kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

ব্রেক্সিট এবং রাজনৈতিক ক্ষীণদৃষ্টি

জন হ্যারিস

৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্রেক্সিট এবং রাজনৈতিক ক্ষীণদৃষ্টি

বেক্সিট বিষয়ে আমার ক্ষোভের মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা ঠাট্টা-মশকারার শিকার হচ্ছি। ব্রেক্সিট-বিরোধী অনেকের মনোভাব এখনো নিয়ন্ত্রিত আছে; আসলে তারা ক্লান্ত, যা হয় হোক—এমন মনোভাব তাদের। আর্থিক কৃচ্ছ্র মানুষকে বিদীর্ণ করছে, সামাজিক বন্ধনের সুতা জীর্ণ হচ্ছে; আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয় ছাড়া ইইউ ত্যাগের বিষয়টি অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বরিস জনসন, মাইকেল গোভ ও ডমিনিক রাব ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি হাতে পাওয়ার জন্য কুস্তি লড়তে ব্যস্ত। আমাদের শাসনব্যবস্থা স্থবির এক দশায় পৌঁছেছে। বিরোধীপক্ষ বিভাজিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও মূকপ্রায়। মনে হয়, ক্ষোভ প্রকাশই এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া। অথচ বিরাজ করছে অদ্ভুত নীরবতা, নিষ্ক্রিয়তা।

দ্বিতীয় গণভোটের দাবিতে গত সপ্তাহের শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত প্ল্যাকার্ডগুলোতেও মশকারা-ভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে; ব্যানারগুলোতে ছিল ক্লান্তি ও অবসন্নতার ছাপ—পরাজিত মনোভাবের প্রকাশ দেখা গেছে। কেন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে? কেন মানুষের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয়েছে? সন্দেহ নেই, অনেক মানুষই ক্ষুব্ধ। মনোভাবের এই বিপ্রতীপ প্রকাশের মাধ্যমে আত্মপ্রবঞ্চনার, আত্ম-অবমাননার বিষয়গুলোই স্পষ্ট হচ্ছে। সামাজিক নৃতত্ত্ববিদ কেইট ফক্সের মতে, আত্মপরিহাস মনের গভীরে লুক্কায়িত তীব্র অস্বস্তি, কষ্ট, দুঃখ ও ক্ষোভকে দমিত করে। অবোধ্য মনোভাব, আবেগ-প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব এবং স্পষ্ট কথা বলায় অক্ষমতা—এসব নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানপ্রসূত অভিজ্ঞান রয়েছে। এসব বিষয়ের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ রয়েছে।

রাজনীতিকরা, ক্যাম্পেইনাররা এখন নরওয়ে প্লাস (ব্রেক্সিট-পরবর্তী বোঝাপড়াবিষয়ক সরকারের প্রস্তাবের বিকল্প), কমন মার্কেট ২.০ (সরকারের প্ল্যান বি, যাতে অধিকাংশ এমপির সমর্থন প্রয়োজন) এবং এমভি ৩ ও ৪ (ব্রেক্সিট-বিষয়ক এমপিদের ভোটিং)  নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু প্রায়ই তারা ইতিহাস, সংস্কৃতি, ব্রিটেন কেমন দেশ, শেষ পর্যন্ত জনগণ কী চায়—এসব প্রসঙ্গের গভীর বিষয়াদি থেকে তাদের দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে চায়। প্রায় নজিরহীন অথচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যুকে, যা রহস্যময়তার ছায়ান্ধকারে ঢাকা, বোঝাপড়ার কাঠামোতে আনা কষ্টকর। তবে খুব বেশি বিস্মিত হওয়ার ব্যাপার নয়। ব্রেক্সিট-বিষয়ক আখ্যানের কথা বলতে গিয়ে আমরা যেন কিছু বিষয় ভুলে না যাই। সরকারের যে অংশ ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষপাতী তারা বলছেন, ব্রেক্সিট কার্যকর হলে লোকজনের সাপ্তাহিক আয় ৩৮ পাউন্ডে নেমে যাবে, আবাসন মূল্য ১০ থেকে ১৮ শতাংশ কমে যাবে। এসব না বলে বরং ইইউতে থেকে যাওয়ার সুবিধার কথা বলে জনমন চাঙ্গা করা যেতে পারে। আসলে ব্রেক্সিট নিয়ে সমাজ ও রাজনীতির মৌলিক বিষয়াদির নিরিখে আলোচনা দরকার; তর্ক-বিতর্ক দরকার। সেসবের নিরিখে সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার, ক্ষীণদৃষ্টিপ্রসূত সিদ্ধান্ত নয়।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে রাজনৈতিক আন্দোলনের উদাহরণ কম নয়, সেসব জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। যেমন—সত্তরের দশকের উগ্র-ডানপন্থার উত্থানবিরোধী আন্দোলন যার মাধ্যমে খনিশ্রমিকদের প্রতি এবং সিএনডির (ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিজ-আর্মামেন্ট) প্রতি সমর্থন প্রকাশ করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে সেসব আন্দোলন হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের পল ট্যাক্স আন্দোলনের কথাও বলা যায়। আমার দেখা সেটাই রাজপথের শেষ আন্দোলন, যার ফলে সরকার নীতি বদলাতে বাধ্য হয়েছিল।

তিরিশ বছর আগে টোরিরা যে রাজনৈতিক প্রকল্প চালু করেছিল তার চূড়ান্ত দশা দেখতে পাচ্ছি এখন। তার ফল কী? ব্রিটেন (বরং ইংল্যান্ড বলাই ভালো) একটি দুর্দশাগ্রস্ত, বর্ণবাদী, অন্তর্মুখী অস্তিত্বে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার ধরন কী? ঠাট্টা-তামাশা, মিউ মিউ করে অভিযোগ-অসন্তোষ প্রকাশ, চটজলদি মন্তব্য, টুইটার ঝড়—এসব। এসব প্রতিক্রিয়া উল্লিখিত আন্দোলনগুলোর সঙ্গে কোনোমতেই তুল্য নয়।

লেবার নেতৃত্ব ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের অবশিষ্টাংশ আগের মতো সক্রিয় নয়। এখনকার প্রতিবাদ আগের মতো সংঘবদ্ধ ও প্রবল নয়। আন্দোলন আছে, তবে ক্ষুদ্রকায় ও বিক্ষিপ্ত। মিছিল, সংসদীয় ভোট ও সমাবেশ হয়, তবে এগুলো ক্ষণস্থায়ী। অনেক কিছুই হচ্ছে; কিন্তু সেসব সমন্বিত ও স্পষ্ট নয়। রাজনীতি এখন নড়বড়ে, কায়দার ভিড়ে কৌশল হারিয়ে যাচ্ছে। মুশকিল হলো, ব্রেক্সিট ইস্যুতে সুবিধাবাদীরা দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলছে। ঘোর ব্রেক্সিটপন্থী ও ইংলিশ ফ্যাসিস্টরা যা করছে তাকে বিশ্বাসঘাতকতাই বলতে হয়। চার দশক আগে ফিরে গেলে দেখা যাবে, ‘রক এগেইনস্ট রেসিজম’, ‘অ্যান্টি-নাজি লিগ’ ছিল, বলিষ্ঠ অজাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল—এখন নেই। ওয়েস্ট সিনস্টারে শুধু সমস্যার গায়ে আঁচড় কাটা হচ্ছে, তলিয়ে দেখা হচ্ছে না। ব্রেক্সিটবিরোধীরাও দ্বিধাগ্রস্ত। মানুষের ধৈর্যে চিড় ধরেছে, বিচলন ঘটছে। কিন্তু বেশ দেরিতে শুরু হয়েছে।

 

লেখক: গার্ডিয়ানের কলাম লেখক

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে) অনলাইন ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ: সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য