kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

১৬ কোটির ১৫

স্ত্রীর তাড়া খেয়েই বিশ্বকাপে

১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্ত্রীর তাড়া খেয়েই বিশ্বকাপে

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের ধারক এই ১৫ জন। তাঁদের নিয়ে কালের কণ্ঠ স্পোর্টসের বিশেষ ধারাবাহিক এই আয়োজনে আজ জেনে নিন মোহাম্মদ মিঠুনের বিস্তারিত। লিখেছেন মাসুদ পারভেজ

 

বিয়ে করে তিনি সংসারী হয়েছেন সেই কবেই। বাবাও হয়েছেন। তবে মোহাম্মদ মিঠুনকে তাঁর স্ত্রী নিগার সুলতানা পিতৃত্বের অনন্য স্বাদই উপহার দেননি শুধু, পেশাদার জীবনে সফল হওয়ার পথও খুঁজে দিয়েছেন। অনিয়মে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে থাকা ক্রিকেটারকে দিয়ে গেছেন নিয়মনিষ্ঠ হওয়ার তাড়াও। যে তাড়া না খেলে আজ বিশ্বকাপ দলে থাকতেন কি না, তা নিয়ে তাঁর নিজেরই সন্দেহ!

এ জন্যই এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানের অকপট স্বীকারোক্তি, ‘ক্রিকেটটাকে আমার সিরিয়াসলি নেওয়ার শুরু আসলে বিয়ের পরেই। এতে আমার স্ত্রীর অনেক অবদান। ওর অনুপ্রেরণা আমার অনেক কাজে দিয়েছে। ওর কিছু কথাই আমার ক্যারিয়ার বদলে দিয়েছে। ওর কথায়ই আমার কাজের গতি বেড়েছে। ঠিকঠাকমতো কাজ করা এবং নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করার অভ্যাসও হয়েছে।’

এর আগে বড্ড আলসেমিতে পার করে আসছিলেন একেকটি দিন। কেমন ছিল সেই দিনগুলো? মিঠুনের নিজের মুখ থেকেই শুনে নেওয়া যাক, ‘তখন আমি কুষ্টিয়ায় থাকতাম। খেলা বা ক্যাম্প থাকলে ঢাকায় আসতাম। খেলতাম, প্র্যাকটিস করতাম এবং চলে যেতাম। কুষ্টিয়ায় গিয়ে বাসায় শুয়ে-বসে থাকতাম। প্রতিদিন আমার একই রুটিন ছিল। খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো এবং আড্ডা।’

বিয়ের পর সেই দিনগুলোই তীক্ষ পর্যবেক্ষণে রাখতে রাখতে তিতিবিরক্ত নিগার সুলতানা আর চুপ থাকতে পারলেন না। সরব হলেন এবং তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণের কথোপকথনে রীতিমতো কোণঠাসাও হয়ে পড়েন মিঠুন। বাউন্সারের মুখে যেন ‘ডাক’ করার মতো অবস্থাও নেই তাঁর, ‘‘ও একদিন হুট করে এসে বলল, ‘আমি ক্রিকেট খুব একটা ভালো বুঝি না। কিন্তু আমি তো স্টুডেন্ট ছিলাম। পড়ালেখা করেছি। পড়ালেখা করতে হলেও তো প্রতিদিন একটা রুটিন থাকে, নিয়ম করে পড়ার। তুমি নিজেকে পেশাদার ক্রিকেটার বলো। অথচ তোমাকে প্র্যাকটিস করতে দেখি না। প্রতিদিন একই রুটিন। আড্ডা দিচ্ছ, খাচ্ছ-দাচ্ছ, ঘুরছ-ফিরছ আর ঘুমাচ্ছ। তাহলে পেশাদার ক্রিকেটার হলে কী করে?’ এভাবে শোনার জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না।’’

অপ্রস্তুত মিঠুনের তখনকার জীবনাচরণের উপসংহারও টেনে দেন নিগার সুলতানা। যে কথা শুনে হুঁশ ফেরে তাঁর। শপথ নেন নিজেকে বদলে ফেলারও, ‘‘ও আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার স্বপ্ন কী?’ আমি বললাম, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা। তখন সে বলল, ‘এভাবে তুমি কিভাবে খেলবে? ভালো স্টুডেন্ট হতে গেলে তো পড়ালেখা করতে হয়। একটা রুটিন মেনে চলতে হয়। তোমার কোনো রুটিনই নেই। মনে হয় না এভাবে তুমি ভালো ক্রিকেটার হতে পারবে?’ ওই কথাটাই আমার মাথায় লাগে। আসলেই ঠিক কথা। ভালো ক্রিকেটার হতে গেলে প্রতিদিন আমাকে সময় দিতে হবে।’’

নিজেকে বদলে ফেলার সেই শুরু মিঠুনের। নিয়ম করে পরিশ্রম বাড়িয়ে, নিবেদনে আগের নিজেকে ছাড়িয়ে পেয়েছেন হারানো পথের দেখা। পথপ্রদর্শক মিঠুনের সন্তান আরহাম ফারিক আরাশের মা!

 

নিজের সেরাটা যেন দিতে পারি

প্রশ্ন : প্রথম বিশ্বকাপ দেখার স্মৃতি কোনটি?

মোহাম্মদ মিঠুন : ১৯৯৬-র বিশ্বকাপের কথা আবছা আবছা মনে আছে। তবে একেবারে বুঝে-শুনে দেখা বলতে ২০০৭-র বিশ্বকাপ। তখন নিজেও ক্রিকেট খেলি।

প্রশ্ন : নিজে খেলেন এবং বিকেএসপিতে যাঁদের সঙ্গে অনুশীলন করতেন, সেই বড় ভাইদের অনেকেই ২০০৭-এর বিশ্বকাপ খেলেছেনও।

মিঠুন : হ্যাঁ, মুশফিক ভাইরা ছিলেন। রাজ (আব্দুর রাজ্জাক) ভাইকে অবশ্য আমি বিকেএসপিতে গিয়ে পাইনি। আমি ভর্তি হওয়ার আগেই উনি বের হয়ে গিয়েছিলেন। মুশফিক ভাইদের জন্যই ২০০৭ বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের আগ্রহটা ছিল বেশি। বিকেএসপিতে টিভি রুম একটাই। সেখানে সবাই মিলে খেলা দেখতাম।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নও কি জাগে তখনই?

মিঠুন : স্বপ্নটা তো তৈরি হয় এভাবেই। আমার দুই, তিন বা চার ব্যাচ সিনিয়র, যাঁদের সঙ্গে এক মাঠেই অনুশীলন করেছি, তাঁরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন। আমি কবে ওখানে যাব বা ওখানে যেতে হলে কী করতে হবে বা তাঁরা কী করেছেন—এসব অনুসরণ করতাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হতে গেলে কী করতে হয়, এগুলো তো দেখে দেখেই শেখা। কোচরা বেসিক জিনিসটা শেখান। স্বপ্নটা তো তৈরি হয় দেখে দেখেই।

প্রশ্ন : এবার সেই বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নও পূরণ হচ্ছে। কতটা রোমাঞ্চিত?

মিঠুন : (হাসি...) আমার ভেতরে আফসোসও কম, আবার খুশি হওয়ার ব্যাপারটিও কম। খুব খুশিও হই না আবার কোনো কিছুতে একদম ভেঙেও পড়ি না। আমি নিজেকে সব সময় একটি ভারসাম্যপূর্ণ জায়গায় রাখতে চেষ্টা করি। চেষ্টা করছি বিশ্বকাপের আগেও।

প্রশ্ন : ব্যক্তিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন নিশ্চয়ই?

মিঠুন : ওইভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করি না। চেষ্টা করি প্রতিটি ম্যাচেই যেন দলের জন্য অবদান রাখতে পারি। আমি যে জায়গায় খেলব, সেই জায়গা থেকে দলকে যেন সেরাটা দিতে পারি। আমি একটি-দুটি ম্যাচ নিয়ে কখনো পরিকল্পনা করতে পারি না। আমি ভালো কিছু করতেই থাকলে টুর্নামেন্ট শেষে নিশ্চয়ই রেকর্ডও ভালো কিছুই হবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ দলের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

মিঠুন : আমাদের দলে অভিজ্ঞতাও আছে। তরুণরাও আছে। যদি সবার অবদান থাকে, কাজ সঠিকভাবে করলে আমরা ভালো কিছুই করব।

 

একটাই স্বপ্ন। বিশ্বকাপে আমি বাংলাদেশ দলকে ম্যাচ জিতিয়ে অপরাজিত থেকে বের হয়ে আসছি। এর চেয়ে ভালো লাগার কিছু তো হতে পারে না। সেটা হোক ১০ রান, ২০ রান বা ১০০ রান।

 

অবশ্যই সে রকম কিছু, যে রকম কিছুর স্বপ্ন সারা দেশের মানুষ দেখছে।

 

টার্নিং পয়েন্ট

গত এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি। যে ম্যাচে ৬৩ রানের ইনিংস খেলে বুঝতে পারি যে আমার পক্ষেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো কিছু করা সম্ভব।

 

সিক্রেট

ধৈর্যের সঙ্গে প্রচুর খাটুনি খাটতে পারাই আমার ‘সিক্রেট’।

 

সেরা ম্যাচ

আমার খেলা সেরা ম্যাচ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে। জীবন-মরণ যে ম্যাচে আমি ৬০ রান করেছিলাম। দলের জয়েও যা কিছুটা ভূমিকা রাখতে পেরেছিল।

 

নিজের শক্তি

দলের প্রয়োজনে যেকোনো পজিশনে ব্যাটিং করতে পারাই আমার শক্তির দিক।

 

দুর্বলতা

দুর্বলতার দিক হলো আমার আবেগ। এটি অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।

 

ক্যারিয়ার লক্ষ্য

দীর্ঘদিন বাংলাদেশ দলকে সাফল্যের সঙ্গে সার্ভিস দিয়ে যেতে চাই।

মন্তব্য