kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

১৬ কোটির ১৫

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের ধারক এই ১৫ জন। তাঁদের নিয়ে কালের কণ্ঠ স্পোর্টসের বিশেষ ধারাবাহিক এই আয়োজনে আজ জেনে নিন আবু জায়েদ চৌধুরীর বিস্তারিত। লিখেছেন মাসুদ পারভেজ

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৬ কোটির ১৫

দেশের হয়ে বিশ্বকাপে এক দেশান্তরি

আমাকে দিয়ে আর কিচ্ছু হবে না! এই ভেবে একসময় ক্রিকেটের ওপর থেকেই মন উঠে গিয়েছিল। খেলাটির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে তাই হয়েছিলেন দেশান্তরিও।

যেখানে তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা, সেই অঞ্চলের সঙ্গে একটি ‘লন্ডন কানেকশন’ও আছে। সিলেটিরা সাধারণত ভাগ্যান্বেষণে লন্ডনেই যায়। হাল ছেড়ে দেওয়া ক্রিকেটার গেলেন না সেখানেও। নিজের ভবিষ্যৎ ঠিকানা হিসেবে বেছে নিলেন যুক্তরাষ্ট্রকে। প্রথমে অবশ্য ঘুরতেই গিয়েছিলেন। এরপর আস্তে আস্তে যখন মাথায় সেখানে থিতু হওয়ার চিন্তা গেড়ে বসছে, তখনই আবু জায়েদ চৌধুরী রাহিকে জীবন বদলে দেওয়া এক পরামর্শ দিয়ে বসেন খুব কাছের এক বড় ভাই।

তা কতটা অনুপ্রেরণাদায়ী হলেই না ঝটপট ব্যাগ গুছিয়ে আবার দেশের পথ ধরেন এই পেসার! তাঁর মধ্যে শেষ চ্যালেঞ্জ নেওয়ার তাগিদ উসকে না দিলে যে আজ দেশের হয়ে বিশ্বকাপেই যাওয়া হতো না এই দেশান্তরির। এত দিন পর সেই কথা মনে করে ওই বড় ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়েও আসে জায়েদের। তাঁর কথা শুনে দেশে ফেরার পর ক্রিকেটই হয়ে যায় তাঁর ধ্যান-জ্ঞানও, “ক্রিকেট না খেললে আমি বাঁচব না—দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি এ রকমও ছিল না। শখের বশে ক্রিকেট খেলেছি তখন। কোচরাও বলতেন, ‘কিছুদিন খেলে না পারলে তখন বিদেশ চলে যেও।’ আমি যখন দেখলাম যে আর পারছি না, তখন বাইরেই চলে গেলাম।”

অথচ তত দিনে দেশের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপও খেলা হয়ে গেছে তাঁর। অস্ট্রেলিয়ায় ২০১২-র আসর খেলে যখন আরো বড় বিশ্বমঞ্চে পারফরম করার স্বপ্ন চকমকিয়ে ওঠার কথা, তখনই হাল ছেড়ে দিলেন আবু জায়েদ। কিন্তু কেন? ‘২০১২-র পর একটি মৌসুম খুবই খারাপ গেছে আমার। ইনজুরিও ছিল। সাইড স্ট্রেইনের জন্য পারফরমও করতে পারছিলাম না ঠিকঠাক।’ সেই হতাশার মধ্যেই উন্নত জীবনও দিল হাতছানি। ব্যস, সব ছেড়ে চলেও গেলেন। এরপর একদিন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রে আমার এক বড় ভাই আছেন। নাম মওলুদ ভাই। তিনিই একদিন বললেন, ‘এখানে থেকে কী করবে? দেশে গিয়ে ক্রিকেটটাই খেলো না। আরেকবার শেষ চেষ্টা করে দেখো।’ মনে হলো, দেখি না চেষ্টা করে আরেকবার, হয় কি না। ওই চলে এলাম।’’

ফিরে বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা দুই সাবেকের বকুনিও খেলেন বেশ, ‘‘আসলে সিলেটে সবারই আশা থাকে যে ছেলে বিদেশে থাকবে। সবাই চিন্তা করে এসএসসি বা এইচএসসির পর ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেবে। আমার পরিবারেরও তাই ইচ্ছা ছিল। কারণ আমাদের পরিবারের প্রায় সবাই বিদেশেই থাকে। কিন্তু আমি চলে গিয়েছিলাম বলে উল্টো অলক (কাপালি) ও রাজিন (সালেহ) ভাইয়ের বকা খেলাম। ওনারা বললেন, ‘ধুর গাধা। আমাদের এমনিতেই পেস বোলার নেই। তুই সিলেটের হয়ে জাতীয় লিগ খেল আগে।’ আবার শুরু করলাম জাতীয় লিগ দিয়েই।’’

সেই লিগে দারুণ পারফরম করে ডাক পেলেন হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) স্কোয়াডে। এইচপির শিবিরেই সহজাত আউট সুইংয়ের সঙ্গে ইনসুইংও যোগ করে শাণিত হলেন আরো। আর সুইং করানোর বাড়তি ক্ষমতার জন্যই বিশ্বকাপ দলে ঠাঁই হয়েছে এই দেশান্তরির!

 

মার খেলেও সুইং করিয়েই যাব

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ দেখার প্রথম স্মৃতি কোনটি?

আবু জায়েদ চৌধুরী : রিকি পন্টিং প্রথম যেবার (২০০৩) অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জিতলেন, সেই আসরটির কথা খুব ভালোভাবে মনে আছে। এরপর তো আরো অনেক দেখেছি।

প্রশ্ন : নিজে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন প্রথম দেখেন কবে?

আবু জায়েদ : সত্যি কথা বললে, বিশ্বকাপকে প্রথম বড় কিছু বলে মনে হতে শুরু করে ২০১১ সালে। ওই যে বাদ পড়ে মাশরাফি ভাই কাঁদলেন আর তাঁর জায়গায় সুযোগ পেলেন নাজমুল (হোসেন) ভাই। তখনই বিশ্বকাপকে অনেক বড় কিছু বলে মনে হতে শুরু করে আমার। তাই বলে তখনই বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন আমার মধ্যে তৈরি হয়নি।

প্রশ্ন : কখন হয়েছিল?

আবু জায়েদ : ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পর। তখন সবাই বলাবলি করছিল যে ২০১৫-তে সেখানেই হবে বড়দের বিশ্বকাপও। ছোটদের বিশ্বকাপে ভালো করতে পারলে খুলে যেতে পারে বড়দের আসরের দরজাও। ওভাবেই বিশ্বকাপ খেলার চিন্তা মাথায় ঢোকে। আমি হয়তো পরেরবারই পারিনি; কিন্তু আমাদের একজন ঠিক পেরেছিল। তাসকিন সেই অস্ট্রেলিয়াতেই বড়দের বিশ্বকাপ খেলেছিল।

প্রশ্ন : এবার আপনি বিশ্বকাপে যাচ্ছেন আপনার সুইং করানোর দক্ষতার জন্য। নিজের কাছে নিজের প্রত্যাশা কী?

আবু জায়েদ : সুইং করানোর বিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছি। মার খেলেও আমি সুইং করিয়েই যাব। আমার বোলিংয়ের যে গতি, তাতে টিকতে হলে সুইং করিয়েই টিকতে হবে। একদিন একটু জোরে বোলিং করে (সারোয়ার) ইমরান স্যারকে গিয়ে বলেছিলাম, ‘স্যার, বল তো খুব জোরে হচ্ছে।’ স্যার উল্টো ধমক দিয়ে বললেন, ‘ধুর মিয়া, জোরে বোলিং করে তুমি উইকেট নিতে পারবে না। তোমার কাজ সুইং করানো। সেটিই করে যাও। তোমার ১৪০-এ বোলিং করানোর দরকার নেই। ১৩০-৩৩, এই গতিতে বোলিং করে সুইং করিয়ে যেতে থাকো।’ স্যারের কথাটা আমি সব সময় মনে রাখি।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপের জন্য কোনো ব্যক্তিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন?

আবু জায়েদ : লক্ষ্য ঠিক করে নিজের ওপর চাপ নিতে চাই না কোনো। বিশ্বকাপে প্রতিটা উইকেটই আমার স্বপ্নের উইকেট। দলের জন্য উইকেট নেওয়াই লক্ষ্য। দলের জন্য যদি ৯ নম্বর উইকেটও নিয়ে দিতে হয়, সেটি নিতে পারলেই আমার লক্ষ্য পূরণ হবে।

 

টার্নিং পয়েন্ট

২০১৩-১৪ মৌসুমের জাতীয় ক্রিকেট লিগ। আবার সিরিয়াসলি ক্রিকেট খেলতে শুরু করার পর ওই আসর দিয়েই নজর কাড়ি। সিলেট বিভাগের হয়ে ৬ ম্যাচ খেলে ২৩টি উইকেট পেয়েছিলাম সেবার। ওই পারফরম্যান্সের সূত্র ধরেই তো এইচপিতে সুযোগ হয়। উন্নতির শুরুও সেখান থেকেই। 

 

সিক্রেট

বড়শি দিয়ে মাছ ধরায় দক্ষতা আছে আমার। সময়-সুযোগ পেলেই তাই মাছ ধরতে চলে যাই। একবার তো বেশ বড় এক কালবাউশ মাছ বড়শিতে গেঁথেছিলাম।

 

সেরা ম্যাচ

ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে খেলা ২০১৬-র বিপিএল ফাইনাল। আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে ৩ ওভারে মাত্র ১২ রান দিয়ে আমিও নিয়েছিলাম ২ উইকেট।

 

নিজের শক্তি

মানসিকভাবে খুব শক্ত আমি। সেই সঙ্গে বল সুইং করানোর ক্ষমতা অবশ্যই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।

 

দুর্বলতা

আমার ব্যাটিং। সম্ভব হলে এই জায়গাতে উন্নতি করতে চাই।

 

ক্যারিয়ার লক্ষ্য

বাংলদেশ দলে যেন অনেক দিন খেলতে পারি। আরেকটি লক্ষ্যও আছে। টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে সেরা ১০ বোলারের মধ্যে আসা। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা