kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

বিতর্ক ছাড়াই বিশ্বকাপ দল

মাসুদ পারভেজ   

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিশ্বকাপ দুজনকে কিভাবেই না এনে মেলাল একই অনুভবের মোহনায়! যেখানে দুপুরের তপ্ত রোদেও চোখ বেয়ে নামে অঝোর শ্রাবণ!

কী আশ্চর্য ব্যাপার! আট বছর আগে-পরে হলেও দুজনের আবেগ উপচানো কান্নার ঢেউ সব বাঁধ ভেঙে নামল সেই একই জায়গায়—মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামসংলগ্ন একাডেমিতে। যেখানে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ দল ঘোষণার সময় চোট থেকে ফেরা মাশরাফি বিন মর্তুজা নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন অনুশীলনে। গতকাল ২০১৯ বিশ্বকাপের দল ঘোষণার পর সেখানেই কান্নায় বিলীন হলেন মাত্রই চোট থেকে ফেরা তাসকিন আহমেদও।

তাঁরা দুজন মিলে গেছেন আরো একটি জায়গায়ও। শতভাগ ফিট নন বলে ২০১১-র বিশ্বকাপ দলে নির্বাচকরা মাশরাফিকে রাখেননি। একই কারণে এবার তাসকিনের নিয়তিও তা-ই। যদিও বিশ্বকাপের এখনো দেড় মাস বাকি। মাশরাফির বাদ পড়ার ঘটনাও বিশ্বকাপের মাসখানেক আগে। প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়ে সংবাদমাধ্যম সবার আগে দেখেছিল কান্নাভেজা মাশরাফিকেই। এবার সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না আরেক ফাস্ট বোলার তাসকিনও।

দল ঘোষণা-পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহে মিল থাকলেও দুজনের বাদ পড়ার পরিস্থিতিতে অবশ্য সাদৃশ্য সামান্যই। চোটের সঙ্গে বারবার লড়াই করে ফিরে অভ্যস্ত মাশরাফি তত দিনে আরেকটি লড়াইয়ে জিতে ফেরার অপেক্ষায়। আগের বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে জয়ের নায়ক বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়ার মাস তিনেক আগেও ছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। এই মহাতারকা একই সঙ্গে তখন দেশসেরা ফাস্ট বোলারও। তাঁকে বাইরে রেখে বিশ্বকাপ দল গড়ার ব্যাপারটি বেশ বিতর্কিতও হয়েছিল।

যা আসলে ছিল বিতর্কের ধারাবাহিকতাও। কারণ তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো বিশ্বকাপই বিতর্কমুক্ত ছিল না। বিশ্বকাপ দল মানেই ছিল কোনো না কোনো বিতর্কিত ঘটনায় কলঙ্কিত। যাঁকে দিয়ে এর শুরু, সেই মিনহাজুল আবেদীনই কিনা ২০ বছর পর প্রধান নির্বাচক হিসেবে ঘোষণা করলেন একটি বিতর্কহীন দল। এবার বিতর্কের অবকাশ তেমন ছিলও না। কান্নার ছবিতে মাশরাফির সঙ্গে তাসকিনের মিলে যাওয়াকেও কাকতালের বাইরে কিছু বলার সুযোগ নেই। কারণ চোট থেকে ফিরে মাত্র একটি প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলা তাসকিনের লম্বা সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। সব শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচই খেলেছেন ২০১৭ সালের অক্টোবরে। সব শেষ বিপিএলে দুর্দান্ত পারফরম করে নিউজিল্যান্ড সফরের দলে জায়গা পেয়েও না যেতে পারাটা চোট নামের দুর্ভাগ্যে। পুরো ফিট হতে পারলে এবং অন্য কারো দুর্ভাগ্যে কে জানে, এই পেসারের বিশ্বকাপ দুয়ার আবার খুলেও তো যেতে পারে!

তবে মিনহাজুলের মতো করে খোলেনি কারোরই। ১৯৯৯-এর বিশ্বকাপ দল থেকে তাঁকে ছেঁটে ফেলে সমালোচনার উনুনে পড়তে হয়েছিল নির্বাচকদের। শেষমেশ গণদাবির মুখে ১৫ জনের মূল দলের অংশ হয়েই বিশ্বকাপে যাওয়া মিনহাজুল ইতিহাসেও নাম লিখিয়ে ফেলেন। স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক নিজেও আরেকটি ‘প্রথম’-এর সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। বিশ্বকাপে তিনিই যে বাংলাদেশের প্রথম ম্যান অব দ্য ম্যাচও।

বিতর্ক হাত ধরাধরি করে চলেছে বাংলাদেশের পরের বিশ্বকাপগুলোতেও। ২০০৩ সালে সেটি মহামারি আকারও ধারণ করেছিল। ৩০ জনের প্রাথমিক দলেই ছিলেন না দেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাঈমুর রহমান, প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম ও আকরাম খানের মতো তারকারা। অভিজ্ঞদের একযোগে ছেঁটে ফেলে বিশ্বকাপে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য আসরটিও ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। পরে মাশরাফির চোটে বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় উড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল আকরাম খানকে। কিন্তু তাতেও সবচেয়ে ব্যর্থতার বিশ্বকাপ থেকে কোনো ইতিবাচক ফল নিয়ে ফেরা যায়নি।

বিতর্কমুক্ত ছিল না ২০০৭-এর বিশ্বকাপও। সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদকে বাইরে রেখেই গড়া হয়েছিল দল। তাঁর জায়গায় মুশফিকুর রহিমের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল বেশ। তবে ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে মুশফিকের ব্যাটে ফিফটি সে সমালোচনায় জলও ঢেলে দিয়েছিল দ্রুতই। পরের বিশ্বকাপে মাশরাফি বিতর্ক। ২০১৫-র বিশ্বকাপেও বিতর্ক ছিল, তবে সেটি ছিল মাঠের বাইরের ঘটনায় রুবেল হোসেনের মামলা-মোকদ্দমায় পড়ে জেলে যাওয়া নিয়ে। আগের একেকটি আসরের তুলনায় এবারের বিশ্বকাপের দল ঘোষণাকে তাই নিস্তরঙ্গই বলা যায়। যেটি ঘোষণা করা মিনহাজুলকে দিয়েই বিশ্বকাপ দল নিয়ে বিতর্কের সূচনা। আপাতত তিনি বিতর্কহীন এক উপসংহারই টানতে পারলেন।

মন্তব্য