kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

১৬ কোটির ১৫

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের ধারক এই ১৫ জন। তাঁদের নিয়ে কালের কণ্ঠ স্পোর্টসের বিশেষ ধারাবাহিক এই আয়োজনে আজ জেনে নিন লিটন কুমার দাশের বিস্তারিত। লিখেছেন নোমান মোহাম্মদ

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৬ কোটির ১৫

মেঠো পথ থেকে রূপসী বিশ্বমঞ্চে

এক আকাশ মেঘ জমে মমতাময়ীর চোখের কোলে। এক সাগর বৃষ্টি ঝরে। ওইটুকুন বয়সে নাড়িছেঁড়া ধনকে কিভাবে দূরে পাঠাবেন? তা-ও আবার ক্রিকেটের জন্য! যে খেলা নিয়ে দিনমান পড়ে থাকায় ছেলেটিকে তো কম বকুনি দেননি; কম মারেননি। এখন কিনা সেই ক্রিকেটের কারণেই আদরের সন্তানকে কোন সুদূরের বিকেএসপিতে পাঠাতে হবে!

ভাগ্যিস, অনিতা দাশ রাজি হয়েছিলেন সেদিন। তাতেই আনন্দের পলাশ-শিমুল ছড়ানো রঙিন এক যাত্রাপথ খুঁজে পায় তাঁর ছোট ছেলে লিটন কুমার দাশ। দিনাজপুরের মেঠো পথ থেকে বিকেএসপির সবুজ চত্বর। বিকেএসপি থেকে জাতীয় দলের রূপকথামাখা ভুবন। এরপর এবারের এই বিশ্বকাপের রূপসী বিশ্বমঞ্চে।

লিটনের তাই মায়ের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। জীবনের বাঁকবদলের সবচেয়ে বড় মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ত্যাগটা যে গর্ভধারিণীই, ‘মা আমাকে সেদিন না ছাড়লে ক্রিকেটার হতে পারতাম না। এ জন্য তাঁর কী যে কষ্ট হয়েছে, তখন বুঝিনি। এখন বুঝি। অথচ জানেন, ক্রিকেটটা তিনি একদম বুঝতেন না। আমার সেই মা এখন টিভিতে সব ক্রিকেট দেখেন। আমাকে ফোন করে এমন এমন সব ম্যাচের খবর দেন, যেগুলো আমিও দেখিনি।’ বলে লিটন হাসেন। শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমের করিডরে বসা এই ব্যাটসম্যানের চোখজোড়া কি একটু চিকচিক করেও ওঠে না!

১৪ বছরের লিটন বিকেএসপিতে ভর্তি হন ২০০৮ সালে। ওই কিশোরের চোখে তখন স্বপ্নের মায়াঞ্জন আঁকা। প্রিয় ব্যাটসম্যান মাইকেল ক্লার্কের মতো হতে হবে। প্রিয় উইকেটরক্ষক মার্ক বাউচার, ব্রেন্ডন ম্যাককালামের মতো না হলে চলবে না। স্কুল ক্রিকেট থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সিঁড়ি বেয়েছেন তরতরিয়ে। প্রিমিয়ার লিগে রানের ফল্গুধারা বইয়ে দিয়ে ২০১৫ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা পর্যন্ত তৈরি করেন। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

তবে বিশ্বকাপের পর পর ভারতের বিপক্ষে টেস্টে গায়ে উঠে যায় বাংলাদেশের জার্সি। সময়ের ছেঁড়া পাতা থেকে জানা যায়, ফতুল্লায় লিটনের ওই অভিষেকক্ষণে বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনের উচ্ছ্বাস। সর্বজনশ্রদ্ধেয় কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম তাঁর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, ‘একজন তারকা আসছে।’ টেস্ট না খেলা মাশরাফি বিন মর্তুজাও লেখেন, ‘ছেলেটিকে দুই বছর খেলতে দিন, সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

কিন্তু শুরুর সেই প্রতিশ্রুতির কতটা তিনি পূরণ করতে পেরেছেন? টেস্টে শ্রীলঙ্কা-দক্ষিণ আফ্রিকা, টি-টোয়েন্টিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-শ্রীলঙ্কা আর ওয়ানডেতে এশিয়া কাপ ফাইনালের সেই অত্যাশ্চর্য ইনিংস— এই তো! নিজের সামর্থ্যের প্রতিফলন যে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নেই সেটি ভালো করেই জানা লিটনের, ‘চার বছর জাতীয় দলে খেলছি, কোনোটিতেই আমার গড় ২৫ হয়নি। এত খারাপ ব্যাটসম্যান বোধ হয় আমি নই।’ সে কারণেই এবারের বিশ্বকাপে তাঁর কাছে ক্যারিয়ারের বাঁকবদলের আরেক উপলক্ষ হয়ে এসেছে, ‘এ বিশ্বকাপে এমন কিছু করতে চাই, যেখান থেকে আমার ক্যারিয়ার অন্য পর্যায়ে উঠে যাবে।’

তা যদি লিটন পারেন, তাহলে টিভিতে খেলা দেখতে দেখতে দিনাজপুরের এক মমতাময়ীর চোখজোড়া আবার ভরে উঠবে জলে। এবার আর তা কেবল অশ্রু নয়, আনন্দাশ্রু হয়ে!

 

আমার স্বপ্নের ইনিংসটি অন্য রকম

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ নিয়ে আপনার প্রথম স্মৃতি?

লিটন দাশ : আলাদা কোনো ম্যাচের কথা বলতে পারব না। তবে টেন্ডুলকার-শেবাগদের ব্যাটিং দেখে বড় হয়েছি; গিলক্রিস্ট-মাইকেল ক্লার্কদের ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হয়েছি। টেলিভিশনের সামনে বসে এসব কিংবদন্তির ব্যাটিং দেখাই আমার স্মৃতিতে আছে বেশি করে।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপে স্বপ্নের ইনিংস হতে পারে কেমন?

লিটন : আমি বড় ইনিংস খেলতে চাই। বড় ইনিংস খেলতে হলে ক্রিজে অনেকক্ষণ থাকতে হবে। এক রান, দুই রান নিতে হবে; চার মারতে হবে, ছয় মারতে হবে। তখন কত রকম শট এমনিতেই চলে আসবে! আমার ব্যাটিং দেখে অনেকে অনেক প্রশংসা করেন। কিন্তু আমি সন্তুষ্ট হতে পারি না। মনে হয়, আরো ভালো খেলতে পারতাম। আমার স্বপ্নের ইনিংসটি তাই অন্য রকম। বিশ্বকাপে যদি এমন একটা ইনিংস খেলতে পারি, পরে সে ইনিংসের ভিডিও দেখে নিজের মনে হবে, ‘ওয়াও, খুব ভালো খেলেছি তো’—সেটিই হবে স্বপ্নের ইনিংস।

প্রশ্ন : কোন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভালো করার বেশি তাড়না থাকবে?

লিটন : নিউজিল্যান্ড সফরে তিন ওয়ানডেতে আমি করেছি ১, ১ ও ১ রান। এটি আমাকে খুব তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ওখানে অত ভালো উইকেটে ব্যর্থ হওয়ায় নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। আমার তাই খুব ইচ্ছে, বিশ্বকাপে যদি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাই, তাহলে যেন অনেক বড় ইনিংস খেলতে পারি। যেন আগের সিরিজের দুঃখ ভুলে যাওয়ার মতো ইনিংস খেলতে পারি।

প্রশ্ন : ম্যান অব দ্য ম্যাচ হতে চান কোন ম্যাচে?

লিটন : বিশ্বকাপে যেকোনো খেলাতেই ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়াটা হবে অনেক বড় প্রাপ্তি। এর পরও যেহেতু ইংল্যান্ডে খেলা, এশিয়ার বাইরের অন্য দেশের বিপক্ষে অমন পুরস্কার পেলে বেশি ভালো লাগবে। ভবিষ্যতের জন্য অনেক আত্মবিশ্বাস পাব।

 

টার্নিং পয়েন্ট

বিকেএসপিতে শুরুতে ব্যাটিং করতাম ৫/৬ নম্বরে। কোচ মন্টু দত্ত স্যার একদিন বললেন ‘টপ অর্ডারে ব্যাটিং না করলে বড় ব্যাটসম্যান হতে পারবি না।’ এর পরই আমি ওপেনার হয়ে যাই।

 

সিক্রেট

বেশির ভাগ লোক আমাকে অন্তর্মুখী হিসেবে জানে। আসলে বেশি পরিচিতিজনদের সঙ্গে আমি খুব হাসিঠাট্টা করি। বিকেএসপির বন্ধুমহলে আমাকে দেখলে অনেকেই বলবেন, ‘এটি তো চেনা লিটন দাশ না’।

 

সেরা ম্যাচ

অবশ্যই এশিয়া কাপের ফাইনাল। ভারতের বিপক্ষে সেদিন ব্যাটিংয়ে যা করতে চেয়েছি, তা-ই পেরেছি।

 

নিজের শক্তি

যেদিন ছন্দে থাকি, খুব ভালো খেলি। আর আমার স্ট্রাইক রেট সব সময় ভালো।

 

দুর্বলতা

আমার কোনো কিছুই নিখুঁত না। সব কিছু নিয়েই কাজ করার আছে।

 

ক্যারিয়ার লক্ষ্য

ফিটনেস-পারফরম্যান্স ধরে রেখে ১০-১৫ বছর জাতীয় দলে খেলতে চাই। চাই খেলার ছাড়ার পর লোকে যেন বলে, ও একজন ভালো ব্যাটসম্যান ছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা