kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

১৬ কোটির ১৫

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের ধারক এই ১৫ জন। তাঁদের নিয়ে কালের কণ্ঠ স্পোর্টসের বিশেষ ধারাবাহিক এই আয়োজনে আজ জেনে নিন মুশফিকুর রহিমের বিস্তারিত। লিখেছেন নোমান মোহাম্মদ

২৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৬ কোটির ১৫

চার্টার্ড ফ্লাইটে ফেরার স্বপ্ন

‘আমার মা সাধারণ মায়েদের মতো না। তাঁর কথা বলা, শোনায় সমস্যা আছে। কিন্তু তাঁকে যদি কোনো কাজ দেওয়া হয়, অবশ্যই সময়মতো করে দেবেন। যদি কোনো কাজ করবেন বলে ঠিক করেন, কোনো কিছুই মাকে আটকাতে পারে না। তাঁর এই জেদের পুরোটাই আমি পেয়েছি।’

মাকে নিয়ে কথা বলে কথা! শুরুটা তাই খুব কোমল কণ্ঠে। কিন্তু প্রসঙ্গের শেষ দিকে যেতে যেতেই শক্ত হয়ে যায় চোয়াল। মুখের রেখায় ফুটে ওঠে দৃঢ়তা। কণ্ঠে খেলা করে জেদের আগুন। কারণ মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সে গুণই তো এত দূর নিয়ে এসেছে মুশফিকুর রহিমকে!

সেই তিনিই যখন বিশ্বকাপ-প্রজাপতির ডানার রং এ মানচিত্রজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় জানান, সে কথায় ভরসা করাই যায়, নাকি?

মুশফিকের জীবন ও ক্যারিয়ারের প্রতিশব্দ হয়ে আছে ‘জেদ’। ওই যেমন ছোট্টটি থাকতে জেদ ধরলেন, ব্যাটিং করবেন। ব্যাটের উচ্চতা নিজের চেয়ে বেশি, তবু ব্যাট ছাড়েন না। আর যখন দুয়ের উচ্চতা এক সমতায়, তখন বড় ভাইদের সঙ্গে বগুড়ার মাটিডালির পাড়ার ক্রিকেটের খেলাতেও ছেলেটিকে আউট করা যায় না। ক্রিজ আঁকড়ে থাকার প্রবল জেদ যে ছোট্ট মিতুর!

ছেলের প্রবল আগ্রহ দেখে বাবা মাহবুব হামিদ তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেন বিকেএসপিতে। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের মিডিয়া লাউঞ্জের এক দুপুরে সে দিনগুলোর স্মৃতিচারণায় আবেগ ভর করে মুশফিকের কণ্ঠে, ‘সে সময় আমি সারা দিন মাঠে ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকি। স্কুল ফাঁকি দিয়েও খেলি। রাত জেগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দেখি। আব্বা তাই ভাবলেন, ছেলের যখন ক্রিকেটে এমন আগ্রহ, তাহলে বিকেএসপিতে দিয়ে দেখি না।’

সেই বিকেএসপি বদলে দেয় মুশফিকের জীবন। কিভাবে, তা বলতে গিয়ে মুশফিকের ঠোঁটের কোণে খেলে যায় এক চিলতে হাসি, ‘এর আগ পর্যন্ত আমি পড়াশোনায় মোটেও সিরিয়াস ছিলাম না। বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে তা হলাম। আর ক্রিকেট তো নিয়ে নিলাম সাধনার মতো করে।’ সে সাধনার ফল আসতে দেরি হয় না। ২০০৫ সালে ক্রিকেটতীর্থ লর্ডসে জাতীয় দলের জার্সিতে মুশফিকের অভিষেক হয় মাত্র ১৭ বছর বয়সে।

সেটি পথচলার শুরু। আর থিতু হওয়া ২০০৭ বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সে। ভারতকে হারানো প্রথম ম্যাচে তাঁর হিরণ্ময় হাফ সেঞ্চুরি। ক্রমশ নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে এখন প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে।

মুশফিকের ধ্যান-জ্ঞানজুড়ে এখন শুধুই বিশ্বকাপ। সেখানে নিজের সামনে ঠিক করেছেন বড় লক্ষ্য। ম্যাচ জেতাতে হবে। সেঞ্চুরি করতে হবে। দলকে শিরোপাও জেতাতে হবে। ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফেরার একটি ছবিও মনে মনে এঁকে রেখেছেন মুশফিক, ‘গত বছর তিনটি ফাইনাল হারের পর আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য হয়তো আরো বড় ট্রফি অপেক্ষা করে আছে। বিশ্বকাপই তো জিততে পারি। তাহলে হয়তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করবেন। ইংল্যান্ড থেকে বিশ্বকাপ হাতে চার্টার্ড ফ্লাইটে ফেরার স্বপ্ন দেখি আমি।’

জেদি মুশফিক যখন অমন স্বপ্ন দেখছেন, আশার ফড়িং তাই ওড়ানোই যায়।

 

ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে চাই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ নিয়ে আপনার প্রথম স্মৃতি কী?

মুশফিকুর রহিম : ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাগল সমর্থক ছিলাম তো। সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারার পর কান্নাকাটির মতো অবস্থা হয়।

প্রশ্ন : নিজে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন ২০০৭ সালে। সেটি কতটা বিশেষ?

মুশফিক : অবশ্যই বিশেষ কিছু। মাঠে আমরা খুব ভালো খেলেছি। এ ছাড়া আমার কাছে সেটি স্পেশাল হয়ে আছে ব্রায়ান লারার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার কারণে। সত্যি বলছি, ২০০৭ বিশ্বকাপে যাওয়ার সময় নিজের পারফরম্যান্সের চেয়ে ওই ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তির সঙ্গে দেখা হওয়া নিয়ে বেশি রোমাঞ্চিত ছিলাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখা হলো। আমি লারাকে গিয়ে বলি, ‘আমি ও আমার ভাই-বোনরা তোমার অনেক বড় ভক্ত। তোমার জন্মদিনও আমরা উদ্‌যাপন করি।’

প্রশ্ন : তিন বিশ্বকাপ খেলেছেন। এর মধ্যে প্রিয় বিশ্বকাপ স্মৃতি?

মুশফিক : ২০০৭ সালে ভারতকে হারানোটা। ওদের দলে তখন টেন্ডুলকার-দ্রাবিড়-গাঙ্গুলির মতো কিংবদন্তিরা। আমার প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচই তাদের বিপক্ষে। সেখানে অপরাজিত ফিফটি করি, ম্যাচ জেতানো শট খেলি—এগুলো তো স্বপ্নের মতো ব্যাপার।

প্রশ্ন : ২০১৯ বিশ্বকাপে স্বপ্নের মতো ইনিংস হতে পারে কোনটি?

মুশফিক : ইচ্ছে আছে, সবার সঙ্গে ভালো করার। আর গত এক বছরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভালোই তো খেলেছি, তাই না? তবে একটি দল বললে আমি বলব, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে চাই। সেটি আমার ক্যারিয়ারের জন্য খুব ভালো হবে।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপে আপনার কোনো সেঞ্চুরি নেই। এ অপ্রাপ্তি ঘোচানোর লক্ষ্য থাকবে নিশ্চয়ই?

মুশফিক : অবশ্যই। আমার এখন ২০০-র ওপর ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা। তা কাজে লাগিয়ে বিশ্বকাপে কয়েকটি সেঞ্চুরি তো হতেই পারে। তাহলেই তিন বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি না পাওয়ার দুঃখ আর থাকবে না।

 

টার্নিং পয়েন্ট

২০০৫ সিরিজের ইংল্যান্ড সফরে কাউন্টি দলের বিপক্ষে সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরি করি। তাতেই জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয়।

 

সিক্রেট

ছোটবেলায় ভালো তবলা বাজাতে পারতাম। কিন্তু এটি সাধনার ব্যাপার তো; চর্চার অভাবে তা এগোয়নি। অবশ্য এখনো খুব ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতে পারি।

 

সেরা ম্যাচ

২০১৮ সাল আমার ক্যারিয়ারের সেরা বছর। টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ২১৯ রান এবং ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৪৪ রানের ইনিংস দুটোকে বলতে পারি সেরা ম্যাচ।

 

নিজের শক্তি

ব্যাটিংয়ে কাভার ড্রাইভ আর স্লগ সুইপ। আরেকটি বড় শক্তি, ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝতে পারি। স্পিনের বিপক্ষে কিপিংটাও শক্তি।

 

দুর্বলতা

পাওয়ার হিটিং নিয়ে অনেক কাজ করার আছে। পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে শুরু থেকে যেন আরো স্বচ্ছন্দে ব্যাটিং করতে পারি, সে চেষ্টাও করছি।

 

ক্যরিয়ার লক্ষ্য

৪০-এর ওপর গড় রেখে যেন টেস্ট-ওয়ানডে ক্যারিয়ার শেষ করতে পারি। আর বাংলাদেশের হয়ে একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট জিততে চাই। সে জন্য এই বিশ্বকাপই হয়তো সবচেয়ে ভালো সুযোগ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা