kalerkantho

আস্থা ও শঙ্কার স্থানীয় নির্বাচন

ড. মো. আনিসুজ্জামান

৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আস্থা ও শঙ্কার স্থানীয় নির্বাচন

২৪ মার্চ নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোকসেদুর রহমান লেবু মোটরসাইকেল মার্কা নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। বিজয়ী চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দীর্ঘ। ছাত্রজীবনে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঠেলাগাড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন করেছেন। নালিতাবাড়ীর আন্দোলন-সংগ্রামে মোকসেদুর রহমান লেবু প্রথম ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নেতৃত্বে সৃষ্ট ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লেবু পরীক্ষিত সৈনিকের ভূমিকায় ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন এবারের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোশারফ হোসেন নৌকা মার্কা নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর অর্ধেকের কম ভোট পেয়েছেন।

নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থী তিনজন ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আওয়ামী লীগের তিনজনের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী পাস করেছেন। প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। হিংসাত্মক কাজকর্মের মধ্য দিয়ে আহত হয়েছেন অনেকে। কিন্তু ভোটের দিন ছিল শান্ত। নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোটারদের ওপর কোনো আক্রমণ হয়নি। অনেক উপজেলায় ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ দেখা যায়নি। উপস্থিতি কম ছিল। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন অনেকে।

নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের চিত্র প্রায় সারা দেশেই। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, খুন ইত্যাদির বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রায়ই। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ কমিয়ে আনার উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় টানা ১১ বছর। এই সময়ের মধ্যে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত কমেনি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকে কিন্তু সমন্বয় হয়। আমাদের আস্থার সংগঠন আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়হীনতা প্রবল।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। বড় বড় প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগব্যবস্থা ও জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের সফলতা প্রশংসার যোগ্য। যেকোনো দেশ এগিয়ে নেওয়ার জন্য সুসংগঠিত টিমওয়ার্কের প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি একটি টিম। বিপক্ষে রয়েছে বাংলাদেশবিরোধী শক্তি। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির টিম লিডার হলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধতা, নিঃস্বার্থপরতা এবং দেশ ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু এখন দলীয় সংঘাত ক্রমাগত বাড়ছে।

টিম লিডারের একার পক্ষে লড়াইয়ের ময়দানে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। পুরো টিমকেই কাজে লাগাতে হয়। টিমের মধ্যে বিরোধ, আত্মকলহ ও হিংসা থাকলে দলের বিপর্যয় হয়। কিন্তু দায়িত্ব পড়ে টিম লিডারের ওপর। শুধু মুখে টিম লিডারের গুণকীর্তন করে, প্রশংসা করে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখানো যায় না। দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রশমিত হলে লিডারের দক্ষতা প্রকাশ পায়।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা মাঝেমধ্যেই অনুপ্রবেশকারীদের কথা উচ্চারণ করেন। ছাত্রলীগের যে নেতার বয়স এখন ২০-২২ বছর তিনি কখনো আন্দোলন-সংগ্রাম করেননি। আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। রাজপথ তাঁর অজানা। তা ছাড়া অনুপ্রবেশকারী সুযোগসন্ধানীরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। টিম লিডারের দক্ষতা হলো দলের মধ্যে জঞ্জাল পরিষ্কার করা এবং দক্ষ ও যোগ্য নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা। সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে আরো দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করা।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশবিরোধী শক্তি শুধু বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে হত্যা করেনি। জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগের অংসখ্য নেতাকর্মী দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীর ওপর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির চরম নির্যাতন নেমে আসে। জীবন রক্ষার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন অনেকে। নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে এখনো বহু নেতাকর্মী বেঁচে আছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মুক্তি আন্দোলন পঁচাত্তরের (প্রতিরোধ যুদ্ধ) দিকে তাকালে নির্যাতনের তথ্য কিছুটা হলেও পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীর ত্যাগের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি টানা তৃতীয়বার সরকার গঠন করেছে। কিছুসংখ্যক সুবিধাবাদী ও নগদজীবীর কাজকর্মে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত লাগে। অতি উত্সাহী সুবিধাবাদী শ্রেণির কর্মকাণ্ড বিরোধীপক্ষ কখনো কখনো ক্যাশ করে।

বাংলাদেশবিরোধী শক্তি সমূলে উৎপাটিত হয়নি। তাদের শিকড় অনেক গভীরে। সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছে, যেকোনো সময় খোলস পাল্টে ছোবল মারবে। পঁচাত্তরের পর থেকে এই শক্তি পুষ্টি লাভ করেছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান তাদের অনেক দৃঢ়। শুধু স্লোগান দিয়ে, মানববন্ধন করে, পদযাত্রা করে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শক্ত। পকেট সংগঠনের দিবস পালনের মধ্য দিয়েও এদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশবিরোধী শক্তি উত্সাহিত হয়। বিরোধী শক্তি আদর্শিকভাবে শক্তি অর্জন করে।

বাংলাদেশবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে আদর্শিক ও তাত্ত্বিক দিক নিয়ে দাঁড়াতে হবে। আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হলে শুধু সরকারের ভাবমূর্তিই দুর্বল হবে না। সরকারি দলের ক্ষতি হবে এবং দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। আশঙ্কা থাকে দেশের এই অগ্রযাত্রা সরকারি দলের অতি উত্সাহীদের কর্মকাণ্ডে না বিপর্যয় ঘটে। আশার কথা হলো, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। দলকে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত করে ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসে উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার করছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে-বিদেশে সম্মানিত হচ্ছেন। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আশঙ্কার ঘন অন্ধকার ঠেলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। বাংলাদেশের অগ্রগতির তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো মুক্তিযুদ্ধ। আদর্শিক ভিত্তি হলো মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব আওয়ামী লীগেরই। একাত্তরের পর যেসব তরুণ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর জন্ম, তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু স্লোগান দিয়ে এটা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা দূর করতে হবে। হতাশাগ্রস্ত মানুষ কোনো কল্যাণকর কাজ করতে পারে না। এ ধরনের মানুষ নিজের জন্য কখনো কখনো বিপদ ডেকে আনে। অন্যকেও বিপদে ফেলে। আশাবাদী মানুষ ভালোর প্রতীক। দেশের মানুষকে আশঙ্কা থেকে মুক্ত করাও বর্তমান সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানির মধ্য দিয়ে আশঙ্কাই বৃদ্ধি পায়। স্থিতিশীলতা মানুষকে আশাবাদী করে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য