kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

নাঈম কি হিরো থেকে জিরো হয়ে গেল

রেজানুর রহমান

৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নাঈম কি হিরো থেকে জিরো হয়ে গেল

দুটি ভিডিও চিত্র। প্রথমটিতে দেশের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা, টিভি উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয় বনানীর অগ্নিকাণ্ডের সময় পানির ফুটো পাইপ হাতে চেপে রাখা সেই আলোচিত কিশোর নাঈমকে প্রশ্ন করছেন, তুমি চার লাখ টাকা পাচ্ছ! সঙ্গে আরো অনেকের সাহায্য-সহযোগিতা পাবে। তুমি কি এগুলো নেবে? নাঈম উত্তর দিল—এগুলো আমি এতিমখানায় দিয়ে দেব। নাঈমের কথা শুনে জয় অবাক হয়ে আবার নাঈমকে প্রশ্ন করলেন, এতিমখানায় দিয়ে দেবে? কেন? এবার নাঈম বলল, এতিমখানায় দিলে তারা সাহায্য পাবে, সে জন্য। জয় আবার প্রশ্ন করলেন, কেন দিতে চাও এতিমখানায়? নাঈম উত্তরে বলল, কয়েক বছর আগে খালেদা জিয়া এই টাকাটা দুস্থদের, খায়ালাইছিল! সে জন্য....। নাঈমের কথা শুনে জয় অবাক হয়ে আবার প্রশ্ন করলেন, কী বলছ? আবার বলো। আমি বুঝতে পারিনি... এবার নাঈমের উত্তর—মানে লুট কইর্যা টাকাটা চুরি করে...। জয় আবারও প্রশ্ন করলেন, সে জন্য তুমি যা সাহায্য পাবে তার সব কিছুই এতিমখানায় দিয়ে দিতে চাও? নাঈমের উত্তর—জি। এবার দ্বিতীয় ভিডিওটিতে চোখ ফেলতে চাই। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের একজন রিপোর্টার নাঈমকে প্রশ্ন করলেন, তুমি তো নিজেই অনেক কষ্টের মধ্যে আছ। তোমার টাকা-পয়সা নেই। তোমার মা অনেক কষ্ট করে তোমাকে পড়াশোনা করাচ্ছেন। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন। তোমাকে যে টাকা দেওয়া হবে, মানুষ তোমাকে যে টাকা দেবে সে টাকা তুমি এতিমদের দিতে চাচ্ছ কেন? টাকাটা তো তোমারই প্রয়োজন! রিপোর্টারের প্রশ্ন শুনে নাঈম বলল, জি। রিপোর্টার এবার প্রশ্ন করলেন, কেন তুমি এতিমদের দিতে চাও? এটি কি তোমার মনের কথা? নাঈম এবার বলল, না, এটা তারা শিখায়া দিছে।

দুটি ভিডিও চিত্রের বক্তব্যকে এক সূত্রে মেলাতে পারছি না। নাঈম নামের কিশোরটির জন্য বেশ কষ্ট পাচ্ছি। বনানীর অগ্নিকাণ্ডের সময় শত শত মানুষ যখন অহেতুক ভিড় করে ঘটনা দেখছিল, দাঁত কেলিয়ে মোবাইলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ছবি তুলছিল; তখন এই মানবিক বোধসম্পন্ন কিশোর নাঈম আগুনে পানি ছিটাতে দমকল বাহিনীকে সাহায্য করেছে। পানির ফুটো পাইপ চেপে ধরে বসেছিল কয়েক ঘণ্টা। ফুটো পাইপ থেকে যাতে পানি বেরিয়ে না যায়, সেই চেষ্টাই করেছে সারাক্ষণ। ঘটনার দিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে অখ্যাত এক কিশোর নাঈম দেশ-বিদেশে বিখ্যাত হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে ব্যাপক হৈচৈও শুরু হয়। প্রবাস থেকে জনৈক ব্যক্তি নাঈমের শিক্ষাজীবনের খরচের জন্য পাঁচ হাজার ডলার পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ খবরটি জেনে কী যে খুশি হয়েছিলাম। পাঁচ হাজার ডলার মানে বাংলাদেশি টাকায় চার লাখ টাকা। দরিদ্র কিশোর নাঈমের শিক্ষাজীবন এবার নিশ্চয়ই কণ্টকমুক্ত হবে। কতজনকে যে নাঈমের মানবিক সৌন্দর্যের গল্প বলেছি...এতটুকু ছেলে, অথচ কী তার মানবিকবোধ! সৃষ্টিকর্তা ভালো কাজের স্বীকৃতি দেন। ভালো কাজ করে দরিদ্র নাঈম আর্থিক সহযোগিতা পেতে যাচ্ছে। আর কোনো চিন্তা নেই। নাঈম এবার নিশ্চয়ই নির্বিঘ্নে তার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবে।

কিন্তু নাঈমের জীবনে এটা কী ধরনের ঘটনা ঘটল? সাহায্যের টাকা সে এতিমদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল বলে সাহায্যকারী সেই প্রবাসী ব্যক্তি নাঈমকে আর্থিক সাহায্য দেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। ফলে আগের দিনের হিরো পরের দিনই জিরোতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে হতদরিদ্র নাঈম কেন এতিমখানায় সাহায্য করার কথা বলল? অবশ্য ভিডিও চিত্রে সে এ ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছে। বলেছে, তাকে নাকি এ কথা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, নাঈমকে কে শিখিয়ে দিয়েছে এই কথা? উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয়, নাকি অন্য কেউ? উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনার একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, নাঈমকে তিনি এ কথা শিখিয়ে দেননি। অন্য কারো শেখানো কথা নাঈম বলেছে কি না এ ব্যাপারেও তিনি নিশ্চিত নন। এ ব্যাপারে নানা পর্যায় থেকে তাঁকে নাকি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছেন তিনি। পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে, ঘটনা খুবই জটিল হয়ে উঠেছে। নাঈম যখন শাহরিয়ার নাজিম জয়ের সঙ্গে কথা বলছিল, তখন তাকে খুব একটা স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়নি। তার কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছিল সে আসলেই মনের কথা বলছে না; বরং কারো শেখানো বুলি আওড়াচ্ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কে শেখাল তাকে এই বুলি? দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত একটি কিশোর হাতের কাছে চার লাখ টাকা পেয়ে ওই টাকা এতিমখানায় দিয়ে দেবে—বিষয়টা কি এতটাই সহজ? পরের ভিডিওটিতে নাঈমের চরম অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। অকস্মাৎ চার লাখ টাকা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় নাঈম মুষড়ে পড়েছে—ভিডিওটি দেখে সহজেই বোঝা যায়।

 

এখন প্রশ্ন হলো, নাঈম নিশ্চয়ই কারো সাহায্যের আশায় সেদিন বনানীর অগ্নিকাণ্ডের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির ফুটো পাইপ চেপে ধরে বসে থাকেনি। মানবিক তাড়নায় একটি শ্রেষ্ঠতম সামাজিক কর্তব্য করেছে সে। এ জন্য অকস্মাৎ আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে হতদরিদ্র এই কিশোরের মনের ভেতর কী পরিমাণ আনন্দ আর আর্থিক নিরাপত্তা পোক্ত হয়ে উঠেছিল তা সহজেই কল্পনা করা যায়। শিক্ষাজীবন নিয়ে কত স্বপ্নই না দেখেছিল সে। কিন্তু নাঈমকে হতাশ করল কে? আগের দিন যে কিশোর পৃথিবীব্যাপী নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো, পরের দিনই কে তাকে খলনায়ক বানাল? এই প্রশ্নের উত্তর জরুরি। শেষে একটি কথা বলতে চাই—যিনি নাঈমকে আর্থিক সাহায্য দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি বিষয়টি আর একবার ভেবে দেখতে পারেন। অথবা বিত্তবান যাঁরা আছেন, তাঁরা নাঈমের পাশে দাঁড়াতে পারেন। আর্থিক সাহায্য নাঈমের মা-বাবার হাতে না দিয়ে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তার নামে রাখা যেতে পারে, যাতে নাঈম তার শিক্ষাজীবনের জন্য টাকাটা খরচ করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতির কূটচালে ফেলে নাঈমকে হতাশ করা ঠিক হবে না। নাঈম শেষ পর্যন্ত হতাশ হলে মানবিক শক্তি ও প্রেরণার জায়গাগুলো ক্রমান্বয়ে শিথিল হতে থাকবে, যা একটি দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক

আনন্দ আলো 

মন্তব্য