kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

বিশ্বকাপে তাঁরা

ত্রয়ীর পাশে সেঞ্চুরিয়ান মাহমুদ

নোমান মোহাম্মদ   

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ত্রয়ীর পাশে সেঞ্চুরিয়ান মাহমুদ

তত দিনে চার-চারটি বিশ্বকাপ খেলা সারা। ম্যাচ সংখ্যার হিসাবে ২৬টি। ১৯৯৯ আসরে পাঁচটি, ২০০৩ টুর্নামেন্টে ছয়টি, ২০০৭ সালে ৯টি এবং ২০১১-র প্রতিযোগিতায় ৬টি। তাতে ক্রিকেটের কালিতে রচিত কত আনন্দ-বেদনার কাব্য! অর্জনের অবিশ্বাস্য উল্লাসের সহাবস্থান হয়ে বিসর্জনের কেমন সব অনিঃশেষ দুঃখ!

তবে আনন্দ-বেদনা এক পাশে সরিয়ে সবচেয়ে বিস্ময় হয়ে ছিল বোধ করি পরিসংখ্যানের এক শূন্য পাতা। চার বিশ্বকাপের ২৬ ম্যাচ শেষেও যে কোনো সেঞ্চুরিয়ান নেই বাংলাদেশের!

দুঃখের পলি জমা সেই বিস্ময়-নদীতে আনন্দের ঢেউ ওঠে অবশেষে ২০১৫ সালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটের গর্জনে প্রথম সেঞ্চুরির সেই অর্জন। কী আশ্চর্য! ওখানে থেমে না থেকে পরের খেলায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও তো জাদুকরী তিন অঙ্ক আঁকা তাঁর ব্যাটে। এর আগে কিছু নেই, পরেও না। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দুই সেঞ্চুরির মালিকই মাহমুদ। ২০১৯ বিশ্বকাপে এ কীর্তিমানের নিশ্চয়ই লক্ষ্য থাকবে অনন্য এই কীর্তির আকাশ আরো বড় করার। সেঞ্চুরি সংখ্যা আরো বাড়ানোর।

তা তামিম ইকবাল কি আর পিছিয়ে থাকতে চাইবেন! কিংবা মুশফিকুর রহিম! অথবা সাকিব আল হাসান! এ ত্রয়ীকে কম দেয়নি বিশ্বকাপ। আবার সেঞ্চুরি না পাওয়ার হাহাকার তাঁদের কোনো নির্জন দুপুরকে হয়তো আরো নিস্তব্ধ করে দেয়। নিরালা সন্ধ্যাকে আরো নিঃসঙ্গ। সেসব ঝেড়ে এবার রেকর্ড বইয়ে তাঁদের নতুন পাতা সংযোজনের তাগিদ বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সম্ভাবনার পালে হাওয়া জোগাবে নিশ্চিতভাবে।

এমনিতে বিশ্বকাপে লাল-সবুজের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যান এ চতুষ্টয়। রানের হিসাবে, সেঞ্চুরি সংখ্যায়, হাফসেঞ্চুরির যোগফলেও। ২০১৯ বিশ্বকাপেও যে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের অক্সিজেন এই তামিম-মুশফিক-সাকিব-মাহমুদ, সে উপলব্ধির জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

ইংল্যান্ডের টুর্নামেন্টের জন্য ১৫ সদস্যের যে বিশ্বকাপ স্কোয়াড, তার মধ্যে স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান ৯ জন। ‘চার স্তম্ভের’ সঙ্গে সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান, লিটন দাশ, মোহাম্মদ মিঠুন ও মোসাদ্দেক হোসেন। বিশ্বকাপের প্রত্যাশিত ব্যাটিং-স্বর্গে তাঁদের ব্যাটেই বড় স্কোরের আশা। তাঁদের মধ্যে লিটন-মিঠুন-মোসাদ্দেকের জন্য এটি বিশ্বমঞ্চের প্রথম আসর। সাকিব-মুশফিক-তামিম আগে খেলেছেন তিন বিশ্বকাপ, মাহমুদ দুই এবং সৌম্য-সাব্বির এক। ম্যাচ সংখ্যায় যাঁরা যত বেশি, লাল-সবুজের বিশ্বকাপ রেকর্ডে তাঁদের পাতাই তত উজ্জ্বল।

সাকিব-মুশফিক-তামিম খেলেছেন সবচেয়ে বেশি তিন বিশ্বকাপ—২০০৭, ২০১১ ও ২০১৫। ম্যাচ সংখ্যা সমান তাঁদের। ২১টি। সবচেয়ে বেশি রানের তালিকায় ওপরের তিনটি নামও এ ত্রয়ীর। তারকাকুলে বৃহস্পতি হয়ে বাকি সবাইকে ছাপিয়ে সাকিব। ২১ খেলায় ৩০ গড়ে সর্বোচ্চ ৫৪০ রান নিয়ে। ইনিংস-সর্বোচ্চ স্কোর মোটে ৬৩ হওয়াটা তাঁর জন্য হয়তো পীড়াদায়ক। আবার বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঁচ ফিফটি সান্ত্বনার প্রলেপ দেবে নিঃসন্দেহে। ২০০৭ টুর্নামেন্টে ভারত (৫৩) ও ইংল্যান্ড (৫৭*), ২০১১ আসরে আবার ভারত (৫৫) এবং চার বছর পর আফগানিস্তান (৬৩) ও স্কটল্যান্ডের (৫২*) বিপক্ষে এই বাঁহাতির ৫০ ছাড়ানো ইনিংস-পঞ্চক।

সাকিবের পর মুশফিক। বিশ্বকাপে ২১ ম্যাচের ২০ ইনিংসে ৩১.৮৭ গড়ে ৫১০ রান নিয়ে। চার হাফসেঞ্চুরিতে পরিসংখ্যানের এ কলামেও বিকেএসপির অনুজের পর তিনি। ২০০৭ সালে ভারতের (৫৬*) বিপক্ষে ম্যাচের পর বিশ্বকাপে দীর্ঘদিন সেভাবে হাসেনি মুশফিকের ব্যাট। ওই আসরের বাকি ম্যাচগুলোর পর ২০১১ সালের কোনো খেলায়ও পারেননি ৫০ ছুঁতে। অমাবস্যার অন্ধকার দূর হয়ে ব্যাটে পূর্ণিমার হাসি অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে। চার বছর আগের টুর্নামেন্টে হাফসেঞ্চুরি করেন আফগানিস্তান (৭১), স্কটল্যান্ড (৬০) ও ইংল্যান্ডের (৮৯) বিপক্ষে। বাকি তিন খেলায় স্কোর ৩৬, ১৫ ও ২৭। দারুণ সফল সেই আসরে মুশফিকের একটাই গোপন দীর্ঘশ্বাস—সেঞ্চুরি না পাওয়ার।

সেই সেঞ্চুরি অধরা তামিমের জন্যও। অথচ কী সুবর্ণ সুযোগটাই না এসেছিল তাঁর সামনে! গত আসরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে আর ৫ রান করতে পারলেই তো বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হতে পারতেন। ২১ খেলায় ২৩ গড়ে ৪৮৩ রান নিয়ে বিশ্বকাপে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার, হাফসেঞ্চুরি সংখ্যায়ও তৃতীয়তে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গতবারের ৯৫ রানের আগের দুই আসরে ভারতের বিপক্ষে ৭০ ও ৫১ রানের দুটি ইনিংসের যোগফলে।

সেঞ্চুরির সিংহাসনটা এখন পর্যন্ত মাহমুদের দখলে। সেই সেঞ্চুরিও একটি না, দুটি। তবু বিশ্বকাপের মোট রান সংখ্যায় চারে তিনি। মূল কারণ অন্য তিনজনের চেয়ে একটি কম আসরে প্রতিনিধিত্ব করা। সেই ২০১১ ও ২০১৫ টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ১০ খেলার ৯ ইনিংসে ৩৯৭ রান মাহমুদের। দুইবার অপরাজিত থাকায় গড়টা সমীহ করার মতো—৫৬.৭১। গতবার ইংল্যান্ড (১০৩) ও নিউজিল্যান্ডের (১২৮*) বিপক্ষে সেঞ্চুরির পাশাপাশি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ঝকমকে ৬২ রানের একটি ইনিংস ছিল তাঁর।

এ চারের বাইরে বাংলাদেশের ২০১৯ আসরের স্কোয়াডে বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা আর মাত্র দুজন স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানের। সাব্বির ও সৌম্যর। ২০১৫ সালে ছয় ম্যাচ খেলে ৩৬.৪০ গড়ে ১৮২ রান প্রথমজনের। পরের জনের সমান ম্যাচে ২৯.১৬ গড়ে ১৭৫ রান। দুজনেরই হাফসেঞ্চুরি একটি করে ম্যাচে—সাব্বিরের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে (৫৩) এবং সৌম্যর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে (৫১)।

২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এ স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানদের লড়াই শুধু প্রতিপক্ষের বোলারদের সঙ্গে না, যুদ্ধ নিজেদের সঙ্গেও। রানের। সেঞ্চুরির। হাফসেঞ্চুরির। সেই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা জমে উঠলে, টক্করে রোমাঞ্চ ছড়ালে আখেরে লাভ তো সেই বাংলাদেশেরই!

মন্তব্য