kalerkantho

স্বস্তি এবং আনন্দের মাঝামাঝি

নোমান মোহাম্মদ   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রশ্ন : জিম্বাবুয়ের মতো দলের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট জিতে সিরিজ ড্র করায় আনন্দ বেশি, নাকি স্বস্তি?

মাহমুদ উল্লাহ : যদি আপনি ম্যাচ জেতেন, তখন অবশ্যই আপনার আনন্দ লাগা উচিত। ম্যাচ জিতলে অতটুকু অধিকার থাকে আনন্দ প্রকাশ করার। আমরা যখন খারাপ খেলি, ড্রেসিংরুমে মনটা আমাদেরই বেশি খারাপ হয়। আমাদের চোখের পানিটা কেউ দেখে না। আমরা এটা কাউকে বলিও না।

প্রশ্ন : আনন্দ তো করতেই পারেন। কিন্তু জানতে চাইছিলাম, আনন্দ ও স্বস্তির মধ্যে কোন অনুভূতি বেশি?

মাহমুদ : এখানে তুলনা করার কোনো মানে নেই। এটি স্বস্তিও না, আনন্দও না। মাঝামাঝি।

বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত টেস্ট অধিনায়কের কণ্ঠস্বর চড়ে যায়। শক্ত হয়ে ওঠে চোয়াল। রাগের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ কাটা কাটা উত্তরে। অথচ প্রতিপক্ষ যখন জিম্বাবুয়ের মতো দল, যারা পাঁচ বছর কোনো টেস্ট জেতেনি, দেশের বাইরে জেতেনি ১৭ বছর—তাদের বিপক্ষে সিরিজ ড্র করলে অমন প্রশ্ন উঠবে না! সিলেটে প্রথম টেস্ট হারের পর এই অধিনায়কই না বলেছিলেন, ‘এভাবে টেস্ট খেলার কোনো মানে নেই!’ তা মনে করিয়ে দিতেও ফিরে আসে ঝাঁজালো উত্তর, ‘হ্যাঁ যদি আমরা প্রথম টেস্টের মতো খেলি, তাহলে অবশ্যই মানে হয় না। আবার যদি আপনি এই টেস্টের কথা চিন্তা করেন, যদি আমরা এমন মানসিকতা দেখাতে পারি এবং কাজে-কর্মে সেটা দেখাতে পারি, তাহলে অবশ্যই মানে হয়।’

২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিল ইংল্যান্ড। প্রথম টেস্টে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে জিতলেও দ্বিতীয় টেস্টে আর পারেননি। ‘বালক-বীর’ মেহেদী হাসান মিরাজের বোলিংয়ে ঢাকার ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ। সিরিজ ড্র। সে ড্রয়েই জয়ের উল্লাস বাংলাদেশের। ইংল্যান্ড ক্যাম্পে স্বস্তি। সিরিজ হারতে হয়নি যে! পরের বছর অস্ট্রেলিয়ার সফরেও একই চিত্রনাট্যের পুনর্মঞ্চায়ন। পার্থক্য বলতে এবার প্রথম টেস্ট জেতে স্বাগতিকরা। দ্বিতীয়টি জিতে সফরকারীরা ফেরায় সমতা। সেবারও তো অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়নি। বরং হাঁফ ছাড়া নিঃশ্বাসেরই ওড়াউড়ি। যাক, সিরিজটি তো হারতে হয়নি!

ওই দুই সিরিজে ‘বড় ভাই’ ছিল ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। কাল শেষ হওয়া সিরিজে যে ভূমিকায় বাংলাদেশ। এখনকার জিম্বাবুয়ে তো কোনোভাবেই লাল-সবুজের ক্রিকেটদলের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেই তাদের সঙ্গে সিরিজ ড্র করায় স্বস্তিটাই কি বেশি হবে না?

২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে নেদারল্যান্ডসের কাছে হারের পর ইংল্যান্ডের অধিনায়ক স্টুয়ার্ট ব্রডের কাছে সংবাদ সম্মেলনে প্রথম প্রশ্নই ছিল, ‘আপনি কি মনে করেন, অধিনায়কের ওই চেয়ার ধরে রাখার অধিকার এখনো আপনার রয়েছে?’ কুড়ি-বিশের ফরম্যাটে ডাচদের কাছে ইংরেজদের হারের চেয়ে টেস্টে ঘরের মাঠে এখনকার জিম্বাবুয়ের কাছে হার তো কম বিব্রতকর নয় বাংলাদেশের জন্য। তবু তো সিলেট টেস্ট শেষে অধিনায়ক মাহমুদের দিকে অমন প্রশ্নের তীর ছোটেনি। তাঁর নিজের যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স সত্ত্বেও।

দ্বিতীয় টেস্ট জিতে সিরিজ ড্র করার পর আনন্দ-স্বস্তির প্রশ্নে তাই হয়তো-বা ওভাবে রেগে যেতে পারেন অধিনায়ক মাহমুদ!

এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ সিরিজ শুরু করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে চোখ রেখে। অধিনায়ক নিজেই বলেন তা। সেই জিম্বাবুয়ের কাছে প্রথম টেস্ট হারটা ছিল তাই প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণার মতো। মাহমুদ নিজেও তা মানেন, ‘সবাই চাইছিল, জিম্বাবুয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ জিতুক। আমার মনে হয় ওদেরও কৃতিত্ব দিতে হবে, ওরা ভালো ক্রিকেট খেলেছে। প্রথম টেস্টে আমরা শৃঙ্খলা মেনে খেলতে পারিনি। এই টেস্টে তা পেরেছি। প্রথম টেস্টের পর আমরা খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। ভালো করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে সবাই। আমরা চেয়েছিলাম তার বহিঃপ্রকাশ মাঠে দেখাতে। কিছুটা হলেও তা পেরেছি।’ সেই পারাতে বিব্রতকর সিরিজ হার এড়ানো গেছে। কিন্তু ট্রফিটা হ্যামিল্টন মাসাকাতজার সঙ্গে ভাগাভাগি করাটা যে মোটেই ভালো লাগেনি, সেটিও বলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘সিরিজের শুরুতে আমাদের লক্ষ্য ছিল দুটি ম্যাচেই জেতা। হোম কন্ডিশনে জিম্বাবুয়ে হোক, অস্ট্রেলিয়া হোক কিংবা অন্য যেকোনো দল—আমরা সব সময় চাই যেন সিরিজ জিততে পারি। সব ফরম্যাটেই একই লক্ষ্য থাকে। সেদিক থেকে বললে ট্রফিটা শেয়ার করতে খুবই খারাপ  লাগছে।’

আবার ভালো লাগার জায়গাও রয়েছে তাঁর ব্যাটসম্যান সত্তা ফিরে পাওয়ায়। আগের চার টেস্টের আট ইনিংসে ৭.২৫ গড়ে ৫৮ রান করা মাহমুদ যে সেঞ্চুরি পান এই ম্যাচে! নিজেকে নিয়ে হাঁফ ছাড়ার কথা বলেন তাই, ‘হ্যাঁ, কিছুটা স্বস্তি বলতে পারেন। কারণ আমার শেষ পাঁচ টেস্টে কোনো ভালো পারফরম্যান্স ছিল না, কোনো ফিফটি ছিল না। এ ফরম্যাটে খারাপ করছিলাম। এবার তো চাইছিলাম, অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে পারফরম করতে। সেটি পেরেছি। এখন চাই এ ফরম্যাটে আরো ধারাবাহিক হতে।’

ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের সেঞ্চুরিতে স্বস্তি স্বীকার করে যান অবলীলায়। কিন্তু দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দলের সিরিজ ড্রয়ে স্বস্তি নিয়ে করা প্রশ্নে যান রেগে। একটু কি স্ববিরোধিতা হয়ে গেল না মাহমুদ উল্লাহ?

মন্তব্য