kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি সত্যিই নির্দোষ

শামীম আল আমিন

৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টান টান উত্তেজনা, রাজনৈতিক বিভাজন আর নানা জল্পনা-কল্পনা। এর মধ্যে চলা তদন্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাবেক ছয় ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিচারের মুখোমুখি হওয়া। কয়েকজনের কারাগারে যাওয়া। কখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘অস্থিরতা’, নানা পদক্ষেপ। ‘উইচহান্ট’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা। কঠোর ভাষায় সমালোচনা, এফবিআই পরিচালককে বরখাস্ত করা। একপর্যায়ে স্পেশাল কাউন্সিলকেই আক্রমণ করে কথা বলা, এমনকি রবার্ট মুলারকে সম্ভাব্য বরখাস্ত করার গুঞ্জন। রাশিয়ার সঙ্গে ‘ধোঁয়াশা’র নীতি। ‘রাশিয়ার সঙ্গে গোপন আঁতাতের’ অভিযোগ নিয়ে সরব ডেমোক্র্যাট। এর মধ্যে গণমাধ্যমগুলোর একের পর এক সংবাদ, বিশ্লেষণ। বড় একটি অংশজুড়ে এমনটাই ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফেলে আসা শাসনামল।

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রিপাবলিকান প্রার্থী ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত এই ‘হঠাৎ রাজনীতিবিদ’কে নির্বাচনে জেতাতে রাশিয়ার হাত ছিল, ওঠে এমন অভিযোগ। এমনকি অভিযোগ এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে বলা হতে থাকে, ট্রাম্প ক্যাম্পেইন টিমের সঙ্গে রাশিয়ার ‘গোপন আঁতাত’ হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও বলা হয়, হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য রাশিয়া গোপন কোনো ষড়যন্ত্র করেছিল। বিষয়টি নিয়ে এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি তদন্ত শুরু করলে একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকেই বরখাস্ত করে বসেন। এই সিদ্ধান্তটি ছিল অনেকটা মৌচাকে ঢিল ছোড়ার মতো। নানা সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে শুরু করেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাট, এমনকি অনেক রিপাবলিকানের দাবির মুখে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, এফবিআইয়ের সাবেক পরিচালক রবার্ট মুলারকে ‘রাশিয়া আঁতাত’ অনুসন্ধানে স্পেশাল কাউন্সিল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যা দেশের রাজনীতিতে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।  

দীর্ঘ ২২ মাসের মাথায় রবার্ট মুলার তাঁর প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। গত ২২ মার্চ দেওয়া প্রতিবেদনের আগে দেশের বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, ‘গোপন আঁতাতে’র বিষয়টি সত্য। জনমনে একধরনের ধারণাও হয়েছিল, রবার্ট মুলারের প্রতিবেদনেও এমনটাই দেখা যাবে। যদিও বরাবরই এই তদন্তকে ‘উইচহান্ট’ বলে আসছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রবার্ট মুলারের প্রতিবেদন নাকি বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো আঁতাত করেননি। এ নিয়ে রবার্ট মুলার নিজে অবশ্য কিছু বলেননি। মুলারের তদন্ত প্রতিবেদনের চার পৃষ্ঠার একটি সারসংক্ষেপ গত ২৪ এপ্রিল অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার কংগ্রেসের সামনে তুলে ধরেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর পদকে কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে এই তদন্তকাজে কোনো বাধা দিয়েছেন কি না এ নিয়ে এফবিআইয়ের সাবেক পরিচালক রবার্ট মুলার কোনো উপসংহার টানেননি বলেও জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

আবার ট্রাম্পের কোনো দায় ছিল না, এমন কথাও সেখানে বলা হয়নি। মুলার তাঁর প্রতিবেদনে নাকি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অপরাধ করেছেন—এ রকম কোনো উপসংহার এই প্রতিবেদন টানছে না। এই প্রতিবেদন তাঁকে দায়মুক্তিও দিচ্ছে না।’ বিষয়টি কে কে বুঝেছেন জানি না, আমি বুঝিনি। অপরাধ করেননি, তাহলে দায়মুক্তি কেন দেবেন না! অ্যাটর্নি জেনারেল সাহেব রবার্ট মুলারের প্রতিবেদনটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে কি আছে—এসব নিয়েই এখন প্রশ্ন। নাখোশ ডেমোক্র্যাটরা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তবে খুশি রিপাবলিকানরা। আর রবার্ট মুলারের সম্পূর্ণ ও সম্পাদিত তদন্ত প্রতিবেদন ‘এপ্রিলের মাঝামাঝি’ সময়ের মধ্যেই কংগ্রেসকে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার। মুলারের ৪০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটির সম্পাদনা চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া তো অনুমিতই। তিনি খুবই উচ্ছ্বসিত। বরাবরের মতো টুইট করে লিখেছেন, ‘কোনো আঁতাত হয়নি, বাধাও দেওয়া হয়নি’। এমনকি ওই তদন্তকে ‘অবৈধ’ দাবি করে এটি ‘ব্যর্থ’ হয়েছে বলতেও ছাড়েননি তিনি।  নির্ভার হয়ে শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছেন না। বরং এ নিয়ে উল্টো কথার কামান দাগাতে শুরু করেছেন। সম্প্রতি মিশিগানে রিপাবলিকানদের একটি র্যালিতে তিনি বলেছেন, রিপাবলিকান শিবির ও রাশিয়ার ‘সম্ভাব্য আঁতাত’ নিয়ে স্পেশাল কাউন্সিল রবার্ট মুলারের তদন্তকে যারা সমর্থন দিয়েছিল, তারা ২০১৬ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছিল। কঠিন বক্তব্য। গুরুতর অভিযোগ।

এদিকে রবার্ট মুলারের তদন্তে গোপন আঁতাতের প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলা হলেও আমেরিকার প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে রিপাবলিকান শিবিরের সঙ্গে রাশিয়ার আঁতাত হয়েছিল। তবে মুলারের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা খানিকটা বেড়েছে। রয়টার্স ও ইপসসের এক জরিপ বলছে,  ৪৮ শতাংশ নাগরিক ‘ট্রাম্প কিংবা রিপাবলিকান শিবিরের কেউ না কেউ রাশিয়ার সঙ্গে মিলে ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেছিল’ বলে এখনো বিশ্বাস করে। মুলারের প্রতিবেদন প্রকাশের আগের সপ্তাহেই এমন ধারণাকারীর সংখ্যা ছিল ৫৪ শতাংশ। এই জরিপে এফবিআইয়ের তদন্ত বন্ধে ট্রাম্প চেষ্টা করেছিলেন, ৫৩ শতাংশ তা মনে করে। তবে জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা খানিকটা বেড়েছে। প্রেসিডেন্টের গ্রহণযোগ্যতা ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ শতাংশ হয়েছে। যদিও এখনো এই সংখ্যা দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীরও প্রতিনিধিত্ব করে না।

এখন কথা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি সত্যিই দোষী না হন, তাহলে এই অভিযোগ থেকে অবশ্যই মুক্ত হওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে। কিন্তু জনগণের বড় একটি অংশের এখনো প্রশ্ন, আসলেই কি তিনি নির্দোষ? পূর্ণাঙ্গ তদন্তে আসলে কী তথ্য এসেছে? অ্যাটর্নি জেনারেলের ব্যাখ্যার পর, রবার্ট মুলার কি কিছু বলবেন? এমন সব প্রশ্ন নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও অনেক সাধারণ মানুষ যখন উত্তর খুঁজছেন, তখন ফুরফুরে মেজাজে প্রেসিডেন্টর ট্রাম্প। খুশি তাঁর সমর্থকরাও। ট্রাম্প এখন চোখ রাখছেন ২০২০ সালের নির্বাচনের দিকে। অনেকেই যেখানে এরই মধ্যে তাঁর অভিসংশন পর্যন্ত দেখে ফেলেছিলেন, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পই কি তবে আবারও দেশের প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। হয়তো আরো একদফা চমকে যেতে হতে পারে দেশের মানুষকে, এমনকি গোটা বিশ্বকে। মনে আছে তো, নির্বাচনের আগে কোনো জরিপই কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেনি। কিন্তু বাস্তবতা তিনিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।  

 

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

 

মন্তব্য