kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

স্থানীয় নির্বাচন এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি

বারচিন ইনানচ

৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক থাকত, তাহলে আমরা (অথবা টার্কি ওয়াচার নামে যারা পরিচিত তারা) এ প্রশ্নটি তুলতাম না। বাস্তবতা হলো, বেশ কিছুকাল ধরে আমরা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বসবাস করছি না। কেন এই অস্বাভাবিকতা? অংশত এ অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণ তুরস্ক একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তুরস্কে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে।

প্রশ্নটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরও উঠেছে; ওঠার কারণ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিরাজমান একটি ধারণা। সেই ধারণাটি হলো, তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে বিজড়িত হয়ে পড়েছে। এ ধারণা আরো প্রবল হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার জন্য প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের অগ্রাধিকার নির্ধারণের কারণে। ‘ভোট দিন, অভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয় হুমকি মোকাবেলা করুন, তুরস্কের অস্তিত্ব রক্ষা করুন’—এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে তিনি স্থানীয় নির্বাচনের প্রচারাভিযান চালাবেন বলে ঠিক করেছিলেন।

প্রাক-নির্বাচনী সব জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন ভোটারের সাতজনই বলেছেন, অর্থনৈতিক সমস্যাই তুরস্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মাত্র চার-পাঁচ শতাংশ বলেছেন, নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় সমস্যা। এমন তথ্য-উপাত্ত থাকা সত্ত্বেও এরদোয়ান লাগাতার বলে গেছেন, প্রাক-নির্বাচনী জরিপে ভোটাররা আস্থা রাখেন না। তাঁর এই বাখোয়াজি এবং নির্বাচনী প্রচারণার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়ের কারণে তুরস্কের ‘বিদেশি’ শত্রুদের কানে কঠিন বার্তা পৌঁছায়।

প্রচারণার বিষয় নির্ধারণের কৌশল কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে এনেছে কি না, নির্বাচনের পর এ বিষয়ক পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার একান্তই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের। স্থানীয় নির্বাচনের ফল যা দাঁড়িয়েছে, তাতে আগে ধারণা করা না হলেও একটি প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। সেটি হলো, তুরস্ক কি পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক চাপান-উতোর কমাবে? কিছু কিছু বিষয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ সরকারের পক্ষ থেকে ঘটানো হয়েছে, তাতে পরিবর্তন আনা হবে কি?

স্বল্প সময়ের মধ্যে এসব বিষয়ে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আশা করা কঠিন। সেটি এ কারণে যে ক্ষমতাসীন দল, বিশেষত একটি বিষয়ে তার ছোট্ট মিত্র দল ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টির (এমএইচপি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যেমন উত্তর সিরিয়া পরিস্থিতি, এ ব্যাপারে ওই দলটি যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়েই থাকবে; এতে পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে হয় না। শুধু এমএইচপির মনোভাবই এমন নয়, আরো অনেকের কড়া মনোভাব রয়েছে। তুরস্কের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাও মনে করে যে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর (সিরিয়ায় পিকেকের বিভিন্ন শাখা) ওপর কঠোর নজরদারি দরকার।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর স্বল্প মেয়াদে এবং মধ্য মেয়াদে আমাদের বেশ কিছু বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে। দেখতে হবে, ওয়াশিংটন ও মস্কোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কিভাবে রক্ষা করে তুরস্ক। মধ্যপ্রাচ্যে আঙ্কারা, ওয়াশিংটন ও মস্কো—এই তিন পক্ষের ভূমিকা কী হয় তা-ও দেখতে হবে। কারণ এদের ভূমিকা পরস্পরের ওপর প্রভাব ফেলবে; তাদের কর্মকাণ্ড পরস্পরের ভূমিকায় পরিবর্তন আনতে পারে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবেলার জন্য এস-৪০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রয়ের বিনিময়ে এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান সংগ্রহবিষয়ক প্রকল্প থেকে তুরস্ক যদি বাদ পড়ে, তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে কি? সে বাস্তবতা আছে কি? ন্যাটোতে নিজের অবস্থান ধরে রাখুক তুরস্ক—রাশিয়া এটা চায় কি? নাকি ন্যাটোতে তুরস্ক একঘরে হয়ে পড়ুক—এটাই চায় তারা? তুরস্ক কি এস-৪০০ কেনার প্রস্তাব বাতিল করবে? সে কি নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সরঞ্জামাদির ওপর আরো আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করবে?

পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তুরস্কের করণীয় বিষয়াদি নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে কিভাবে সে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সমস্যা-সংকট মোকাবেলার উপায় নির্ধারণে কী কৌশল অবলম্বন করে সেসবের ওপর। গত বছরের আগস্টে যে কারেন্সি সংকট দেখা দিয়েছিল, ক্ষমতাসীন অভিজাত গোষ্ঠী সে সংকটকে বহির্দেশীয় বিরূপ আচরণের ফল আখ্যায়িত করেছিল। ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) এবং তার ভোটার ও সমর্থক শ্রেণির মূল্যায়নও তা-ই ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফল তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়নের যথার্থতা প্রমাণ করে না।

রাজনীতিতে বিষয় নির্ধারণ এবং নির্বাচনে ইস্যু বাছাই ও প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অগ্রাধিকার যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে হয়। বোঝা দরকার, কখনো কখনো রুটি-মাখনের বিষয়টি লাখ লাখ ডলারের বিনিময়ে এস-৪০০ বা এফ-৩৫ কেনার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সাংবাদিক, তুরস্কের হুরিয়াত ডেইলি নিউজের কলাম লেখক

সূত্র : হুরিয়াত ডেইলি নিউজ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য