kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

ডাউন দ্য উইকেট

নিস্তরঙ্গ প্রিমিয়ার লিগ!

সাইদুজ্জামান   

২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিস্তরঙ্গ প্রিমিয়ার লিগ!

ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে ম্যাচের পর ম্যাচ হয়ে যাচ্ছে, তবু আম্পায়ারিং, পক্ষপাত, জরিমানা—কোনো কিছুই হচ্ছে না! অবিশ্বাস্য মৌসুম বটে ঘরোয়া ক্রিকেটের ইতিহাসে।

তবু ভালো লিগের শেষ পর্বে হঠাৎই পুলিশ ডাকতে হলো মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠানরত লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ ও প্রাইম ব্যাংকের মধ্যকার ম্যাচের ম্যাচ রেফারিকে। নিস্তরঙ্গ লিগের শেষ ম্যাচে এমন উত্তেজনা দেখে আড়মোড়া ভাঙে মিডিয়া—যাক, অবশেষে বাড়তি স্টোরির খোরাক মিলল তাহলে! কিন্তু কিসের কী। ম্যাচ রেফারি উল্টো তিন পুলিশ সদস্যকে পরামর্শ দিচ্ছেন গ্যালারির গুটিকয় উত্তেজিত সমর্থককে লাঠিপেটা নয়, যেন বিনয়ের সঙ্গে বোঝানো হয় এমন গালাগাল দিলে আম্পায়ারদের ম্যাচ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। বিস্ময়ের দ্বিতীয় ধাপে স্টেডিয়ামের মূল ফটকে দেখা লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের কর্মকর্তা আহমেদ এস রুবেলের সঙ্গে।

ভেতরে তো পুলিশ ডাকা হয়েছে।

—বলেন কী, আবার কী করল? নাহ...

বরাবরের সেই উষ্মা নেই রূপগঞ্জের এ কর্মকর্তার কণ্ঠে। বরং সমর্থকরা কী অনর্থ করল, তা নিয়েই যাবতীয় উদ্বেগ তাঁর। অথচ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, এমন পরিস্থিতিতে ঘটনা না শুনেই চক্রান্তের অভিযোগ তুলতেন রুবেল। প্রাইম ব্যাংক ইনিংসের শুরুতে শুভাশীষ রায়ের কট বিহাইন্ডের জোরালো আবেদন আম্পায়ারের উপেক্ষা করা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করতেন তিনি। এবার আশ্চর্য নীরব থেকেছেন রূপগঞ্জের ‘ছায়া মালিক’ তরিকুল ইসলাম টিটো। একবার অবশ্য মাঠে নিয়োগকৃত আম্পায়ার দেখে সরকারিভাবে অভিযোগ করেছিলেন। তবে আগের মতো প্রায় প্রতি ম্যাচের আগে ঘনিষ্ঠ সংবাদকর্মীদের ফোনে ষড়যন্ত্রের আগাম কিংবা পরে শিকার হওয়ার অভিযোগ একবারও করেননি তিনি।

টিটো এবং রুবেল ঘরোয়া ক্রিকেটের ভালো-মন্দের সঙ্গে জড়িয়ে দীর্ঘদিন। তবে এ সময়ের ক্রিকেটের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্কটা সহায়ক নয় মোটেও। তাই নিষিদ্ধ হয়েছেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল তাঁদের বিরুদ্ধে। তবে মামলা প্রত্যাহৃত হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদও কমেছে তাঁদের পুরনো বন্ধুদের সহায়তায়, যাঁরা এখন ক্ষমতার বলয়ে রয়েছেন। টিটু-রুবেলকে শাস্তি প্রদানে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া একজনই কিছুদিন পর অনুতাপে পুড়ে বলছিলেন, ‘যা-ই করুক, জীবনটা তো ক্রিকেটে কাটিয়ে দিয়েছে। আমরা অনেকে মিলেই চেষ্টা করছি শাস্তি কমাতে।’

নানা অভাব-অভিযোগ আর অব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের প্রতি বুনো মনোভাবের লাভাস্রোতে যে এটুকু হৃদ্যতা ভেসে যায়নি, তাও কম নয়। তারই প্রতিদানে কিনা জানি না, টিটো-রুবেলরাও চিরায়ত ‘উস্কানিমূলক’ কিছু করেননি। ঢাকাই ক্রিকেটে এ উস্কানির মানে কিন্তু ভিন্ন। মিডিয়ায় শোরগোল তুলতে এ দেশে যুগ যুগ ধরে খেলোয়াড়-কর্মকর্তারা সুকৌশলে খোরাক জুগিয়েছেন। আম্পায়ারের দেওয়া এলবিডাব্লিউ কিংবা কট বিহাইন্ডের সিদ্ধান্তে দলের মহাতারকা অসন্তোষ প্রকাশ করতেই গ্যালারিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা আছে। জাতীয় দলের সাবেক এক অধিনায়কের একটি ঘটনা না বললেই নয়। বৃষ্টির কারণে ম্যাচের দৈর্ঘ্য কমিয়ে এনেও খেলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আম্পায়ার। কিন্তু সে ম্যাচ আর শুরু হয়নি। আম্পায়ারের সঙ্গে মিটিং শেষে বেরিয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে তিনি অপেক্ষমাণ সাংবাদিককের কাছে শুকনো মুখে অভিযোগ করে যান, ‘এভাবে দেশের ক্রিকেট এগোবে কী করে? ওপর থেকে ফোন করে কে নাকি খেলা বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন!’

পরদিনের পত্রিকায় সেভাবেই খবরটি ছাপা হলো। যদিও পরে জানা গেল আম্পায়ারকে ম্যাচ বাতিলের জন্য চাপাচাপি করেছেন বড় ক্লাবের ওই নামি তারকাই। ২৫ ওভারের ম্যাচ খেললে যদি তাঁর দল হারে ‘ছোট’ দলটির কাছে! সে দলটির পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান ওয়াসিম নাঈম সে মৌসুমে যাকে-তাকে পেটাচ্ছিলেনও। অবশ্য ডাব্লিউ জি গ্রেসও নাকি আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতেন। আমাদের কাছে তিনি কিংবা তাঁর সমসাময়িক কয়েকজনের ‘গ্রেস’ও কম ছিল না! সমস্যা হলো, সেকালের ইংল্যান্ডে মাঠে একজনই গ্রেস ছিলেন। কিন্তু আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে অগুনতি গ্রেস। ক্ষমতার পালাবদলে গ্রেস সাহেব মতিঝিল টু ধানমণ্ডি কিংবা ডিওএইচএসে স্থানবদল হয়েছেন বড়জোর, আম্পায়ারদের প্রভাবিত করার পুরনো অভ্যাস আর যায়নি।

ব্যতিক্রম এবারের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। ব্যতিক্রম বলেই রাতে ফোন বাজেনি, ম্যাচ চলাকালে ডাগ আউটের উত্তেজনা ম্যাচ রেফারির রুম পর্যন্ত যায়নি। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বলয় থেকে নির্বাসনে থাকা লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ মাঠ ছাড়া মাঠের বাইরে উত্তাপ ছড়ায়নি।

বিস্ময়কর এ পরিবর্তনটা হলো কী করে? মাঠে তো সেই আম্পায়ার্স পুলের লোকদেরই দেখা গেছে! তাহলে? না, এর মধ্যে কোনো রহস্য নেই। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান প্রিমিয়ার লিগ শুরুর আগে আম্পায়ারদের পক্ষপাতের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছিলেন। সেটাকে ধর্তব্যে নেওয়ার সুফলই এবারের বিতর্কহীন লিগ। যে আম্পায়ারকে মাঠে দেখলেই আঁতকে উঠতেন বিশেষ বিশেষ ক্লাবের ‘মাঠকর্মী’রা, তাঁরাও এবার ওই একই আম্পায়ারের ভুলকে ‘হিউম্যান এরর’ বলে মেনে নিয়েছেন। আম্পায়ারের ভুল হতেই পারে। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আম্পায়ারদের ইচ্ছা আর অনিচ্ছাকৃত ভুলের পার্থক্য ধরতে শিখে গেছেন টিটো-রুবেলদের মতো ক্লাব পর্যায়ের মাঠকর্মীরা।

এত দিন ক্ষমতাসীনদের ‘ক্যাডার’ হয়ে যাঁরা ম্যাচ পরিচালনা করছিলেন, তাঁদের ভাগে এবার কম ম্যাচ মিলেছে। এ নিয়ে একটি অংশ মর্মাহত! আরেকটি অংশ আবার অভ্যাসবশেই আবাহনী লিমিটেডের পক্ষে অযৌক্তিক কারণেও সোচ্চার। মিরপুরের একটি ম্যাচে আবাহনীর বিপক্ষে একটি সিদ্ধান্ত যাওয়ার পর করিডরে একজনের সে কী ক্ষোভ, ‘বিকেলে স্যাররা আসুক না, তখন বুঝবে!’ তবে আশার কথা, মাঠের ওই আম্পায়ার পরেও ম্যাচ পেয়েছেন।

তবে অবিশ্বাস কি পুরোপুরি গেছে? আসলে খারাপটা আমাদের বিশ্বাস হয় খুব সহজে। কিন্তু ভালো বিশ্বাস করাতে সময় লাগে। এই যেমন এবার কেন পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিং দিয়ে ফল পক্ষে আনার অপচেষ্টা করা হয়নি? কারো কারো ধারণা, নির্বাচনের বছরে আবার ফিরে আসবে ‘কোপাকুপি’র আম্পায়ারিং। ভোটের অঙ্ক থাকবে যে তখন! আমরা সে পথে না হাঁটি। ধরে নেই, ম্যাচ পরিচালনার এ ধারা অব্যাহত থাকবে। তাতে দেশে আম্পায়ারিংয়ের মানের হাত ধরে উন্নত হবে ক্রিকেটারদের স্কিলও।

আম্পায়ারদের ধন্যবাদ দিয়ে লাভ নেই। ধন্যবাদ তাঁদের প্রাপ্য যাঁরা আম্পায়ারদের ওপর এবার জবরদস্তি করেননি। ধন্যবাদ প্রাপ্য লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের মতো গুটিকয় ‘বিরোধীপক্ষ’কে, যারা নেতিবাচক মানসিকতায় আক্রান্ত হয়ে নিজেদের সামর্থ্য তুলে ধরাই ভুলে গিয়েছিল। কিভাবে? ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকা যেকোনো ক্লাব মাঠে নামার আগে ধরেই নেয় যে বাজে আম্পায়ারিংয়ের শিকার হবে। কর্মকর্তারা যখন এ রিংটোন সেট করে দেন মৌসুমের শুরুতে, তখন তরুণ ক্রিকেটারদের মনের জোর থাকে কী করে? উল্টো দেখা গেছে, আউট হয়ে এসে আম্পায়ারের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টাও করেন অনেকে।

উদাহরণ, এবারের লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ। বড় কোনো তারকা নেই। তবু লিগের শেষ দিন পর্যন্ত শিরোপা রেসে টিকে ছিল সদর্পে। চ্যাম্পিয়ন আবাহনীকেও শুনতে হচ্ছে না আম্পায়ারিং সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ।

লিগে বিতর্ক হয়নি বলে শিরোনামে মিশে থাকা আক্ষেপ আসলে ‘সার্কাজম’। পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিং কখনোই কোনো দেশের ক্রিকেটে সুফল বয়ে আনেনি। বিলম্বে হলেও এটা যে বা যাঁরা বুঝতে পেরেছেন, সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

মন্তব্য