kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

বাঁধ ভেঙে নতুন দিগন্তে...

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাঁধ ভেঙে নতুন দিগন্তে...

২০০৫ সাল, মেয়েদের ফুটবলে গড়া প্রথম জাতীয় দল স্টেডিয়ামের ভেতর অনুশীলনে। বাইরে তখন মিছিল তাদের বিরুদ্ধে। মেয়েদের ফুটবল বন্ধের দাবিতে তখন উন্মত্ত একদল লোক। স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর সময় সাবিনা, অম্রাচিং, তৃষ্ণাদের তাই পইপই করে বলে দেওয়া হয়, বাসের ভেতর কেউ যেন মাথা না তোলে, বাইরে থেকে যেন বোঝা না যায় খেলোয়াড়রা যাচ্ছে। পালিয়ে মাঠ ছাড়া সেই ফুটবলাররাই আজ যখন বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলতে মাঠে ঢুকবে, নিশ্চিত জনস্রোত তাদের গার্ড অব অনার দিতে চাইবে। প্রাণভরে দোয়া করবে মেয়েরা আবারও যেন মুগ্ধ করা ফুটবলে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনে। এতটাই বদলে গেছে পরিস্থিতি। এর পেছনে অনেকের অবদান আছে। তখনকার সংগঠক, নারী নেত্রীরা মিলেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ফুটবলাররা দেখিয়েছিল অসীম সাহস। দমে না গিয়ে তারা ফুটবল পায়ে সবুজ জমিনেই মুগ্ধ করেছে সবাইকে।

খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট নামে এই মেয়েদের ফুটবল শেখার পাঠশালা গড়ে দিয়েছেন। দূর পল্লী থেকে উঠে এসে মারিয়া, মার্জিয়া, মনিকারা সাফ শ্রেষ্ঠত্ব ঘরে তুলেছে, লড়ছে এশিয়ার ময়দানে, তার আঁতুরঘর হয়েছে ওই টুর্নামেন্ট। এবার বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট দিয়ে এই মেয়েদের ফুটবলই ছুঁতে চলেছে নতুন দিগন্ত। ২০০৫ থেকে সাত-আট বছর গেছে প্রতিকূলতা জয় করতেই। মেয়েদের অংশগ্রহণ ও ফুটবলটা নিয়মিত মাঠে রাখাই ছিল তখন মূল চ্যালেঞ্জ। ২০১৪ থেকে বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলে আসা কিশোরীদের দিয়ে প্রথম সাফল্যের পথে যাত্রা। প্রথম সাফল্য আসে নেপাল থেকে।

সেই যে মেয়েরা ভূমিকম্পের আতঙ্ক নিয়ে কাঠমাণ্ডু থেকে বিশেষ বিমানে ফিরল, মনে আছে! সেবারই অনূর্ধ্ব-১৪ এএফসি রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। মেয়েদের ফুটবলের যেকোনো পর্যায়ে সেটাই প্রথম শিরোপা। ভূমিকম্পে দশরথ স্টেডিয়াম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ফাইনাল না খেলেই ফিরতে হয়েছিল মেয়েদের। হোটেল থেকে বেরিয়ে সারা রাত খোলা আকাশের নিচে কাটিয়ে পরদিন তারা দেশে ফেরে। নেপাল ভূমিকম্পের সেই ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার পর সেই কাঠমাণ্ডুতে ফিরেই শিরোপা জিতে আবার ঘরে ফেরে বাংলাদেশের মেয়েরা। ফাইনালে নেপালকেই হারিয়েছিল তারা ১-০ গোলে।

পরের বছর তাজিকিস্তানে পরের আসরেও শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটা ধরে রাখে তহুরারা। সেই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা তহুরা এবার সাফ শিরোপা জয়ের পথেও স্বাগতিকদের হয়ে করেছে সবচেয়ে বেশি গোল। তাজিকিস্তানের ওই আসরেই ভারতকে প্রুপ পর্বে ও ফাইনালে দুইবার হারায় বাংলাদেশ। ভারতীয়দের বিপক্ষে যেকোনো পর্যায়েই মেয়েদের সেটা প্রথম জয়। মেয়েদের ফুটবলে বাংলাদেশ যে নতুন যুগে প্রবেশ করেছে জানা হয়ে গিয়েছিল সেদিনই। এরপর এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা ছিল তার সদর্প ঘোষণা। ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ওই আসরে কৃষ্ণা, সানজিদারা ফুটবলের ফুল ফুটিয়ে মাতায় স্বাগতিক দর্শকদের। মেয়েরা মন জয় করে নেয়। ছেলেদের ফুটবলের রুগ্ণ দশায় তাদের আলোকচ্ছটা চোখে পড়ে বড় বেশি করে। ওই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েই তো বাংলাদেশ নাম লিখিয়ে ফেলে এশিয়ার এলিট আট দলে। এরপর ফুটবল ফেডারেশন তাদের যত্নে ত্রুটি করেনি এতটুকু। এশিয়ার চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি হতে তাদের পাঠিয়েছে জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়ায়। শুধু প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নয়, এশীয় মানের প্রশিক্ষণও নিয়েছে তারা সেখানে লম্বা সময় ধরে। থাইল্যান্ডে সেই আট দলের লড়াইয়েও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে ছিল বিশ্বসেরাদের কাতারে নাম লেখানোর প্রতিশ্রুতি।

তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরাটা শুধু ছিল সময়ের ব্যাপার। গত বছর ঢাকাতে অনূর্ধ্ব-১৫ দলের মেয়েরাই প্রথম জয় করল তা। ওই আসরে একরকম বলে-কয়ে শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। তাজিকিস্তানের ওই আসরের পর এই আসরেও ভারতকে দুইবার হারিয়ে শিরোপার স্বাদ নেয় বাংলাদেশের মেয়েরা। বাংলাদেশের কোনো পর্যায়ের ফুটবলেই এতটা দাপট দেখা যায়নি কখনো। সেই ধারাবাহিকতায় বছরের শেষ দিকে ভুটানে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফেও শিরোপা জিতে ফেরে বাংলাদেশ। সেই মেয়েরাই লড়বে এবার বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে। তাদের নিয়ে বড় স্বপ্ন তো দেখাই যায়। এর মধ্যেই বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো জায়গা করে নিয়েছে অনূর্ধ্ব-১৬ এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপে। এবারের বাছাই পর্বটা ছিল কঠিন, দুটি রাউন্ড পেরোতে হয়েছে। ঢাকায় বাহরাইন, আরব আমিরাত, লেবানন, ভিয়েতনামকে হারিয়ে প্রথম রাউন্ডে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আরো বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় মিয়ানমারে। কিন্তু সেখানেও চমক দেখায় কিশোরীরা। স্বাগতিক মিয়ানমার ও শক্তিশালী ফিলিপাইনকে পেছনে ফেলে চীনের সঙ্গে এশিয়ার সেরা আট দলে জায়গাটা ধরে রাখে লাল-সবুজের মেয়েরাই। কাজী সালাউদ্দিন এই মেয়েদের নিয়ে এখন যে বিশ্বকাপে খেলারও স্বপ্ন দেখছেন। নারীদের বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে আর অলীক কল্পনা মনে হয় না।

মন্তব্য