kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

১৬ কোটির ১৫

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের ধারক এই ১৫ জন। তাঁদের নিয়ে কালের কণ্ঠ স্পোর্টসের বিশেষ ধারাবাহিক এই আয়োজনে আজ জেনে নিন রুবেল হোসেনের বিস্তারিত। লিখেছেন নোমান মোহাম্মদ

২১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৬ কোটির ১৫

বাদার ছেলে বাদ্যি বাজাবে আবার!

বিশ্বকাপ শুরু হতে দেড় মাসও বাকি নেই। স্বপ্নঘুড়ি উড়িয়ে বোলিং-উইকেট-অনুশীলন এসবেই তো অখণ্ড মনোযোগ থাকার কথা। তা না, ওই পেসারের চারদিকে তখন মামলা-উকিল-আদালত-পুলিশের শব্দজট। সে ধাঁধার সমাধান করতে না পেরে এমনকি যেতে হয় জেল পর্যন্ত। বসন্ত বাতাসের আবহে সে কী বৈশাখী প্রলয়! কী দুঃসহ দুঃসময়!

চার বছর আগের ওই বিপর্যস্ত অবস্থা ভোলেননি রুবেল হোসেন। ভুলে যাননি ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে আগে বলা নিজের কথাটিও। ‘আমার ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বকাপের ওপর। এখানে ভালো করতেই হবে। নইলে ক্রিকেট-জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাবে একেবারে’— কালের কণ্ঠের সাক্ষাৎকারে রুবেলের সে উচ্চারণে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা আর হার না মানার প্রতিশ্রুতি। ঠিকই তো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় দুই ডেলিভারিতে ক্যারিয়ার আবার কক্ষপথে নিয়ে আসেন। বাংলাদেশকে নিয়ে যান কোয়ার্টার ফাইনালের স্বর্ণালি গন্তব্যে।

ওই ক্রিকেট-রূপকথায় রুবেলের শেষাঙ্কের নায়ক হয়ে ওঠা গল্পের চর্চা এই জনপদে চলবে বহুকাল। বলা ভালো, অনন্তকাল!

এক চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর দায়ের করা মামলায় রুবেলের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যায় সে ঝড়। তা সামলে ঠিকই বেরিয়ে আসেন বীরবেশে। এবার বিশ্বকাপযাত্রার আগের দিন তুমুল ব্যস্ততার মাঝেও তাই দিয়ে যান প্রতিশ্রুতি, ‘খানিকটা ইনজুরি আছে। তবে তা আমি পাত্তা দিই না। বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতানোর জন্য, বিশ্বকাপ জেতানোর জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সবই করব আমি।’

এই প্রতিজ্ঞার ব্যাপারটি তাঁর মধ্যে সেই ছোট্টটি থেকে। উড়নচণ্ডী ছেলেটির ক্রিকেটের সঙ্গে সখ্যের কথা তখন এলাকার সবার জানা। ঝুম বৃষ্টিতে পর্যন্ত ফাইভস্টার বলে বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাট-বলের খেলায় ক্লান্তি নেই। খেপ খেলার জন্য ডাক আসে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জায়গা থেকে। ফাস্ট বোলিং করা রুবেল ব্যাটিংয়ে ওপেন পর্যন্ত করেন বাগেরহাট লিগে—চাহিদা তাই তুঙ্গে। গ্রামীণফোন পেসার হান্টে তাই ভালো কিছু করবেন, সেটিই ছিল প্রত্যাশিত।

কিন্তু প্রথমবার যে প্রাথমিক পরীক্ষাতেই বাদ! খুলনা অঞ্চলেও টিকলেন না। হাল না ছেড়ে পরেরবার আবার নাম লেখালেন। এবার শুধু খুলনা না, পুরো বাংলাদেশেই প্রথম। ব্যস, রুবেলকে আর পায় কে!

এরপর তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পালা। বিসিবি একাডেমি, অনূর্ধ্ব-১৯, ‘এ’ দল হয়ে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ওঠে ২০০৯ সালে। অভিষেক ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চার উইকেট। শুধু পারফরম্যান্স না, নজর কাড়লেন লাসিথ মালিঙ্গার মতো সাইড আর্ম অ্যাকশনের কারণেও।

ইনজুরির পর সে অ্যাকশন বদলেছে। তবে কার্যকারিতা আছে আগের মতোই। ৯৭ ওয়ানডেতে ১২৩ উইকেটের রেকর্ড তেমন জ্বলজ্বলে হয়তো না। কিন্তু যখন জানবেন, এরই মধ্যে ইনিংসে চার উইকেট নিয়েছেন আটবার—তখন অবাক না হয়ে উপায় কী! আর পরিস্থিতি যত বিরূপ, রুবেল যে ততই বিক্রমশালী—গত বিশ্বকাপই এর প্রমাণ।

এ রুবেল যেন তাই সুন্দরবনে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকাদের প্রতিনিধি। যে বনকে স্থানীয় লোকজন বলে বাদা। বাদার ছেলে আবার বল হাতে বাদ্যি বাজাবে বিশ্বকাপে—এই প্রত্যাশা এবার তাই শুধু সুন্দরবনের কোলঘেঁষা বাগেরহাটের না, পুরো ৫৬ হাজার বর্গমাইলের।

 

সেরা পাঁচ বোলারের মধ্যে থাকতে চাই

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ নিয়ে প্রথম স্মৃতি কী?

রুবেল হোসেন : ২০০৩ বিশ্বকাপ আবছা আবছা মনে আছে। ভালোভাবে মনে পড়ে ২০০৭ বিশ্বকাপ। সেখানে বাংলাদেশ হারায় ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে। বিশেষত ভারতকে হারিয়ে মনে হয়েছে, আমরা যেন বিশ্বকাপ জিতে গেছি। বাগেরহাটে বন্ধু রাজুর বাসায় আমরা অনেকে মিলে খেলাটি দেখি। সে ম্যাচ জেতার পর এত আনন্দ করি, যা বলার মতো নয়।

প্রশ্ন : ওই সময় কি ভেবেছিলেন, পরের বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের জার্সি গায়ে খেলবেন?

রুবেল : প্রশ্নই ওঠে না। তখনো পুরোপুরি ক্রিকেটার হয়ে উঠিনি, শুধুই সমর্থক। এরপর খুব দ্রুত সব কিছু হয়ে গেল। ২০০৯ সালে অভিষেক, ২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলা—সবই স্বপ্নের মতো। অবশ্য সে টুর্নামেন্টে বলার মতো তেমন কিছু করতে পারিনি।

প্রশ্ন : ২০১৫ বিশ্বকাপে তো করেছিলেন...

রুবেল : (হেসে) তা করেছিলাম। এটি ছাড়া আমার আসলে উপায় ছিল না। ওই বিশ্বকাপের আগে আমার জীবনের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে, আপনারা সবই জানেন। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে তাই খেলতে যাই জান বাজি রেখে। তবে সত্যি বলতে কি, ওই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে খুব ভালো বোলিং করছিলাম না। এরপর সেই ম্যাচ। চার উইকেট নিলাম। তার চেয়ে বড় কথা, শেষ দুটি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে তুলে দিলাম কোয়ার্টার ফাইনালে।

প্রশ্ন : এবারের বিশ্বকাপেও তেমন কিছু করার স্বপ্ন নিশ্চয়ই দেখেন?

রুবেল : আরো বড় স্বপ্ন দেখি। গতবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পারলে এবার আরো দূর কেন যেতে পারব না? সেমিফাইনালের কথা বলতে পারেন। আমি কিন্তু মনে করি, বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বকাপ জয়ও সম্ভব।

প্রশ্ন : তাতে নিজের ভূমিকা?

রুবেল : সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে আমাকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। নিজে একটি লক্ষ্য ঠিক করেছি। বিশ্বকাপের সেরা পাঁচ বোলারের মধ্যে থাকতে চাই। আর অবশ্যই গতবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যেমন বোলিং করেছিলাম, তেমন বিধ্বংসী কিছু করতে চাই। তা হতে পারে ভারত, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। অথবা আমার প্রিয় প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ওদের সঙ্গে কেন যেন আমি সব সময় ভালো করি।

 

টার্নিং পয়েন্ট

বিসিবি একাডেমির হয়ে পাকিস্তান ‘এ’ দলের বিপক্ষে চার উইকেট। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার ক্ষেত্রে সেটি টার্নিং পয়েন্ট। আর পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই দুটি বল ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।

 

সিক্রেট

গান গাইতে পারি। ক্লাস এইটে পড়ার সময় থেকেই বাগেরহাটে এলাকার অনুষ্ঠানে গান গাইতাম বড় ভাইদের সঙ্গে। জাতীয় দলে আসার পর টিভিতেও ঈদের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছি।

 

সেরা ম্যাচ

২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে জেতানো চার উইকেট। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকায় ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ছয় উইকেট নেওয়ার কথাও বলতে হবে।

 

নিজের শক্তি

পেস-বাউন্সার-ইয়র্কার। আর মানসিক শক্তি। বড় ম্যাচে দলের প্রয়োজনে পারফরম করতে পারি। ব্রেক থ্রু এনে দিতে পারি।

 

দুর্বলতা

পুরনো বলে যত ভালো বোলিং করি, নতুন বলে ততটা না।

 

ক্যরিয়ার লক্ষ্য

জাতীয় দলে আরো অন্তত পাঁচ বছর খেলতে চাই। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তিন শ-সাড়ে তিন শ উইকেট নিতে চাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা