাঠানোর খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঊন-উল্লিখিতই থেকেছে।

চীনা সেনাদের যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে সামরিক হেলিকপ্টার প্রশিক্ষণ স্থাপনা গড়ে তোলার জন্য ভেনিজুয়েলায় প্রায় ১০০ সেনা পাঠিয়েছে রাশিয়া। তবে চীনা গণমুক্তি ফৌজ (পিএলএ)-এর সামরিক মিশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। কূটনৈতিক তৎপরতায় মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় রয়েছে। ধারণা করা খুবই স্বাভাবিক, সেনা মোতায়েনের কাজটিও দুই দেশ সমন্বিতভাবেই করেছে।

ভেনিজুয়েলায় রাশিয়া ও চীন উভয়ের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের বিনিয়োগ রাশিয়ার বিনিয়োগের চেয়ে পরিমাণে অনেক বেশি। লসঅ্যাঞ্জেলেস টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত এক দশকে ভেনিজুয়েলাকে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে চীন, এর বেশির ভাগ তেল দিয়ে পরিশোধ করা হবে। আর গত কয়েক বছরে ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে ভেনিজুয়েলাকে ১৭ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে মস্কো। গত ডিসেম্বরে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ভেনিজুয়েলার তেল ও স্বর্ণ খাতে ছয় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে রাশিয়া। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া ও চীন ভেনিজুয়েলার মূল দুই ঋণদাতা। তাদের সহায়তায় টিকে আছে মাদুরো সরকার।

লসঅ্যাঞ্জেলেস টাইমসের অভিমত, ভেনিজুয়েলাকে দেওয়া বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির বিষয়ে চীন ও রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। চীন বেশি বাস্তববাদী আর রাশিয়া বেশি আদর্শবাদী। চীনের কাছে কাঁচামাল, তেল ও অন্যান্য সামগ্রী বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর রাশিয়ার কাছে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আমেরিকায়, যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে সামরিক অভিযান চালানোর উপযোগী সুদৃঢ় ঘাঁটি গড়ে তোলা যায়। ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগ ও সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন করতে চায় মস্কো। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো রাশিয়ার প্রতিবেশী অঞ্চলে বা সীমান্তে (অর্থাৎ সাবেক সোভিয়েত প্রভাববলয়ে) সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।

লক্ষণীয়, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর ব্যাপারে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া চীনের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বেশি কঠোর। চীন সংলাপ-সমঝোতার মাধ্যমে ভেনিজুয়েলা সংকটের সমাধানের কথা বলেছে। অনেক মার্কিন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, চীন মাদুরোর ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলতে পারে, তারা বরং ঋণের বিষয়টিতেই বেশি মনোযোগী থাকবে; এমনকি দর-কষাকষিতে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু মার্গারিতা দ্বীপে চীনা সেনার আকস্মিক অবতরণের পর এই বিশেষজ্ঞদের মুখ বন্ধ হওয়ার জোগাড়।

রুশ বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ধকারে কিল-ঘুষি ছুড়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর লাতিন মিত্ররা আশা করছে, ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে খুব দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশটিতে সরাসরি সামরিক অভিযানের দাবি জানানোর সাহস এদের কারোর নেই।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটনে শঙ্কা কাজ করছে—সামরিক অভিযানের উল্টো ফল হতে পারে; বিপত্তি দেখা দিতে পারে; ভেনিজুয়েলার জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরো একাট্টা হতে পারে এবং গোটা লাতিন আমেরিকায় এর প্রভাব পড়তে পারে। নিঃসন্দেহে ভেনিজুয়েলায় রুশ সেনার উপস্থিতি ওয়াশিংটনে স্নায়বিকার সৃষ্টি করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের প্রতিক্রিয়ায় তা স্পষ্ট। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য: সরকার পরিবর্তনের মার্কিন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। তাদের কথায় লাতিন ও ইউরোপের দেশগুলো অনির্বাচিত এক ব্যক্তিকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মেনে নিয়ে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কথা বলার যুক্তিও তাদের জন্য অবশিষ্ট নেই।

স্পষ্টতই রাশিয়ার দূরদৃষ্টি ও বলিষ্ঠ অবস্থান চীনকে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য উত্সাহিত করেছে। রাশিয়া (এবং কিউবা) চীনের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাবে। ভেনিজুয়েলায় কিউবা ও রাশিয়ার উপস্থিতি যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যন্ত্রণাদায়ক বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে চীনা সেনার উপস্থিতি হবে ‘তেতো বড়ি’। ট্রাম্প নিশ্চয় টের পেয়েছেন। সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে তিনি রুশ ও চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার বিষয়ে কথা বলার আভাস দিয়েছেন। বলা যায়, যুগান্তকারী এক সময়ে প্রবেশ করেছে গোটা বিশ্ব।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক প্রাবন্ধিক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য