kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

ইসরায়েলি নির্বাচন ও ফিলিস্তিন

রাজা শেহাদেহ

৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন আগামীকাল। অধিকৃত এলাকাগুলোর ফিলিস্তিনিরা এ বিষয়ে তেমন মনোযোগী নয়। এর কারণ এটা নয় যে যিনি জিতবেন, আমাদের জীবনে তাঁর প্রভাব প্রবল হবে না। বরং এ কারণে যে মূল প্রার্থীদের কারোর শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কর্মসূচি নেই। তাঁদের প্রত্যেকে অঙ্গীকারবদ্ধ—পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ ইহুদি বসতি রক্ষা করবেন তাঁরা। দখলদারির অবসান তাঁরা চান না।

ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিম তীরকে বা গাজাকে সংযুক্ত করেনি বটে, তবে এসব এলাকায় তাদের আচরণ অধিকারী প্রভুর মতো, তারা সার্বভৌম। তারা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় কেড়ে নিয়েছে। তারা গাজা এলাকাকে পুরোপুরি ঘিরে রেখেছে। ইসরায়েল বলছে, আমরা ফিলিস্তিনিরা যেন ঘরে বসে তাদের সাধারণ নির্বাচন দেখি, এর বেশি কিছু নয়। অথচ এই নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতাসীন হবে, তারা আমাদের জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণ করবে, আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। পশ্চিম তীরের ইহুদিরা ইসরায়েলের নাগরিক; কিন্তু আমরা নই। সেই ইহুদিরা ভোট দেওয়ার জন্য ইসরায়েলে যেতে পারে, আমরা পারি না।

ইসরায়েলের আগের সাধারণ নির্বাচন হয়েছে ২০১৫ সালে। তখনই আমি লিখেছিলাম, ফিলিস্তিনিরা নির্বাচনের ব্যাপারে কম আগ্রহী; বরং আন্তর্জাতিক আইনে মামলা দায়েরের সুযোগের ব্যাপারে অনেক বেশি ভাবে তারা। নিজের কথাই বলি, আমার সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ছিল দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা রুজুর ব্যাপারে। এসব মামলার একটি পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি নির্মাণকে চ্যালেঞ্জ করবে বলেই আমার মনে হয়েছিল। প্রমাণের অভাব ছিল না। আমার জানা ছিল, দখলকৃত এলাকায় বেসামরিক লোকদের স্থানান্তর ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের চরম লঙ্ঘন।

এখন মনে হয়, মামলার যতই যথার্থতা থাকুক, কিছু আসে-যায় না। যুক্তরাষ্ট্র সরকার হুমকি দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালতের লোকদের ভিসার আবেদন নাকচ করা হবে। আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যরা অপরাধ করেছে কি না সে বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চায় তারা। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের মামলার ভবিষ্যৎ অনুজ্জ্বল।

গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন অধিকৃত গোলান এলাকায় ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবির বিষয়টি বিতর্কিত। সিরিয়ার গোলান মালভূমির ওই অংশ ১৯৬৭ সালে দখল করে তারা। স্বীকৃতির ফলে ইসরায়েলের হাতই শক্তিশালী হয়েছে। এরপর তারা পশ্চিম তীর দখল করতে যাবে (এর মধ্যে নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে পশ্চিম তীরের অধিকৃত এলাকার কিছু অংশ দ্রুত ইসরায়েলের অংশ করা হবে—বি.স.)। ইসরায়েল, অংশত যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের কারণে সব ফ্রন্টেই অগ্রবর্তী, তারা যেন দায়মুক্ত। আমরা ফিলিস্তিনিরা তাদের দখলপ্রক্রিয়া থামাতে অসমর্থ।

ইসরায়েলিরা একটি ঘোরের মধ্যে বাস করছে। তাদের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘোরাচ্ছন্নতাকে আরো বাড়িয়েছেন। তারা মনে করে, তাদের সরকার বিবাদ-বিরোধ সামাল দিতে সক্ষম, অন্য অর্থে এ সমস্যার সমাধানের প্রয়োজন নেই। নেতানিয়াহুর মেয়াদে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। আমাদের আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে। বলতে ইচ্ছা করে, আঁধারের কালো আরো ঘন হলেই যেন আমাদের ভালো হয়। সম্ভবত তাতেই নিহিত আছে উত্তরণের উপায়। দুঃখ হয়, ইসরায়েল যে পথ বেছে নিয়েছে, তাতে তাদেরও ক্ষতি।

কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি—

এক. পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতিকারী ও ডানপন্থীদের হামলার পরিমাণ ২০১৭ সালের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি হয়েছে।

দুই. ফিলিস্তিনিদের জমিতে বসতি গড়ে একটি ইহুদি পরিবার এয়ারবিএনবি নামের একটি কম্পানিকে ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করে। কম্পানিটি গত বছর প্রণীত নতুন নীতির (বসতির সম্পত্তি ভাড়াসংক্রান্ত) কথা বলে আপত্তি জানায়। পরিবারটি তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বৈষম্যের অভিযোগ এনেছে। ফিলিস্তিনি পরিবারটিও মামলা করতে যাচ্ছে।

তিন. কয়েক দিন আগে জেরুজালেমের উত্তরে হিজমা গ্রামের কাছে একটি ইসরায়েলি বসতির ভেতর কয়েক দশকের পুরনো বাড়ি (ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে না ভাঙিয়ে) নিজেরাই ভাঙার উদ্যোগ নেয় একটি ফিলিস্তিনি পরিবার। তাদের ওপর জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে।

আমাদের সঙ্গে যা করা হচ্ছে এর প্রতিক্রিয়ায় কোনো একসময় ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটা কি ইসরায়েলিরা অনুভব করে না?

অরুন্ধতী রায়ের উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর একটি চরিত্র মুসা। সে বলে, ‘কাশ্মীরিরা স্বাধীনতা অর্জনে ব্যর্থ হলেও তারা অন্তত ভারতীয় ব্যবস্থার প্রতারক স্বভাবকে উন্মুক্ত করতে পেরেছে।’ গল্পের বিবরণকারীকে সে বলে, ‘তোমরা আমাদের ধ্বংস করছ না; বরং বিকশিত করছ। আসলে তোমরা নিজেদের ধ্বংস করছ।’ হয়তো ফিলিস্তিনিরাও ইসরায়েলিদের এ কথা বলবে।

লেখক : ফিলিস্তিনি আইনজীবী, লেখক

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য