kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

দেশের চলচ্চিত্র আজ কোন পথে

ফরিদুর রহমান

৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশের চলচ্চিত্র আজ কোন পথে

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন ভাবনার প্রথম শিলান্যাসের ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৫৭ সালে। এই ঘটনার ৩০ বছর পরে আমরা চলচ্চিত্র বিদ্যার দু-তিনজন উৎসাহী শিক্ষার্থী ভারতের ১১তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। উদ্বোধনী দিন ১৯৮৭ সালের ১০ জানুয়ারি দিল্লিতে শীতের তীব্রতা ছিল যথেষ্ট। আমাদের জন্য তা আরো অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কারণ উৎসবে বাংলাদেশের কোনো ছবি নেই। দুপুরে বিরতির সময় আমরা সবুজ ঘাসে রোদের মধ্যে বসে পতাকা গুনছিলাম। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৪০-৪২টি দেশের পতাকার মধ্যে সংগত কারণেই বাংলাদেশের পতাকা ছিল না। আমরা আশাবাদী হতে চেষ্টা করেছিলাম, একদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফিল্ম ফেস্টিভালে আমাদের পতাকা নিশ্চয়ই উড়বে। পরবর্তী তিন দশকের বেশি সময় ধরে দু-চারটি চলচ্চিত্র উৎসবে স্বল্পদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্যচিত্র, বিকল্পধারা ইত্যাদি সিনেমার সূত্রে পতাকা উড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে মূলধারার চলচ্চিত্র অনুপস্থিত।  

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে উপস্থাপন করেছিলেন ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল। সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিবাচক বিকাশে চলচ্চিত্রের প্রভাব ও গুরুত্ব একজন প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী জননেতার পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন ছিল না। জনসংযোগ, মিটিং-মিছিল, জনসভার মতো প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য-সংগীত এমনকি নাটক ও চলচ্চিত্র যে দেশের মানুষকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে তা তিনি জানতেন এবং আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে তার প্রমাণও পেয়েছি। এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর ষাট দশকের প্রায় পুরোটাজুড়ে চলচ্চিত্র উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে সংস্থাটি।

আমাদের চলচ্চিত্রকে শিল্পের পর্যায়ে উত্তরণে উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েছে এবং প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, মানসম্পন্ন শৈল্পিক চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান প্রবর্তন এবং চলচ্চিত্র সংসদ ও চলচ্চিত্র প্রেমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি এ কথা সত্য। কিন্তু সিনেমার জন্য নিবেদিতপ্রাণ মানুষ, চলচ্চিত্র বোদ্ধা না হলেও চলচ্চিত্রের ধারণাকে শিল্প হিসেবে ধারণ করেন দেশে এমন যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের সত্যিই অভাব কি না জানি না।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এফডিসি তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে দ্রুত উল্টোপথে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় পৌঁছে গেছে তা সবারই জানা। ফলে ১৯৮৭ সালের পরে আরো ৩২ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেনি, এমনকি তথাকথিত সামাজিক ছবি বা সুস্থ বিনোদনের ধারা থেকেও তা ক্রমে দূরে সরে গেছে। চলচ্চিত্র উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের চলচ্চিত্র সম্পর্কে  ধারণা ও আন্তরিকতার অভাব, সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলাসহ সব মৌলিক শিল্পকলার সঙ্গে সম্পর্কহীন নির্মাতাদের আবির্ভাব, কালো টাকাসহ অবৈধ অর্থের দৌরাত্ম্য এবং বাণিজ্যের পুঁজির দাপটে শিল্পের সুকুমারবৃত্তি কোণঠাসা হয়ে পড়ায় চলচ্চিত্র এখন হতাশার নামান্তর। সিনেমা হলে প্রদর্শিত ছবি থেকে দর্শকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ১২ এপ্রিল থেকে দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ একযোগে বন্ধ হয়ে যাবে। এফডিসিতে ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মের ব্যবহার অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ল্যাবরেটরিসহ অনেক যন্ত্র অনুষঙ্গই এখন আর কাজে লাগছে না। অত্যাধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরা, এডিটিং-সেটআপ, কালার কারেকশন এবং শব্দপ্রকৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি এবং কয়েকটি স্টুডিও ফ্লোর ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু শুধু এসব যন্ত্রপাতি ভাড়া দেওয়ার জন্য এত বড় সাদা হাতি পালন করার কোনো দরকার আছে কি না তা ভেবে দেখা দরকার। ‘শৈল্পিক উন্নয়ন’ বা এসথেটিক এক্সেলেন্স যদি অর্জিত না হয়, তাহলে ‘প্রকৌশলগত উন্নয়ন’ বা টেকনিক্যাল এক্সেলেন্স কোনো উন্নয়নই নয়—এ কথা বুঝতে না পারলে ক্যামেরায় ধারণ করা নাচ-গান-নাটক চলচ্চিত্র হয়ে উঠবে না। 

নবীনতম শিল্পমাধ্যম হয়েও চলচ্চিত্র তার শতবর্ষ অতিক্রম করেছে আরো ২২ বছর আগে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমরা এখনো চলচ্চিত্র জিনিসটি কী তা অনুধাবন করতেই সক্ষম হইনি। এখনো সিনেমার অর্থ একটি প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে দুই-আড়াই ঘণ্টা বসে নাচ-গান-নাটকীয়তায় ভরা বিনোদন। তাত্ক্ষণিক উপভোগের এই বিষয়বস্তু আলো-আঁধারির ভেতরে যেমন গভীরভাবে স্পর্শ করে না, তেমনি সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে তা দর্শককে ভাবায় না।

যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি সিনেমা তৈরি হয় অর্থাৎ ভারত, নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানেও মূলধারার বাণিজ্যিক বিনোদনের বাইরে স্বল্প বাজেটে নির্মিত হচ্ছে শিল্পসমৃদ্ধ ছবি। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানে, বুর্কিনাফাসো কিংবা কাজাকিস্তানের মতো ছোট্ট দেশে অথবা যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে যেসব চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে তা আমাদের সিনেমাসংক্রান্ত ধারণাই বদলে দিতে পারে।

চলচ্চিত্রে সমাজবাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক এবং চলচ্চিত্রের মনস্তত্ত্ব নিয়ে চলচ্চিত্র পাঠ, বিশ্লেষণ, গবেষণা ও আলোচনা এবং সার্বিকভাবে একটি চলচ্চিত্র সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ ছাড়া আড়ম্বরের সঙ্গে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস পালনের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের জন্য কিছুই অর্জিত হবে না। 

 

লেখক : বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক 

 

মন্তব্য