kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

টাচলাইন থেকে

বিশ্বকাপ দল

মোস্তফা মামুন

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সবাই মনে করেছিলেন বিশ্বকাপ খেলাটা তাঁদের অধিকার। কারণ তাঁরাই দলকে বিশ্বকাপে নিয়ে গিয়েছেন। সাধারণ্যেও সে রকম একটা সহানুভূতি। ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি জিতিয়ে যাঁরা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছেন, দেশের প্রথম বিশ্বকাপ খেলার ক্ষেত্রে ওঁদের আবেগগত দাবিটা খুব জোরালো।

কিন্তু দুই বছর আগে-পরে কখনো এক দল হতে পারে না। অনেকে ফর্ম হারিয়েছেন। নতুন কেউ কেউও দাবি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের দল ঘোষণার সময় তাই হৃদয়ভাঙা কিছু এপিসোডের জন্য আমাদের আগাম প্রস্তুতি ছিল। দুঃখের ঘটনার প্রস্তুতি থাকলেও সেটা ঠিক অনুমানমতো চলে না। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া হলো এত ভয়ংকর যে সামাল দেওয়াই মুশকিলই হলো। বাদ পড়াদের একজন বললেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর যে কষ্ট পেয়েছিলাম আজ সেই কষ্টই পেলাম।’

আরেকজন এত ক্ষুব্ধ যে ফোনে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেই বললেন, ‘ফোন করলেন কেন?’ মনে রাখুন, তখন ক্রিকেটাররা অত বড় তারকা নন যে সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন ঝাঁজালো ব্যবহার করবেন। কিন্তু তাঁর গলায় তখন আগুন ঝরছে রীতিমতো, ‘বলুন, ফোন করেছেন কেন?’

পরিস্থিতি সামাল দিতে বললাম, ‘আপনার বাদ পড়া নিয়ে একটি লেখা লিখতে চাই, তাতে আপনার দু-একটা মন্তব্য দরকার।’

‘আমার বাদ পড়া নিয়ে এখন লিখতে আসছেন। আগেই তো জানতেন যে আমি বাদ পড়ছি...তখন লিখলেন না কেন?’

খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন। কী উত্তর দেওয়া যায় ঠিক করতে করতেই ওপাশ থেকে হাহাকারের মতো শোনায়, ‘এখন আর লিখে তো আমাকে দলে ঢোকাতে পারবেন না।’

সত্যি বললে তখনো সাধারণ বিশ্বাসটা ছিল এ রকম। একবার সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে আর বদলায় না। কিন্তু সেবারই বিশ্বাসটা বদলাল। কারণ চূড়ান্ত দল ঘোষণার পরের লেখালেখিতে মিনহাজুল আবেদীন দলে ঢুকলেন। জাহাঙ্গীর দলে থেকেও বাদ পড়লেন। যদিও সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো করে তাঁকে দলের সঙ্গে বোর্ডের খরচে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

ক্রিকেটের নাটকীয়তা কখনো শেষ হয় না বলে ২০ বছর পর আবার যখন ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ, তখন সেই মিনহাজুলই দল নির্বাচনের দায়িত্বে। হৃদয় ভাঙা, ফের জোড়া লাগা, আবার সেই সিংহহৃদয় দিয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ জয়ের নায়ক হওয়া—বিশ্বকাপ আর মিনহাজুল এপিসোড রীতিমতো রূপকথার তুল্য। দল নির্বাচনে তাঁর কতটা ভূমিকা থাকে সে নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, তবে তাঁর আমলে অন্তত বিশ্বকাপ খেলার ক্ষেত্রে অবিচারের ঘটনা ঘটবে না বলেই ছিল স্বাভাবিক বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের কি খুব এদিক-সেদিক হয়েছে! তাসকিনের কান্নাজনিত সহানভূতি আছে, ইমরুলের ব্যাপারেও আফসোস আছে, তবু সব মিলিয়ে খুব বড় প্রশ্ন বোধ হয় নেই। দল ঘোষণার পর তাসকিনের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিলাম, যেহেতু এখনো দেড় মাস সময় আছে এবং সুযোগ আছে ২৩ মে পর্যন্ত দল পরিবর্তনের, সে ক্ষেত্রে তাসকিনকে আয়ারল্যান্ড সিরিজে একটা সুযোগ দেওয়া যেতে পারত। রাহি এবং তাসকিন দুজনই থাকলেন, সমান সুযোগ পেলেন—তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ইমরুলের ব্যাপারটা আরেকটু অদ্ভুত। সব মিলিয়ে একটা ক্রিকেটীয় চক্রব্যূহের মধ্যে পড়ে গেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও আজও তাঁর জন্য প্রতিটি ম্যাচ একেকটা পরীক্ষা। একেকটা ভালো ইনিংস একেকটা বীমা প্রকল্প। সেই প্রকল্পগুলো আবার বাংলাদেশের ভঙ্গুর বীমা কম্পানির মতো অনির্ভরযোগ্য। অল্পতেই লোপাট হয়ে যায়। নইলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্সের পরের সিরিজেই দুই ম্যাচ খেলে বাদ পড়েন কী করে! তাঁর সমর্থকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাই অবিচারের আওয়াজ আছে। কিন্তু ইমরুলের দুঃখে খুব সমব্যথী হয়েও দেখছি এটা অবিচার ঠিক নয়, ভাগ্যের ফের। ধরা যাক, ইমরুলের বদলে সৌম্য বা লিটনের কেউ একজন বাদ পড়লেন, তাহলে তখন কি সেটাও অবিচার মনে হতো না? ইমরুলের প্রতি সর্বোচ্চ সহানুভূতি দেখিয়েও বলি, লিটন বা সৌম্যর ব্যাট হোক না হোক সব সময় যে বড় কিছুর সম্ভাবনা জ্বালিয়ে রাখে ইমরুলের ক্ষমতার ধরনটা সেরকম নয়। তা ছাড়া ওই কন্ডিশনে সৌম্যর বোলিং কাজে লাগতে পারত। পরিস্থিতি বিবেচনায় লিটন হতে পারেন বিকল্প উইকেটরক্ষক। ইমরুলের তাই কপাল খারাপ।

আরেকটা বিষয়ও আছে। নির্বাচকদের যুক্তিতে দেখিনি। তাঁরা সেভাবে ভেবেছেন কি না জানি না, কিন্তু গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের টপ অর্ডার ব্যাটিংয়ে কিছু বিবর্তন হয়েছে। সেই বিবর্তনের নায়ক তামিম ইকবাল। ২০১৫ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত তামিম ছিলেন বেহিসেবি জমিদারদের মতো, নিজের ক্ষমতার অপরিণামদর্শী অপব্যয় করতেন। নিজেকে বদলে এখন তামিম দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকেন, ফলে তিনি অনেকটা অ্যাংকরের ভূমিকায়। ফলে তামিম-ইমরুল আর আদর্শ জুটি নয়, কারণ ইমরুলও তো দীর্ঘ সময় টিকে থাকার খেলোয়াড়। এখন তামিম যেহেতু সেই ভূমিকাটা পালন করছেন তখন সঙ্গীটি হওয়া উচিত একজন স্ট্রোকমুখী কেউ। লিটন-সৌম্য সেই ধরনের। পরিবর্তিত তামিমের কারণেও আসলে ইমরুলের গুরুত্ব কমেছে। খেয়াল করে দেখুন ইমরুলের যে সিরিজের পারফরম্যান্সের কারণে অবিচারের প্রশ্নটা আছে তাতে তামিম ছিলেন না এবং তিনি প্রায় তামিমীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তবু আবার বলি, ইমরুল সুযোগ পেতেই পারতেন। এবং সেই যে শুরুর গল্পটা বলছিলাম সেটা এ জন্যই যে, মিনহাজুলের সূত্রে বাইরে থেকে দলে ঢোকার যে গল্পটা তখন ছিল অবিশ্বাস্য কাহিনি এটা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। কে জানে, এবারও প্রতিভাবানদের দ্যুতি অচল হলে পরিশ্রমের হারিকেন হাতে ছুটেও যেতে হতে পারে তাঁকে। ইমরুল ভক্তদের বলি, অত হায় হায়ের কিছু নেই। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে সুযোগ কখনো পুরো শেষ হয় না। ইমরুল তো এভাবে গত বিশ্বকাপেও গিয়েছেন। আর এবার তো লম্বা টুর্নামেন্ট, অনেক কিছু ঘটবে। ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষায় থাকুন।

যেকোনো দলের বড় টুর্নামেন্টের দল মানেই কিছু কান্নার ঘটনা অবধারিত। এবার যেমন কাঁদলেন তাসকিন। কেউ কেউ এর সঙ্গে মাশরাফির কান্নাকে মেলাচ্ছেন। মাশরাফি আর তাসকিন এক নন, তবু  তাসকিন যদি এই কান্নাটাতে থেমে না থেকে এরপর মাশরাফি কী কী করেছিলেন, কিভাবে ফিরেছেন সেসবও মেলান তাহলে খুব ভালো হয়। তাসকিনকে আর কাঁদতে হবে না। তাসকিনের তো বরং নিজেকে এই প্রশ্নও করা উচিত, গত বিশ্বকাপের সময় যে তাসকিনকে ভাবা হয়েছিল পরের এক দশক দেশের পেস অ্যাটাককে নেতৃত্ব দেবেন তিনি কেন ছিটকে গেলেন? কোন ভুল পথনির্দেশক তাঁকে নিয়ে গেল এমন জায়গায় যে প্রায় দেড় বছর ধরে দলের বাইরে! আরেকটি কান্নার গল্প বলি। সেটাও তাসকিনদের কাজে আসতে পারে। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হয়েছে। একজন খেলোয়াড় দলের খুব কাছে থেকেও বাদ পড়ে গেলেন। ফোন করে শুনলাম অঝোর কান্না। চার বছর পর ২০০৩ বিশ্বকাপ। আবারও সেই একই খেলোয়াড় ঠিক একইভাবে চারজনের স্ট্যান্ডবাই তালিকায়। এবার আর ফোন করে কান্না শুনতে ইচ্ছা করছিল না কিন্তু ঘনিষ্ঠতার কারণে ফোন না করেও পারা যায় না। হোটেল সোনারগাঁওয়ে ওপাশ থেকে যে কান্না শুনেছিলাম সেই কান্নার বিষাদটা আজও মনকে ছুঁয়ে যায়। চার বছর পর আবার বিশ্বকাপ। আবার সেই খেলোয়াড় লড়াইয়ে। এবং এবার দল ঘোষণার পর আর কান্না নয়। তিনি আট বছরের দীর্ঘ লড়াই শেষে বিশ্বকাপে গেলেন। খেললেন। রবার্ট ব্রুসের এই বাংলাদেশি সংস্করণ জাভেদ ওমর এভাবেই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ খেলে ছেড়েছেন। তাই কখনো কিছু শেষ হয় না। প্রতিটি শেষই নতুন শুরুর সিঁড়ি তৈরি করে।

আমাদের এই বিশ্বকাপ দল একদিক থেকে সবার চেয়ে এগিয়ে। চারজনের এটা চতুর্থ বিশ্বকাপ, পৃথিবীর কোনো দেশেই অত অভিজ্ঞ ক্রিকেটার নেই। আবার সেই দলেরই সাতজনের এটা প্রথম বিশ্বকাপ। আশ্চর্য বৈপরীত্য। কিন্তু সেই বৈপরীত্যই আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটের গত এক-দেড় দশকের ছবিকেও দারুণভাবে প্রকাশ করে। আমাদের ক্রিকেট মানে গত দশকের (শূন্য দশকের) শুরুর দিকের দারুণ কিছু প্রতিভা এবং এর পরের শূন্যতা। ওরা আছেন ধ্রুবতারা হয়ে আর পরের ১০-১২ বছরে ধূমকেতুর মতো বাকিদের শুধু যাওয়া আর আসা। কেউ স্থির হতে পারলেন না সাকিব-মুশফিক-তামিমদের মতো। বিশ্বকাপে দল কেমন করবে জানি না, কিন্তু এই বিশ্বকাপ দলটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের ছবিকে এত সুন্দর প্রকাশ করছে। শূন্য দশকের শুরুর দিকের একঝাঁক বীর। এরপর বিরাট শূন্যতা।

মন্তব্য