kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

লিখেছেন জয়া আহসান

এগিয়ে যাওয়ার নেই মানা

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এগিয়ে যাওয়ার নেই মানা

দেশের নারী প্রগতির নতুন দিগন্ত খুলছে মেয়ে ফুটবলাররা। দেশে-বিদেশে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ছে, নতুন পরিচয়ে তারা তুলে ধরছে এই বাংলাদেশকে। তাদের এই শুভযাত্রাকে কুর্নিশ করতেই বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবল গোল্ডকাপের সঙ্গী হয়েছি আমি।   

প্রথমে বলে রাখি, নারী-পুরুষের ভেদাভেদে আমি খুব বিশ্বাসী নই। পুরুষের কাজ আর নারীর কাজের মধ্যে অত বিভাজনও কেন থাকবে? প্রত্যেকে নিজের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী তার কাজ ঠিক করে নেবে, নিজেকে এবং সমাজকে এগিয়ে নেবে, এই তো হওয়া উচিত। আমি বা আমরা অনেকেই যেটা উচিত মনে করছি, সমাজের ছোট একটা অংশের কাছে হয়তো সেটা অনুচিত। তারা তথাকথিত অনুশাসনের বেড়াজালে বেঁধে ফেলতে চায় নারীকে। দমিয়ে রাখতে চায় তাদের প্রতিভা ও সামর্থ্যকে। সেটারই বড় প্রতিবাদ বোধ হয় আমাদের নারী ফুটবল। আমার চোখে এটা বড্ড কঠিন খেলা। দাবা কিংবা শ্যুটিংয়ের মতো নয়। ফুটবলটা মাঠে দৌড়-ঝাঁপ করে খেলতে হয়। শারীরিক লড়াইয়ের এই খেলায় আমাদের মেয়েরা এগোতে পারবে, এটা কখনো আমি ভাবতেই পারিনি। আট-দশ বছর আগেও এ দেশে নারী ফুটবলের অগ্রগতি আমার কাছে সত্যিই অসম্ভব এক ব্যাপার ছিল।

অথচ সেই খেলাটিই কিনা এখন দারুণ সম্ভাবনার জায়গায় দাঁড়িয়ে! মেয়ে ফুটবলাররা আমার সেই ভুল ভাঙিয়ে প্রায়ই দেখি খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। এখানে জিতছে, সেখানে জিতছে, হালি হালি গোল করছে—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার খবর দেখি আর গর্বে বুকটা আমার ভরে ওঠে। বিশ্বে নারী ফুটবলের বয়স কত আমি জানি না। তবে আমাদের এখানে সামাজিক অর্গল ভেঙে মেয়েরা ফুটবল-বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাল্লা দিয়ে লড়ছে। এটা নারী প্রগতির অনেক বড় অহংকারের জায়গা। কিন্তু তারা কারা? যতটুকু জেনেছি, তারা নগরে বেড়ে ওঠা আমাদের মতো সুবিধাভোগী শ্রেণির মেয়ে নয়। কৃষ্ণা, মনিকা, মারিয়াসহ অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে নারী ফুটবলে বিপ্লব ঘটিয়েছে। তাদের স্যালুট জানাই আমি।

সম্প্রতি তাদের সঙ্গে আমি ফর্টিসের মাঠে বেশ কিছু সময় কাটিয়েছি। শুনেছি তাদের জীবনের গল্প, সংগ্রামের গল্প। এমনও আছে, যাদের দুবেলা খাবার জোগাড় করা কঠিন ছিল, তারাই সাহসী হয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ ফেলেছে ফুটবলে। যাদের এক জোড়া বুট কেনার ক্ষমতা ছিল না, সেই মেয়েদের পরিশ্রমে আজ কত আলোকিত আমাদের মহিলা ফুটবল। তাদের পথ দেখানোর জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ কে-স্পোর্টসকে, তাদের সুবাদে দেশের মানুষ আগামী ২২ এপ্রিল থেকে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ উপভোগ করবে। দেশের মাঠে মেয়েদের ফুটবল চ্যালেঞ্জ দেখবে। ছয় দলের এই টুর্নামেন্টে বাকি দলগুলোও শক্তিশালী। আশা করি, আমাদের মেয়েদের পায়ে ফুটবল রসোত্তীর্ণ হয়ে হাজির হবে স্বাগতিক দর্শকের সামনে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টটা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছার নামে, যাঁর জীবনও কেটেছে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সবার কাছে হয়তো দৃশ্যমান ছিল বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড। কিন্তু ঘরের ভেতরে এই নেতার লড়াইয়ে বড় অনুঘটক হয়ে কাজ করেন তাঁর স্ত্রী। তাঁর অনুপ্রেরণা ও ত্যাগের অসামান্য গল্পকে সম্মাননা জানানোর এ টুর্নামেন্টে সঙ্গী হওয়া আমার জন্য গর্বের।

ঢাকা শহরে ইদানীং একটি ব্যাপার চোখে পড়ে। মা-বাবারা ক্রিকেট প্র্যাকটিসে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের বাচ্চাদের। স্বপ্ন দেখেন, ছেলে একদিন সাকিব আল হাসান কিংবা মাশরাফি হবে। দেশ-বিদেশে খেলে বেড়াবে, অর্থ-যশে মোড়া থাকবে সন্তানের জীবন। যত দূর মনে পড়ে, সতেরো-আঠারো বছর আগেও ক্রিকেটে এত মোহ ছিল না। এখনকার সমাজের চারদিকে দেখি ক্রিকেট-আকর্ষণ। এখানে ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ দেখছেন মা-বাবারা। আগে ছেলেদের ফুটবলেও ছিল এমন জাদুময়তার হাতছানি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনই ছিলেন সেই আকর্ষণীয় ফুটবলের বড় বিজ্ঞাপন। হালে সেটায় ভাটা পড়লেও মেয়েদের ফুটবলে দেখি আমি সেই সম্ভাবনা। ঢাকার মেয়েরা হয়তো-বা এখন ফুটবলে খুব উৎসাহী নয়। ফর্টিসের মাঠে সেদিন ঢাকার অনেক স্কুলের মেয়েরা জড়ো হয়েছিল। তারা খেলেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের মেয়েদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে আগ্রহ দেখেছি, হয়তো-বা পড়ালেখার চাপে তারা খেলার সেই আনন্দে শরিক হতে পারে না। হয়তো-বা অভিভাবকরাও চান না। আমার মনে হচ্ছে, একটা সময় ঢাকার এই অভিভাবকরাই মেয়েদের ফুটবলে পাঠাবেন।

তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে মারিয়া-মনিকারা। তাদের জীবনে অনেক না পাওয়ার গল্প আছে। সংগ্রামের অতীত আছে। এমন প্রান্তিক অবস্থান থেকে তারা ফুটবলের লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল কিছু প্রাপ্তির আশায়। সেটা ছিল হয়তো নিতান্তই ব্যক্তিগত প্রাপ্তি। পরে সেই প্রাপ্তিটা লঘু হয়ে বড় হয়ে গেছে তাদের ফুটবলার পরিচয়টা। তারা বিশ্ব অঙ্গনে দেশকে উপস্থাপন করছে নতুনভাবে। তাদের জীবনের লড়াইটাই বোধ হয় দেশের নারী ফুটবল প্রগতির জন্য ইতিবাচক হয়েছে। এই মেয়েদের জীবনের সংকট মোচনের অন্যতম উপায় হলো ফুটবল। তারাই আসলে সমাজ বদলের নায়ক। তাদের পেছনে অর্থ লগ্নি করলে সেটা কখনো বৃথা যেতে পারে না। বরং নারী ফুটবলের নতুন দিগন্ত আরো রঙিন হয়ে ধরা দেবে আমাদের সামনে।

মন্তব্য