kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

ভিন্নমত

ভোক্তা ঠকানোর রকমারি কৌশল

আবু আহমেদ

৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভোক্তা ঠকানোর রকমারি কৌশল

আমাদের সততার ঘাটতির কারণে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যারা সততা শিক্ষা দেবে তারা বহু আগেই অসৎ হয়ে গেছে। আমাদের সমাজে সততার সূচকে যে কী পরিমাণ ধস নেমেছে, আমরা দেখি ছেলে যখন কোনো ঘুষের চাকরি পায় বাপ তখন একটু বেশিই উত্ফুল্ল হয়। আর ওই ছেলের জন্য যখন বউ খোঁজা হয় তখন ছেলের পক্ষ অতি গর্ব করে ছেলের চাকরির বিভিন্ন রকমের সুবিধাগুলো তুলে ধরে। আর প্রায় ক্ষেত্রে কন্যাপক্ষেরও  অনুরূপ ছেলেই পছন্দ। অর্থকে অন্ধভাবে ভক্তি করা এবং দুর্নীতি করার সুযোগকে গৌরবান্বিত করা চলতে থাকলে আমরা সমাজের এই অন্ধকার দিক থেকে কখনো বের হতে পারব বলে মনে হয় না। তবে দুর্নীতি অনেক কমে যাবে যদি দুর্নীতি দমন কমিশন যেসব পদকে এই কাজে ব্যবহার করা হয় ওই সব পদে বসা ব্যক্তিদের ওপর কঠোর নজরদারি রাখে।

আমাদেরও একটা বদ-অভ্যাস আছে। আমরা দুর্নীতির জন্য অর্থ পাওয়ার আগেই অর্থ সেধে বসে থাকি। এতে আমরাও সমভাবে দোষী না হলেও অনেকটা দোষী এ জন্যই যে ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে গিয়ে আমরাও ওই সংস্কৃতিকে প্রমোট করছি। অন্য কথা হলো, লোকজন যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে। বেশির ভাগ লোক অন্যায়কে নিয়তি হিসেবে যেন গ্রহণ করে নিয়েছে। অন্য অনেককে যখন বলি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দরকার, তখন তারা হাসে। তাদের কথা হলো দুর্নীতিকে অর্থায়ন করা ছাড়া কোনো কাজই হবে না।  সর্বসাধারণের যখন এমনই একটা ধারণা জন্ম নেয় যে দুর্নীতিকে অর্থায়ন ছাড়া কোনো কাজই হয় না, তখন দুর্নীতি সমাজের একটা বড় অংশ হয়ে যায়, যেটা নিয়ে শেষ পর্যন্ত জনগণ দুঃখ প্রকাশ এবং ঘৃণা করতে পর্যন্ত ভুলে যায়। দুর্নীতি নানা রকম আছে। অনেকে বিভিন্নভাবে খদ্দেরকে বা ভোক্তাকে প্রতারিত করছে। যেমন—কেউ লিখে রাখল তার দোকানের মাল ৮০ শতাংশ ডিসকাউন্টে বিক্রি হচ্ছে। এটা কি সত্যি? এর পূর্বমূল্য কত? আর অনেকে চালাকি করে পূর্বমূল্য একটা লেখে বটে, তবে সেটাও অনেক বেশি মূল্য, যাতে করে ৮০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দেওয়ার পরও তার অনেক লাভ থাকে। অনেক কম্পানি এখন পণ্যের ওপর এমনভাবে মূল্য লিখছে, যাতে করে দোকানি ওই মূল্যের ওপর ডিসকাউন্ট দিলেও তার অনেক লাভ থাকে। তাহলে ওই লেখা মূল্যের অর্থ কী? এর একটা অর্থ আছে বটে, সেটা হলো আসল মূল্য ও পণ্যের গায়ে লেখা মূল্যের মধ্যে অনেক ফারাক থাকলে সেই পার্থক্যের সুযোগটাই দোকানির বা বিক্রেতার লাভ এবং কম্পানিগুলো বিক্রেতাকে বেশি সুযোগ দিয়ে নিজেদের পণ্যকে বেশি বিক্রি করার প্রয়াস চালাচ্ছে।

আপনি চিকিৎসকের কাছে যান, তিনিও ওষুধের ব্যবস্থাপত্র লিখছেন ওই কম্পানির ওষুধ দিয়ে, যে কম্পানি তাঁকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। এখানেও শিক্ষিত লোকদের বড় নৈতিক অধঃপতন। আরেক রকমের প্রতারণা শুরু হয়েছে গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টি নামে। বৈদ্যুতিক বাতি কিনতে যান, দেখবেন দোকানি বলছে এটা নিয়ে যান, এটার দুই বছরের গ্যারান্টি আছে। বাতির মূল্যই ২০০ টাকা। দুই বছরের মধ্যে ওই বাতির আয়ু যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলেও ৯০ শতাংশ ক্রেতা ওই বাতি নিয়ে ওই দোকানে গিয়ে বলবে না বাতিটা ফেরত নিন, নতুন বাতি দিন। একই কায়দায় ভোক্তাকে প্রতারিত করে যাচ্ছে ফ্রিজ-টিভির কম্পানিগুলোও। প্রত্যেকেই ১০ বছরের ওয়ারেন্টি দিচ্ছে। কিন্তু যারাই ওই ওয়ারেন্টির সুযোগ নিতে গেছে তাদেরই বাড়তি অর্থ দিতে হয়েছে হয় সার্ভিস চার্জের নামে নতুবা কোনো পার্টসের মূল্য বাবদ। তাহলে এসব ওয়ারেন্টির অর্থ কী? শুধুই প্রতারণা। এক ইলেকট্রনিক কম্পানি তাদের পুরনো টিভি সেটের বদলে অর্থ সমন্বয় করে নতুন টিভি সেট দেবে বলে ঘোষণা করল। অমনি পুরনো টিভির মালিকরা উৎসাহ অনুভব করল, বাহ্! কী সুন্দর অফার। পুরনোটার বদলে সামান্য অর্থ দিয়ে নতুন এলইডি টিভি সেট পাওয়া যাবে। আমিও তাদের বিজ্ঞাপন শুনে ওই কম্পানির দোকানে গেলাম। বিক্রেতা বলল, আপনার পুরনোটার জন্য ১০ হাজার টাকা ছাড় দেওয়া হবে, বাকি ৪১ হাজার টাকা দিলে আপনি ৪০ ইঞ্চি একটি টিভি পাবেন। ভাবলাম, পুরনোটা বদল করলেই তো ভালো। কিন্তু আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম যখন আমি অন্য একটি বড় দোকানে প্রবেশ করে ওই একই কম্পানির ৪০ ইঞ্চি টিভির মূল্য জিজ্ঞেস করলাম। ওরা বলল ওই টিভি ৪০ হাজার টাকায় দিতে পারবে। তাদের ক্ষেত্রে কোনো পুরনো টিভি বদল করতে হবে না। ওটার মূল্যই ওই। দেখলেন তো ওই পুরনো কম্পানি ক্রেতা ঠকানোর জন্য কী কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে সত্য হলো, তারা তাদের কৌশলে সফলও হচ্ছে। কারণ বেশির ভাগ গ্রাহকই অন্য দোকানে ওই টিভির মূল্য জিজ্ঞেস করে না?

গ্রাহকরা অতি খুশিতে পুরনো টিভির সঙ্গে বিক্রেতার চাহিদা মতো বাড়তি মূল্য দিয়ে নতুন টিভি নিয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ইলেকট্রিক-ইলেকট্রনিক পণ্যের গায়ে খুচরা  মূল্য লেখা থাকে না। ফলে দোকানি ইচ্ছা করলেই অতিরিক্ত মূল্য চাইতে পারে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইলেকট্রিক-ইলেকট্রনিক পণ্যের ক্ষেত্রে অবস্থাটা হলো যার থেকে যা নিতে পারে। বিশ্বাস করুন আর না-ই বা করুন, এক দোকানে একটা

LED বাতির মূল্য নিল ১২৫ টাকা, দুই দোকান পর ওই একই বাতির মূল্য চাইল মাত্র ৬০ টাকা। একটু তো দুঃখ পেলামই। তবে আগের দোকানে আর ফেরত যাইনি। শুধু ভাবলাম, ভবিষ্যতে কেনার সময় কয়েক দোকানে যাচাই করে ওই সব পণ্য কিনব।

আজকাল অনলাইন মার্কেটিং কম্পানি নামের অনেক কম্পানি বের হয়েছে। অনেকে অনলাইনে শপিংও করছে। কিন্তু তাদের থেকেও শুনছি তারা প্রতারিত হচ্ছে। অনলাইনে দেখাচ্ছে এক পণ্য, ডেলিভারি দিচ্ছে আরেক পণ্য। এ ক্ষেত্রে ভোক্তার অধিকার রক্ষার্থে কোনো রেগুলেশন

(regulation) হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অন্য ক্ষেত্রে ঠকাঠকির একটা ব্যবসা চলছে উবার (Uber) নামের একটা ট্রান্সপোর্ট  কম্পানিতেও। অনেকেই উবারে চড়ে বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছে। অভিযোগ করে প্রতিকার পাওয়ার উপায় নেই। আমার নিজের অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে ভালো নয়। একই সময়ে একই জায়গা থেকে সেই আগের জায়গায় যেতে উবারের একই ট্যাক্সি কখনো নিয়েছে ৩০০ টাকা, কখনো তাদের মিটারে উঠেছে ৫০০ টাকা। এটা কী করে হলো। জবাব নেই। দিতে হবে। দিয়ে দিন। কিছু কম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে চলছে তাদের ক্রিম মুখে মাখলে সুন্দর হওয়া যাবে। যারা সুন্দর হওয়ার আসল পদ্ধতি জানেন, তাঁরা ঠিকই জানেন ক্রিম মেখে কেউ সুন্দর হয় না। কিন্তু তাতে কি, সেই কম্পানি তো বছরের পর বছর ওই মিথ্যা কথা বলেই চলেছে। তাদের লক্ষ্য হলো ভোক্তা ধরা। তবে ওই সব ভোক্তা যারা তাদের কথা বিশ্বাস করবে এবং অন্তত একবার হলেও ওই পণ্য কিনবে! বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের কৌশল হলো সরল বা কম সচেতনতার লোকগুলোকে তাদের গ্রাহক বানানো। এবং তারা দলে দলে তাদের গ্রাহক হচ্ছেও।

পানির ব্যবসার নামে চলছে আরেক জালিয়াতি। রাস্তার ওয়াসার পাইপ থেকে পানির জার ভর্তি করে অফিসে-দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে। তারা বলছে পিউরিফায়েড পানি। আমরা যেসব পণ্য অহরহ কিনছি ওইগুলোতেও ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে। পণ্যের গায়ে লেখা আছে ৫০০ গ্রাম। মাপলে পাওয়া যায় ৪০০ গ্রাম। এটা কি আরেক ধরনের প্রতারণা নয়। বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি সর্বত্রই। যে লক্ষ্যে পণ্যের মান বলতে কিছু নেই। অনেকেই হা-হুতাশ করে বলেন, খাঁটি খাদ্য এবং খাদ্যজাতীয় পণ্য কোথায় পাব। তবে অনেকেই আজকাল সবজিকেও সিদ্ধ করে জল ফেলে দিয়ে পরে রান্না করে। অথচ আমরা একসময় বলতাম সবজিকে পানিতে গরম করলে ভিটামিন চলে যায়। এখন লোকে ভিটামিনকেও ছাড়তে রাজি হয়েছে, তবুও যেন তাজা সবজির নামে ফরমালিন না খায়। সব কথার শেষ কথা হলো, আমরা কাজে এবং বলায় যদি সৎ না হই, তাহলে অসততার বিরুদ্ধে আমাদের এই সংগ্রাম চলবেই; কিন্তু এই সংগ্রামে যে কেউই জয়ী হতে পারব না।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য