kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

উদাসীনতা রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়

ডা. মো. আশরাফুল হক

৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উদাসীনতা রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়

স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল—বহুল প্রচলিত কথা। কারণ স্বাস্থ্য ভালো থাকলে সব কিছুই ঠিক থাকে নতুবা ষোলো আনাই মিছে। স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য আমরা ভেবে থাকি এর পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হবে, কিন্তু বিষয়টি আসলে ঠিক নয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ঠিক থাকলেই স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। এটি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মেশিন, যার যত্নের প্রয়োজন অন্য সব মেশিনের মতো। সঠিক খাদ্যতালিকা, সঠিক জীবনপ্রণালী একে ঠিক রাখে বয়স অনুপাতে। একসময় কিছু রোগের বিষয়ে বলা হতো একটা বয়সের আগে রোগটি হওয়ার আশঙ্কা কম, কিন্তু এটি এখন নিত্যদিন ভুল প্রমাণিত হচ্ছে, যেমন—হার্টের অসুখ। এখন পত্রিকার পাতা ও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে খুবই অল্প বয়সীদের আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। রোগের বয়স কমেনি, উদাসীনতাই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। একসময় মানুষ দুজন একসঙ্গে হলে নানা গল্পগুজবে মেতে উঠত, সামাজিক,  রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করত কিন্তু এখন দেখা যায় দুজনই মোবাইলে ফেসবুকিং নিয়ে ব্যস্ত। চোখ, মস্তিষ্ক কারোই বিশ্রাম নেই।

নানা ধরনের অনুভূতির জন্য আমাদের মস্তিষ্কে নানা ধরনের জিনিস নিঃসৃত হয়, কোনোটি সুখের অনুভূতি হয়, কোনোটি দুঃখের। অতিমাত্রায় ফেসবুকিং করার ফলে এসব জিনিসের নিঃসরণ অস্বাভাবিক হয়ে যায়, ক্ষতি হয় পুরো শরীরের। শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার ছক আঁকতে হবে, সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে নতুবা শরীর বেঁকে বসবে যেকোনো মুহূর্তে। রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার চেষ্টার চেয়ে সুস্থ থাকাটা অনেক সহজ ও কাঙ্ক্ষিত।

কেমন হওয়া উচিত আমাদের দৈনন্দিন জীবন?

কিছু ইতিবাচক ভাবনার মধ্য দিয়ে শুরু করুন সকালটা। নিজের লক্ষ্য, নিজের কাজের প্রতি মনোযোগ দিন। নিজের লক্ষ্যকে নিয়ে ইতিবাচক দৃশ্যকল্প রাখুন মনের ভেতর।

ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে কাজ করে। তাই মনকে ভালো রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

টানা কাজ করতে থাকলে একটু বিশ্রাম নিন। আলো ও বাতাসের কাছে যান। দিনে অন্তত দু-তিনবার এমন করুন। এতে অনেকটা ভালো লাগবে। 

মানসিক চাপ কমানোর একটি বড় উপায় হলো মনের ভেতরের কথাগুলো লিখে ফেলা। এই চর্চাও শান্ত করবে মনকে।

মনকে ভালো রাখার আরেকটি পথ হলো সব কিছু থেকে নিজেকে একটু আলাদা করুন; একটু বিরতি দিন। শুধু নিজের সঙ্গে সময় কাটান একেবারে নিজের মতো করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছুটা দূরে থাকুন। সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। গবেষণায় বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশি ব্যবহার বর্তমানে মানসিক চাপ বাড়াতে অনেকটা দায়ী।

সুস্বাস্থ্য ও ফিগারের জন্য নিয়মিত ও পরিমিত ঘুম প্রয়োজন। দিনে  শোবার অভ্যাস ত্যাগ করে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন।

প্রতিদিন সমতল জায়গায় হাঁটার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন হাঁটা সর্বোৎকৃষ্ট ব্যায়াম। নিয়মিত অন্তত আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস করুন।

ভোরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সকালে স্কুল, কলেজ বা অফিসে যাওয়ার আগে গোসল সেরে নিন।

বেশি উঁচু তলায় উঠার দরকার না হলে লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।

প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমের অভ্যাস গড়ুন।

সোজা হয়ে বসা ও দাঁড়ানোর অভ্যাস করুন। এতে শরীর যেমন ঠিক থাকে তেমনি মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।

নিয়মিত ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। খাবার তালিকায় আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান। আমিষ ও চর্বিজাতীয় খাবার কমিয়ে আনুন। ভাজাপোড়া ও ফাস্ট ফুড-জাতীয় খাবার সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।

খাবারের শুরুতে এক থেকে দুই গ্লাস পানি পান করুন। খাবার শেষে অন্তত আধা ঘণ্টা পর পানি পান করবেন।

লাল মাংস (চার পা বিশিষ্ট পশুর মাংস), দোকানের কেনা মিষ্টি, ঘি, ডালডা, ডাল ও ডালজাতীয় খাবার কম খান।

ফলমূল ও শাকসবজি বেশি করে খাদ্য তালিকায় রাখুন। একবারে বেশি করে খাওয়ার চেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খেতে পারেন।

রাতে তাড়াতাড়ি খাওয়া উচিত। খাওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টা পর  শোবার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজন শর্করা ও গ্লুকোজ। এটি থাকে বিভিন্ন ফল, রুটি, মিষ্টিআলু, নুডলস, মাছ-মাংস, কাঠবাদাম প্রভৃতিতে। তাই অল্প পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের বাদাম নিয়মিত খাওয়া জরুরি। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় মৌলিক উপাদানগুলো রয়েছে। দেখা গেছে, সপ্তাহে দুই বা তিন দিন বিভিন্ন রকমের বাদাম খেলে হৃদরোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব। ডিমের কুসুমও মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।

রান্নায় যতটা সম্ভব কম তেল ব্যবহার করুন। আর যদি সম্ভব হয় সরাসরি উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করাই ভালো। উদ্ভিজ্জ খাদ্যে যেমন অল্প পরিমাণে ক্যালরি থাকে, তেমনি অন্যদিকে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ পদার্থ আর ফাইবার। এশীয় রান্নাঘরে আদা, রসুন, পেঁয়াজের ব্যবহার এমনিতেই রয়েছে। এই পেঁয়াজ, রসুন, ক্যান্সার রোধে সহায়ক। আর আদা ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে পেট পরিষ্কার রাখে।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত সবার। মাসিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত, যা আমরা বেশির ভাগই রাখি না। ফলে যখন স্বাস্থ্য একেবারে চলতে পারে না তখনই আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তেমন কিছু একটা করার থাকে না।

রোগে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সঠিক চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। এই পরামর্শ চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করেই নেওয়া ভালো। কারণ টেলিফোনের মাধ্যমে চিকিৎসা ভুল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আবার অনেককেই দেখা যায় ইন্টারনেট থেকে রোগের লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন, যা বর্জন করা উচিত।

স্বাস্থ্য এমন একটি জিনিস, যাকে সঠিক উপায়ে চালনা করলে এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে একবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাকে ফেরানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।

লেখক : ট্রান্সফিউশন মেডিসিন স্পেশালিস্ট

মন্তব্য