kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

রাজনীতিক্ষেত্রে নবচেতনা ও নতুন চরিত্রবল দরকার

আবুল কাসেম ফজলুল হক

৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাজনীতিক্ষেত্রে নবচেতনা ও নতুন চরিত্রবল দরকার

লেখকমাত্রই নির্জন অবস্থানে বসে লেখেন। তবু লেখকদের সংগঠনের প্রয়োজন সর্বস্বীকৃত। অনেক কাজ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সম্ভব হয় না, সাংগঠনিক প্রচেষ্টা দরকার হয়। কখনো কখনো চলমান সাহিত্য পরিস্থিতি ও সাহিত্যদৃষ্টির ধারায় পরিবর্তনের প্রয়োজন তীব্র হয়ে ওঠে। তখন দরকার হয় সাহিত্য লেখকদের সংগঠন ও আন্দোলন। সাংগঠনিক উদ্যোগ ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে নতুন চিন্তাধারা ও সাহিত্যদৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্ভব হয়।

তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লব ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপের পর দুনিয়াব্যাপী যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তাতে চিন্তার ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও দরকার যুগান্তকারী পরিবর্তন। প্রগতির পথে অগ্রগতির প্রচেষ্টা না থাকার এবং কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের নানা রকম বিভ্রান্তিকর প্রচার-প্রচারণার ফলে ইতিহাসের পশ্চাদ্গতি চলছে এবং পুরনো পরিত্যক্ত সব সংস্কার-বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন ঘটছে। এ অবস্থায় ইতিহাসের সম্মুখগতির জন্য দরকার প্রগতিপ্রয়াসী নতুন বৌদ্ধিক আন্দোলন ও সাহিত্য আন্দোলন।

বাংলাদেশে লেখক ও গবেষকদের বহু সংগঠন সক্রিয় আছে। সেগুলোর প্রতি আমার সহযোগিতার মনোভাব আছে। তবে যে বৌদ্ধিক আন্দোলন ও সাহিত্য আন্দোলন আজ দরকার, তার অভাব অনুভব করে আমি নতুন সংগঠন ও আন্দোলনের কথা বলছি। দেশের প্রগতিমনস্ক লেখকদের উদ্যোগে, অংশগ্রহণে ও সহযোগিতায় আন্দোলন এখন প্রগতিকামী লেখকদের কাছে সময়ের দাবি।

শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ এখন যে রূপ নিচ্ছে তার প্রতিকার শুধু বর্ণবৈষম্যবাদবিরোধী আন্দোলন দিয়ে হবে না; তার জন্য দুনিয়াব্যাপী অশ্বেতাঙ্গ সব জাতি ও জনগোষ্ঠীর আত্মশক্তি ও সামর্থ্য বৃদ্ধির উপযোগী চিন্তা ও কাজ দরকার। শ্বেতাঙ্গ বর্ণবৈষম্যবাদের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যরূপে আছে সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান রূপ হলো বিশ্বায়ন। দুর্বল জাতি ও রাষ্ট্রগুলোকে সভ্যতা ও প্রগতির দাবিতে চলমান বিশ্বব্যবস্থার ও সব জাতির রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান সভ্যতার প্রগতিশীল দিকগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে; আর তাদের উপনিবেশবাদী, ফ্যাসিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী নীতি পরিহার করে চলতে হবে। অশ্বেতাঙ্গদের মধ্যে নিজ রাষ্ট্র ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রে গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণের যে প্রবণতা দেখা যায়, চলমান বাস্তবতায় অশ্বেতাঙ্গদের জন্য তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের ভেতরে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের নীতিকে সফল করার জন্য বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্ষুদ্র সব জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে উন্নতি করতে হবে। তার জন্য বৃহৎ জনগোষ্ঠীগুলোর অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতি থেকে অনেক কিছু তাদের আত্মস্থ করা দরকার। তাদের চিরকাল আদিবাসী হয়ে থাকা এবং তাদের চিরকাল আদিবাসী করে রাখা তাদের জন্য এবং গোটা মানবজাতির জন্য অকল্যাণকর।

লেখকদের বিশ্বাস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠা করার এবং রক্ষা করার জন্য চিরসচেতনতা নিয়ে কাজ করতে হবে প্রগতিপ্রয়াসী লেখকদের। বুঝতে হবে যে প্রতিটি রাষ্ট্রের অপক্রিয়াশীলদের সঙ্গে যুক্ত আছে সাম্রাজ্যবাদী অপ্রক্রিয়াশীলরা। জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করতে হবে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে। গতানুগতিক নয়, চাই প্রগতি। যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসা-প্রতিহিংসা, জুলুম-জবরদস্তি ও শোষণ-পীড়ন-প্রতারণা নয়, চাই সভ্যতা—নতুন সভ্যতা।

তরুণ লেখকদের স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠার অফুরন্ত সুযোগ সৃষ্টি হবে নতুন সাহিত্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। চলমান ধারায় তরুণদের প্রগতিশীল চিন্তার ও কাজের সুযোগ কোথায়।

বাংলাদেশের জনগণের দেড় হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল সংগ্রাম, উনিশ শতকের রেনেসাঁস, বিশ শতকের গণজাগরণ, ব্রিটিশ শাসনবিরোধী সাম্প্রদায়িকতাবাদবিরোধী সংগ্রামী চেতনা, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশকে জনগণের রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার চিন্তা ও চেষ্টা অবলম্বন করে জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে প্রগতিপ্রয়াসীদের। ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় যে রেনেসাঁস দেখা দিয়েছিল, হিন্দু-মুসলমান বিরোধের অপঘাত সত্ত্বেও যে রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায় থেকেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন মহান সব লেখক, স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্য সেই রেনেসাঁসের ধারায় নেই। যে ধারায় চলছে আমাদের গবেষণা ও সাহিত্য, তাতে সৃষ্টির ও প্রগতির পথ অবরুদ্ধ। অপক্রিয়ার দুর্গ ভাঙতে হবে।

পৃথিবীর সব জাতির মনোজীবনের মতোই বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মনোজীবনেও রয়েছে চড়াই-উতরাই। বৌদ্ধযুগে-শীলভদ্র-দীপঙ্করের কালে, পাঠান-সুলতানদের শ্রীচৈতন্য-প্রচারিত ভাবধারায় ও বৈষ্ণব সাহিত্যে এবং ব্রিটিশ শাসিত বাংলার রেনেসাঁসে রয়েছে বাঙালির উন্নত চিন্তাচেতনার ও স্বপ্ন-কল্পনার পরিচয়। সেন রাজাদের কালে, মোগল শাসনকালে, আধুনিকতাবাদ (modernism) ও উত্তরাধুনিকতাবাদের কালে বাঙালির মনোজীবনে ও বাংলা সাহিত্যে দেখা যায় অবক্ষয়-চেতনার ও নিম্নগামিতার প্রকাশ। পৃথিবীর যেকোনো জাতির মধ্যযুগের সাহিত্যের সঙ্গে তুলনায় গেলে বৈষ্ণব জীবনী সাহিত্যে ও পদাবলিতে, মঙ্গলকাব্যে ও লোকসাহিত্যে রয়েছে অসাধারণ উন্নত চেতনার ও উৎকর্ষের পরিচয়। আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য থেকে প্রগতিশীল ভাবধারা গ্রহণ করে বাঙালি অসাধারণ উন্নত সাহিত্য এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান সৃষ্টি করেছে। সাহিত্যে মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরত্চন্দ্র, বেগম রোকেয়া, এস ওয়াজেদ আলী, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ প্রমুখের সৃষ্টি পৃথিবীর যেকোনো উন্নত জাতির সাহিত্যের সমতুল্য। রামমোহন, অক্ষয়কুমার, বিদ্যাসাগর, ত্রিবেদী, মোহাম্মদ লুত্ফর রহমান, কাজী আবদুল ওদুদ, আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রমুখের চিন্তাধারায় যে সৃষ্টিশীলতার পরিচয়, তা সামান্য নয়। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিজ্ঞানে যে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তা সর্বোচ্চ প্রশংসা দাবি করে। শিল্পকলায় রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, জয়নুল আবেদিন, শেখ মুহাম্মদ সুলতান যথার্থ বড় মহৎ শিল্পী। বাংলা ভাষার লেখকদের অত্যন্ত উন্নত সাহিত্যচিন্তা আছে। যাঁরা পৃথিবীতে লেখক ও শিল্পী, সৃষ্টি সম্পর্কে তাঁদের চিন্তাই সবচেয়ে মূল্যবান। অতীতের বৌদ্ধিক  (intellectual) ঐতিহ্য অবলম্বন করে নতুন সৃষ্টির দিকে এগিয়ে চলতে হবে নতুন কালের সৃষ্টিপিয়াসিদের। গতানুগতিকতা পরিহার করে তরুণরাই সৃষ্টি করবে প্রগতিশীল নতুন ধারা।

গবেষণা কী? সাহিত্য কী? সৃষ্টিশীলতা কী? প্রগতি কী? এসব প্রশ্নের উত্তর নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে নির্ধারণ করে নিতে হবে। সব ধারণাই বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের ও সাহিত্যের অগ্রগতির জন্য সমালোচনা অপরিহার্য। আধুনিক যুগে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যে সমালোচনার সমৃদ্ধিমান ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। পাকিস্তানকালে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যও সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে চলছিল। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ঢাকাকেন্দ্রিক জাতীয় সংস্কৃতিতে সমালোচনার সেই ঐতিহ্য রক্ষা পায়নি। ধারণা প্রচলিত আছে যে সাহিত্যে বিষয়বস্তু গৌণ, রচনারীতি মুখ্য। আমরা মনে করি, সাহিত্যে বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ, রচনারীতিও গুরুত্বপূর্ণ—এই দুইয়ের কোনোটিকে গৌণ মনে করা ভুল। আজ দরকার গবেষণা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমালোচনার নতুন ঐতিহ্য গড়ে তোলা। শুধু জনপ্রিয়তা কিংবা পুরস্কার লাভ দিয়ে সাহিত্যের মূল্য বিচার হচ্ছে না।

সাহিত্য উন্নত জীবনের প্রেরণা দেয়, মানুষকে ভেতর থেকে জাগায়, মানুষের রুচি পছন্দ ও জীবন-জগৎ দৃষ্টিকে নবায়িত করে—বৌদ্ধিক জাগরণ সৃষ্টি করে। এসবের বিবেচনা বাংলাদেশের সাহিত্যে নেই।

গবেষণা অনেক হচ্ছে। এসবের দ্বারা বাংলাদেশে জ্ঞানের ও চিন্তার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। গবেষণা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তা ও উপলব্ধি দরকার। অনেকেই বাংলাদেশে গণজাগরণ চান।

বাংলাদেশের জনগণ এখন ঘুমন্ত—গভীর নিদ্রায় মগ্ন। এই নিদ্রা হুজুগ দিয়ে ভাঙা যাবে না। জনগণ ভোটের উৎসবে যোগ দিতেও এখন আর আগ্রহ বোধ করে না। জনসাধারণকে জাগাতে হলে প্রথমে রাজনীতিক্ষেত্রে এবং গবেষণা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে নবচেতনা ও নতুন চরিত্রবল দরকার। রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের এবং সব স্তরের জনগণের উন্নতির মহান লক্ষ্য ও মহৎ নেতৃত্ব, চলমান চিন্তাচেতনা ও রাজনীতি নিয়ে তা হবে না। চাই নবচেতনা, নতুন সাহিত্য ও গবেষণা—নতুন আন্দোলন।

লেখক : প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, সাবেক অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য