kalerkantho

নির্বাচনের কাঠামো কি ভেঙে পড়েছে!

এম হাফিজউদ্দিন খান

৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নির্বাচনের কাঠামো কি ভেঙে পড়েছে!

সম্প্রতি সারা দেশে কয়েক ধাপে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে নতুন করে আর তেমন কিছু বলার নেই। এক হিসাবে বলা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি একরকম ভেঙে পড়েছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের কথা যে আমরা বলে এসেছি দীর্ঘদিন ধরে, সেটার বাস্তবায়ন এখনো দেখা যাচ্ছে না; যেটুকু আভাস বা সম্ভাবনা ছিল, তাও আর অবশিষ্ট নেই। এখন দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ ও পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে।

উপজেলা নির্বাচন নিয়ে প্রথম কথা হচ্ছে, কয়েক ধাপে তো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, এখানে একটা জিনিস খুব পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে, মানুষের নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই এটা হয়ে আসছে। ভোটাররা দেখছে যে ভোট দিয়ে তো কোনো লাভ নেই বা ভোট দিয়ে কোনো কিছু হয় না, আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে যায়; কাজেই তারা ভোটের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। বলতে গেলে নির্বাচনের ওপর মানুষের কোনো আস্থা নেই। সব মিলিয়ে ভোটের ওপরই মানুষের অনাগ্রহ তৈরি হয়ে গেছে। এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। একটি স্বাধীন দেশে গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি খারাপ বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এর কোনো ভালো ফল আশা করা যায় না। ভবিষ্যতে এর পরিণাম ভালো হতে পারে—সেই ভরসা রাখা যায় না। রাজনীতির মাঠে, সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে এর ভবিষ্যৎ মন্দ ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না।

উপজেলা নির্বাচনে আর একটি জিনিস দেখা গেছে—নির্বাচন কমিশন তার সব রকম ক্ষমতা ও নিয়মের প্রয়োগ করেছে। উপজেলা নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু করা যায়, নির্বাচন যেন ভালো হয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে ধরনের পরিবেশ বা পরিস্থিতি দরকার, যা যা করণীয়—তার জন্য সব রকম আইন প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। এটা দেখে বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু এই একই কাজ তারা জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োগ করল না কেন? আমাদের এই প্রশ্ন রয়েই গেছে।

আর একটি বিষয় হচ্ছে, ভোটারশূন্য নির্বাচনের আরো একটি কারণ একদলীয় নির্বাচন। নির্বাচনী মাঠে তো আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ নেই। আর যারা আছে তারা তাদেরই স্বগোত্রীয়—বিদ্রোহী প্রার্থী। নির্বাচনী মাঠে আর কোনো দল নেই। মাঠে বিএনপি বা জামায়াত কেউই নেই। সাধারণ মানুষ জেনে গেছে যে একদলীয় নির্বাচন হচ্ছে। ফলে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ কমে এসেছে। এ কারণে মানুষ ভোট দিতে যায়নি। এটা একধরনের প্রতিবাদও হয়তো।

আর একটি বিষয় আমরা দেখতে পেলাম, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেটা হয়ে আসছিল—ব্রিটিশ আমল থেকেই নির্দলীয় নির্বাচন হয়ে এসেছে। সেটা তো সংস্কার করে নতুন নিয়ম করা হয়েছে এবং দলীয়ভাবে নির্বাচন হয়েছে। এটা অত্যন্ত ভুল ছিল। এর থেকে বেরিয়ে নতুন করে তারা ভাবছে যে আগের নিয়মে পুরনো অবস্থায় ফিরে গিয়ে নির্বাচন করবে। এটা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে বা আদৌ এসব কী হবে—এখনো বলা যায় না। আমি ঠিক জানি না। এসব কারণে ভোটাররা নির্বাচন থেকে একরকম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

উপজেলা নির্বাচন নিয়েই নয়, বলা যায় যে নির্বাচনের যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তা ভেঙে পড়েছে। গণতন্ত্রের জন্য এসব আয়োজন ও প্রভাববিস্তারী মনোভাব যে কত ক্ষতিকর, তা মানুষ একসময় টের পাবে বলে আমি মনে করি। সুষ্ঠু  ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে শর্ত ও উপাদান, এর ফাউন্ডেশন—সবই ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে গণতন্ত্র পিছিয়ে যাবে। সব অর্জন অকেজো হবে এবং দেবে যাবে। সে ক্ষেত্রে উন্নয়ন এবং অন্যান্য কাজকর্ম এগিয়ে গেলেও সার্বিক বিচারে একে এগোনো বলা যায় না।

আমার বাসার সামনেই ভোটের কেন্দ্র আছে। আমি নিজে দেখেছি, কিভাবে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলেছে। ভোটারদের উপস্থিতি ও ভোটগ্রহণের পরিবেশ তেমন সন্তোষজনক নয়। এসব তো ভালো লক্ষণ নয়। গণতন্ত্রের জন্য এসব মোটেই ভালো নয়, বরং অশনিসংকেত।

এখন দেশে বিরোধী দল বলতে কিছু নেই। এটাও ভালো নয়। দেশে এখন একদলীয় শাসন চলছে। বিরোধী দল না থাকলে রাজনীতি বা গণতন্ত্র সচল হবে কী করে? গণতন্ত্রের চর্চার পরিবেশও তো ব্যাহত হয় এতে। এখন যে বাকশাল আইন বা শাসন চলছে, এর পক্ষেও অনেকে কথা বলছেন। সেখানেও আবার পক্ষ-বিপক্ষ আছে। গণতন্ত্র চর্চা এবং একে সুসংহত করা—সব কিছুর জন্যই বিরোধী দল অপরিহার্য।

এখানে আর একটা বিষয় ধারাবাহিক রূপ লাভ করে চলেছে। জাতীয় নির্বাচনে যেমন উপজেলা নির্বাচনেও দেখলাম, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেক প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এর সংখ্যাও কম নয়। এতে কী বোঝা যায়, নির্বাচন নিয়ে আমাদের আগ্রহ নেই। নির্বাচনী কাঠামোর ভেতর-বাইরে ঠিক নেই। সে কারণে এসব ঘটতে পারছে। এসব ঠিক নয়। একদলীয় নির্বাচন বা গণতন্ত্র কোনো ভালো কিছু দেয় না। ২০১৪ সালে এই ধারাটি শুরু হয়েছে। বিপুলসংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গেল। সেই প্রক্রিয়া এখনো চলছে। এগুলো কোনো ভালো বিষয় নয় বলে আমি মনে করি।

বাইরের দেশে এমন নিয়ম চালু আছে যে ভোটার যাকে ইচ্ছা ভোট দিতে পারবেন এবং নির্বাচনের পরে আপনার ভোট যাঁকে দিয়েছেন, তিনিই ভোটটা পেয়েছেন কি না—সেটা পরীক্ষা বা যাচাই করার সুযোগ আছে। এখানে কিন্তু সেই সুযোগ নেই। নেই, হয়তো ভবিষ্যতে কোনো দিন চালু হতে পারে। সেটা করতে পারলে ভালো হতো। এ জন্য আরো অনেক সময় লাগবে।

নির্বাচন, সরকার, বিরোধী দল এবং গণতন্ত্র নিয়ে আমার যেটা বলার তা হচ্ছে দেশে এখন গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য প্রধান কাজ ও প্রক্রিয়া সরকারই শুরু করতে পারে। যদি সরকার তা চায়। বিরোধী দলকে সাংগঠনিক কাজকর্ম এবং ন্যায্য দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করার সুযোগ দিতে হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অনেক দিন ধরে জেলে আটক আছেন। তাঁকে জেল থেকে বের করার প্রক্রিয়ায় বিএনপি কিছুটা পিছিয়ে বা একরকম আটকে আছে। তাঁর নামে ৩৬টি মামলা আছে। এসব দেখে ও শুনে রাজনীতি নিয়ে ভবিষ্যৎ বলা মুশকিল।

বিএনপি নানাভাবে কোণঠাসা হয়ে আছে। তবে বিরোধী দলকে সামনে এগোতে হলে তাদের নিয়ম অনুযায়ীই এগোতে হবে। এর বিকল্প নেই। তাদের সাংগঠনিক কাঠোমো মজবুত করতে হবে। সুসংঘবদ্ধভাবে দলকে ঢেলে সাজাতে হবে। যে পরিস্থিতি এখন চলছে, এই অবস্থায় এখনই তারা কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।

নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনও হয়ে গেল দলীয়ভাবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যখন দলীয়ভাবে হয়ে গেল, তখনই আমরা বুঝে ছিলাম, স্থানীয় পর্যায় থেকে পার্লামেন্ট দখল করার একটি কাজ তারা করে ফেলেছে। ফলে কী আর হবে।

সর্বশেষ কথা হচ্ছে, রাজনীতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, একদলীয় শাসননীতি চলতে থাকে তাহলে সার্বিকভাবে এটা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। এর থেকে বেরিয়ে সুষ্ঠু ও শুভ কিছু ভাবতে হবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে হবে। বিরোধী দলকেও নিজেদের ভুল ও পিছিয়ে পড়ার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। নতুনভাবে নিজেদের তুলে ধরতে হবে। তা না করতে পারলে তাদের ভবিষ্যৎ খুব একটা আলোময় হবে বলে মনে হয় না।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য