kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

একটি কমপ্লায়েন্স কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি

আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন

৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



একটি কমপ্লায়েন্স কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি

সম্প্রতি সংঘটিত আগুন সমগ্র জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে মহানগরগুলোর অধিবাসীরা, বিশেষ করে বহুতল ভবনে কর্মরতরা।

আমাদের একটি বড় সমস্যা, আমরা অঢেল অর্থ ব্যয় করে ভবন নির্মাণ করি, দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনের জন্য অর্থ ব্যয় করি। অফিস, বাসার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করি প্রচুর অর্থ দিয়ে। দামি শোপিস, কাটলারিজ ক্রয় করে প্রদর্শন করি। কিন্তু অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখি না, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করে নাগালের মধ্যে রাখি না। এমনকি অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য মানসম্পন্ন ও প্রয়োজনীয় ব্যাসের তার ব্যবহার করি না। অথচ স্থাপিত তারের ওপর প্রায়ই নতুন নতুন বৈদ্যুতিক সামগ্রী, এসি সংযোজন করে বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য সামগ্রীর ওপর আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়িয়ে ফেলি। জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি নেই বললেই চলে, ন্যূনতম জায়গাও রাখা হয়নি সংযোজনের জন্য। বেশির ভাগ অভ্যন্তরীণ সিঁড়ি অত্যন্ত সরু।

দেশের কারখানাগুলোরও একই অবস্থা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণব্যবস্থা নাজুক। এরই মধ্যে গার্মেন্ট সেক্টরে একাধিক বিয়োগান্তক ঘটনার পর বিদেশি অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্স এসে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর পরিবেশ উন্নত করেছে, তুলনামূলক নিরাপদ করেছে। পক্ষান্তরে আমাদের গার্মেন্ট সেক্টরের মিস ব্র্যান্ডিংও করেছে। অ্যাকর্ড চলে যাওয়ার সময়ও অত্যাসন্ন।

আমরা এখন আর দরিদ্র রাষ্ট্র নেই। মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে গ্র্যাজুয়েশন হয়েছে। আমাদের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। জগেসরা প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন-মাতা শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে দেশ দ্রুত ও স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে চলছে। এখন সময় এসেছে প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্য ও সঠিক মানের ওষুধ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করা। অনিরাপদ কর্মস্থল, বাসভবন, সড়ক, খাদ্য ও ওষুধ সব কিছুই জনমনে আতঙ্ক বজায় রাখবে এবং জাতীয় উৎপাদনের গতি কমিয়ে দেবে। অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে, স্থিতিশীল অর্থনীতিতে আঘাত করবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময় ব্যয় বৃদ্ধি করবে। সুতরাং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময়। বাস্তবভিত্তিক স্টাডি করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়, দক্ষ জনবল সৃষ্টি, প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের সঠিক প্রয়োগ, দায়িত্বে অবহেলাকারী বা দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি বা তদবিরের মাধ্যমে আইনের ফাঁক গলে মানহীন নকশা অনুমোদন, সরকারি নির্মাণের ক্ষেত্রে সেফটি-সিকিউরিটি বাদে নকশা প্রণয়ন, অনুমোদন ও কাজ সম্পাদনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের চাহিদা।

এ লক্ষ্যে সবিনয় প্রস্তাবনা : একটি স্বতন্ত্র কমপ্লায়েন্স কমিশন গঠন করা যায়। আইনগতভাবে এবং দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয়সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সমৃদ্ধ করে প্রস্তাবিত কমিশনটি শক্তিশালী করে গঠন করা প্রয়োজন। যেন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত না হয়।

প্রস্তাবিত কমপ্লায়েন্স কমিশন সরকারি, বাণিজ্যিক, আবাসিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাবলিক ও প্রাইভেট হাসপাতাল, সব ধরনের ভবন, কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের স্থাপনা পরীক্ষা করে সেফটি-সিকিউরিটি নিশ্চিত করবে। অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণকালীন গরমিল পর্যবেক্ষণ করবে, নিয়মবহির্ভূত নকশা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের শাস্তি নিশ্চিত করবে।

খাদ্য, পানি, ওষুধের উৎপাদনপ্রক্রিয়া, হাইজিন পর্যবেক্ষণ করবে এবং বাজার থেকে প্রতিনিয়ত নমুনা সংগ্রহ করে মানসম্পন্ন সরকারি ল্যাবে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে পাবলিক সেফটি ও হেলথ ইস্যুগুলোর মান বজায় রাখতে কমিশন কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। কমিশন স্বাধীনসত্তা নিয়ে কাজ করবে এবং নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন বেশ কষ্টসাধ্য, ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু ভিশনারি রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা পারেন না এমন কোনো জনহিতকর বিষয় নেই।

এ কাজে রাষ্ট্র অর্থ বিনিয়োগ করলে সরাসরি রিটার্ন আসবে না। কিন্তু পরোক্ষভাবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় অনেক হ্রাস করবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ অপচয় হ্রাস করবে। সুস্থ জনবল এবং সুন্দর পরিবেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নততর করবে। সুতরাং এই বিনিয়োগ বহুগুণে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধতর করবে।

এরই মধ্যে সরকার দেশপ্রেমিক ফায়ার সার্ভিসের জন্য বহু নতুন যন্ত্রপাতি ও গাড়ি ক্রয় করেছে। বহুতল ভবন ও সরু গলিতে কার্যকর আরো আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং আরো জনবল নিয়োগ, জনবলের নিয়মিত উন্নততর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন নগর, শহরের বিদ্যমান ভূগর্ভস্থ পানির লাইনে বহুসংখ্যক রাইজার নির্মাণ করা প্রয়োজন। যেন কোথাও আগুন লাগলে দ্রুত রাইজারের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস তাদের পাইপ সংযোজন করে পর্যাপ্ত ও নির্বিঘ্ন পানি ব্যবহার করতে পারে।

এ ছাড়া উত্সুক জনতার ভিড় ও অযথা ভিডিও করার মানসিকতা এবং অজস্র চ্যানেলের যুগে সংবাদকর্মীদের অধিকতর মানসম্পন্ন ভিডিও করার তীব্র প্রতিযোগিতা অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কাজে কর্মরত দেশপ্রেমিকদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। কাজের পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখার স্বার্থে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিদ্যুৎ বিভাগ, গ্যাস সঞ্চালন, চিকিৎসা ও পানি সরবরাহ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন, কিছু বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। 

ভিআইপি, রাজনীতিবিদ, সিভিল সোসাইটি, পদস্থ কর্মকর্তা ও মিডিয়াবান্ধব ব্যক্তিদের অগ্নিনির্বাপণকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মিডিয়ায় ছবি দেখানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ওই সময় তাঁদের উপস্থিতি কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে, তাদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় যান চলাচল বিঘ্নিত হয়, নিম্ন পদস্থরা কাজে মনোনিবেশের পরিবর্তে তৈলমর্দনমূলক রিপোর্টিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ছাড়া মিডিয়াপাগল লোকজন ভিআইপির সঙ্গে ছবি তুলে টেলিভিশনে ছবি দেখানোর জন্য মরিয়া হয়ে কাজের পরিবেশ বিঘ্নিত করে। টেকনিক্যাল পারসন ছাড়া পদস্থ ব্যক্তির উপস্থিতি ওই সময় কোনো কাজে আসে বলে আমি বিশ্বাস করি না। বরং পদস্থ ব্যক্তি মিডিয়ায় ছবি দেখানোর জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করে অফিস বা নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে ঠাণ্ডা মাথায় প্রয়োজনীয় সব অর্গ্যানকে সক্রিয়করণ ও সমন্বয়ের কাজ করলে বিষয়টি অনেক ফলপ্রসূ হবে।

প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলের উচিত এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত খবর কভারের জন্য বিশেষায়িত টিম ডেভেলপ করা। যেন সংবাদকর্মীরা সংবাদ সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নির্বাপণ, উদ্ধার ও চিকিৎসা কাজে সামান্যতম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না করেন। মাঝেমধ্যে  প্রতিযোগিতা এমন কদর্য পর্যায়ে উপনীত হয় যে এই মহৎ পেশার প্রতি জনমনে বিরূপ মন্তব্যের উদ্ভব ঘটায়, যা কারো কাম্য নয়।

লেখক : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ 

 

মন্তব্য