kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

দিল্লির চিঠি

উত্তপ্ত পরিস্থিতির ফায়দা নিতে চাইছে বিজেপি

জয়ন্ত ঘোষাল

৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উত্তপ্ত পরিস্থিতির ফায়দা নিতে চাইছে বিজেপি

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ১৯৮৪ সালে, যেবার তিনি সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো এক শক্তিশালী কমিউনিস্ট নেতাকে ভোটযুদ্ধে পরাস্ত করলেন। তখন আমি কলকাতার বর্তমান খবরের কাগজের এক নবীন সাংবাদিক। মমতার জীবনে সেটাই ছিল প্রথম ভোট। কিন্তু এই জয়লাভের পর মমতাকে আর কখনো পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সাফল্য। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধে তিনিই হয়ে ওঠেন পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী নেত্রী। তারপর কংগ্রেসকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন তৃণমূল কংগ্রেস নামে এক নতুন রাজনৈতিক দলের। তারপর মুখ্যমন্ত্রী। এখন কলকাতায় ধীরে ধীরে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ভূমিকা নিয়ে অবতীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই চেষ্টার মধ্যে কোনো অন্যায় নেই। এমনকি একজন দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী যদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তবে তার মধ্যেও কোনো অন্যায় নেই।

কিন্তু এইবার ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের মুখে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শ্রীবৃদ্ধি নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও লেখালেখি হচ্ছে। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের আশা, যদি উত্তর প্রদেশ এবং হিন্দি বলয় দলের ‘সেট ব্যাক’ হয়, তবে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্য থেকে আসন পেয়ে ক্ষতি পূরণ হবে। অর্থাৎ একদিকে কূল ভাঙলেও অন্যদিকে কূল গড়বে। বেশ কয়েকটি ভারতীয় চ্যানেল বলছে, পশ্চিমবঙ্গে মমতার রাজ্যে বিজেপির আসনসংখ্যা হয়ে যেতে পারে প্রায় ১২টি। দিল্লিতে যেখানেই যাই, এই প্রশ্নটির মুখোমুখি হতেই হয়। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য খুব স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বাড়ছে, এটা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। খুব আকস্মিকভাবে আজ হঠাৎ এ রাজ্যে বিজেপি বেড়ে গেছে, এমনও নয়। এটা হয়েছে অনেক দিন ধরেই তিল তিল করে। কংগ্রেস বা সিপিএম নয়, মমতাবিরোধী প্রধান দল হয়ে উঠেছে বিজেপি। এটাও কি কয়েক বছর আগে ভাবা গিয়েছিল? তবে রাজ্যে বিজেপির এই সমর্থন বাড়লেও তা কতগুলো আসন পেতে সাহায্য করবে তা কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। এককথায় বলতে পারি, পশ্চিমবঙ্গে এখনো মমতার তৃণমূল কংগ্রেসই যে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। অন্যদিকে বিজেপির এখন আসনসংখ্যা মাত্র দুটি। আসানসোল ও দার্জিলিং। এই দুটি আসনের জায়গায় বিজেপির আসন বাড়লে ছয়টা থেকে ১০টা হতে পারে, এমনকি তার চেয়েও বেশি হয়ে যেতে পারে। যদি শতকরা দুই ভাগ সুইং বিজেপির পক্ষে হয়।

এর আগেও আমি লিখেছি, পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি সিপিএমের র‌্যাডিক্যালিজম থেকে ঈশ্বরবিশ্বাসী হিন্দু বাঙালির ‘অস্মিতা’কে মূলধন করে এক নতুন অভিমুখে এগোচ্ছেন। অর্থাৎ বিজেপি সম্পর্কে যে মনস্তাত্ত্বিক মতাদর্শগত বাধা এবং অনীহা বাঙালির ছিল, তা অনেকটাই ভাঙতে শুরু করেছে। বিজেপি তার রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, বাঙালির ডিএনএর এই পরিবর্তন সম্পর্কে আমি যা বলছি তা অতি সরলীকরণ। প্রথমত, ভদ্রলোক কিছু শহুরে অভিজাত বা প্রভাবিত হলেও হতে পারে। তা বলে সামগ্রিকভাবে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ বিজেপির প্রভাবে বিজেপির সমর্থক হয়ে উঠেছে, এটা ভাবা ভুল। তা ছাড়া সিপিএম মতাদর্শগতভাবে নাস্তিক হলেও ক্ষমতায় থাকার সময় কখনোই নাস্তিকতার প্রচার করেনি। বামপন্থী অধ্যাপকরা এসব যুক্তি দিচ্ছেন, কিন্তু আমার কমিউনিস্ট বন্ধুদের কাছে একটাই প্রশ্ন, ১৯২৫ সালে আরএসএসের জন্ম হয়, আবার ১৯২৫ সালেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম। তাহলে হিন্দুত্ব আর সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের আওয়াজ তুলে আজ ৭০ বছর পর গোটা দেশে আরএসএসের শক্তি কতটা আর কমিউনিস্টদের শক্তি কতটা! ভারতীয়ত্বকে প্রকাশ্যে গ্রহণ করার কাজটা কতখানি করতে সক্ষম হয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি?

আজ রাজ্যে বিজেপি যে বাড়ছে, তাতে মমতার যতটা লোকসান হতে চলেছে, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি কিন্তু হয়ে গেল কংগ্রেস আর সিপিএমের। পশ্চিমবঙ্গে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসের শক্তি আজ কতটুকু? তাই সিপিএম ও কংগ্রেসের মমতাবিরোধী পরিসরটি দখল করেছে বিজেপি। কংগ্রেস ও সিপিএম যদি আরো শক্তিশালী হতে পারত, তাতে মমতাবিরোধী ভোটের ভাগাভাগি হতো বেশি। তাতে শাসকদলের নেত্রী হিসেবে লাভবান হতেন মমতা।

মমতা প্রধান শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নেত্রী। কিন্তু দু-দুবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও কি মমতাবিরোধী অসন্তোষের হাওয়া রাজ্যে তৈরি হয়নি? আমি বলব নিশ্চয়ই হয়েছে। এ হলো প্রকৃতির সূত্র। অর্থনীতিতে যাকে বলে ল অব ডিমিনিশিং রিটার্ন। মোদির জন্য ২০১৪ আর ২০১৯ কি এক? কখনোই তা হতে পারে না। সিঙ্গুরে যখন কৃষিজমি নিয়ে মমতার আন্দোলন চলছিল, মমতার ক্ষমতায় আসার আগে সে ছিল এক তীব্র আন্দোলনের জঙ্গি নেত্রী মমতা। সে সময়ে একবার লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে বসে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মৈত্রীশ ঘটক আমাকে বলেছিলেন, মমতা ইজ এ সাকসেসফুল এন্টারপ্রেনার অব ডিসকনটেন্ট অব বেঙ্গল। তিনি হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা। মমতার বাঁশির সুরে হাজার হাজার, লাখ লাখ, কয়েক কোটি মানুষ তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ শাসনের পর জেলায় জেলায় তৃণমূলের সংগঠনের মধ্যে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব এবং সংঘর্ষ বেড়েছে। রাজ্যে সিপিএম দলে যেসব লুম্পেন গরিব শ্রেণি, মাস্তান-মাফিয়া শ্রেণি সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের কংগ্রেস ছেড়ে প্রমোদ দাসগুপ্ত থেকে অনিল বিশ্বাসের সিপিএম দলের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল, আজ তারা সবাই মমতার দলে ঢুকে পড়েছে। বেনোজল ক্ষমতায় থাকলে আটকানো কঠিন হয়ে যায়। ক্ষমতায় থেকে গরিব মানুষের জন্য অনেক প্রকল্প ঘোষণা হয়, কিন্তু রাজ্যে যে শিল্পায়ন প্রয়োজন ছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গেও বেকার ও কর্মহীনদের সংখ্যা কম নয়। প্রশাসনের বা আমলাতন্ত্রেও এসেছে অবক্ষয়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। মমতা আজও রাজ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তৃণমূল কংগ্রেসের বহু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সিবিআই তদন্তও শুরু হয়েছে কিন্তু আজও রাজ্যের মানুষ মমতাকে চোর ও অসৎ বলে মনে করে না।

তাই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের আসনসংখ্যা আগের তুলনায় কমতে পারে, কিন্তু বিজেপির আসন কতটা বাড়বে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আর এক মস্তবড় সমস্যা হলো রাজ্যস্তরে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। মোদির নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখে পশ্চিমবঙ্গেও এমন একটা জনসমাজ সংগঠিত হয়ে উঠেছে। মোদিকে তাই রাজ্য বিজেপি সাত দফা ভোটে সাতবার আসার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। কিন্তু মোদি সবকিছু করে দেবেন, ট্রেতে করে খাবার সাজিয়ে দেবেন, আর রাজ্য নেতাদের কোনো সাংগঠনিক দায়িত্ব থাকবে না! রাজ্য বিজেপির মধ্যে এখন ঠিক কতগুলো গোষ্ঠী তা কলকাতা গেলে যেকোনো বিজেপি নেতার সঙ্গে কথা বললেই জানতে পারবেন।

তাই এবার ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কী হবে সে এক মস্তবড় প্রশ্ন। বাঙালির মনস্তত্ত্ব্বের পরিবর্তন এক বাস্তব গোপন সত্য। নানা অর্থনৈতিক সংকটে বাঙালি সেই দিল্লি চলো বলে কেন্দ্রবিরোধী বিভিন্ন সত্তার আন্দোলনটাও আজ অনেক কমে গেছে। আর তার মধ্যে বেড়েছে ধর্মীয় মেরুকরণ। রাজ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান। এই জনসমাজের প্রতি মমতার প্রকাশ্য সমর্থন ও সাহায্য, উল্টো পিঠে বিজেপির দাপটও বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ যে রবীন্দ্রনাথের রাখি উৎসবের শহর এবং ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহর তা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। ১৯৩০ সালে, অর্থাৎ ব্রিটিশ যুগে অখণ্ড ভারতের প্রথম নির্বাচনে মুসলিম লীগ সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল সেদিনের অবিভক্ত বাংলায়। আজও যে ধর্মীয় মেরুকরণের তীব্রতা দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু বাংলার মানুষের মধ্যে এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি হয়েছিল। বিজেপি এবার সে ঘুমটাও ভাঙাতে চাইছে। তাই আসন্ন রাম নবমী নিয়েও মানুষের মধ্যে, প্রশাসনের মধ্যে ভ্রুকুটি দেখা দিয়েছে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির ফায়দা নিতে চাইছে বিজেপি।

 

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ, নয়াদিল্লি

মন্তব্য