kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

বাফুফের অদ্ভুত গোপনীয়তার চুক্তি

সনৎ বাবলা   

১৫ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘গোপনীয়তা চুক্তি’র ভেতর ঢুকে যাচ্ছে দেশের ফুটবল। এমনিতেই মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ফুটবল থেকে, সেটিকে আরো সঙ্গোপনে রাখতেই যেন জারি হচ্ছে নতুন কালা-কানুন! বাফুফে সংশ্লিষ্ট কেউ ফেডারেশনের ভেতরকার কর্মকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলতে পারবে না বাইরে।

ফেডারেশনের পুরনো স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছিল আগেই। সেগুলো নতুন করে সাজানো শুরু হয়েছে এবং যাদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি করে ‘গোপনীয়তা চুক্তি’নামা। বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ স্বাক্ষরিত এই চুক্তিনামার সাতটি ধারায় বলা হয়েছে নানা বিধিনিষেধের কথা। এগুলো মেনে নিয়ে ফিরতি ফরম পূরণ করে সাধারণ সম্পাদক বরাবর প্রেরণ করেই স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হতে হবে।

ধারাগুলোর মূল সুর একই। কোনো ‘গোপনীয় এবং আইনিভাবে সুরক্ষিত তথ্য তৃতীয় পক্ষকে জানানো যাবে না।’ ‘কোনো তথ্যের ফটোকপি কিংবা ছবির আকারে কিংবা সারমর্ম তৃতীয় পক্ষকে সরবরাহ করা যাবে না বাফুফের অনুমতি ছাড়া।’ এর অন্যথা হলে সদস্যকে ‘মাসুল’ দিতে হবে—এমন হুঁশিয়ারি উল্লেখ করা হয়েছে শেষ ধারায়। মজার শব্দ দুটো হচ্ছে ‘তৃতীয় পক্ষ’, এটা কে বা কারা? বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের জবাব, ‘এটা যে কেউ হতে পারে, যাদের কাছে গোপনীয় তথ্য গেলে বাফুফের ক্ষতি হতে পারে, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। একটা সংগঠনে অনেক গোপনীয় বিষয় থাকতে পারে, সেগুলো যেন বাইরে না যায় সে জন্যই এটা করা। বাইরে আমরা শুধু সিদ্ধান্তগুলোই জানাই। ধরুন, ফিন্যান্স কমিটির কেউ একজন গুরুত্বপূর্ণ একটা কাগজ বাইরে দিয়ে দিল। তাতে ফেডারেশনের ক্ষতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।’ সম্পাদক নিজের মতো করেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ফিন্যান্সের সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ওই এক কাগজ কেন, হাজারটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজেও ফেডারেশনের ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা থাকে না।

তাই বোধ হয় দেশের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া ফেডারেশন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এমন ‘গোপনীয়তা চুক্তি’র প্রয়োজন পড়েনি। বিসিবি পরিচালক ও মিডিয়া উইংয়ের প্রধান জালাল ইউনুস বলেছেন, ‘বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গোপনীয়তা রক্ষার অঙ্গীকারনামা থাকে কর্মচারীদের জন্য। কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডে এই কালচার নেই, গোপনীয়তা রক্ষার ফরম পূরণ করে স্ট্যান্ডিং কমিটিতে ঢুকতে হয় না।’ ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো তো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয় যে কোনো তথ্য প্রতিদ্বন্দ্বী কম্পানির হাতে পড়লে ব্যবসা বেহাত হয়ে যাবে। ক্রীড়াঙ্গনে তো সেই ভয় নেই। খেলোয়াড়-সংগঠকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখর হয় এই অঙ্গন। খেলাগুলোর সুন্দর আয়োজনের জন্য আছে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো। সুতরাং এখানে অপকর্ম না থাকলে তথ্য লুকানোর কিছু থাকে না। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপ মহাসচিব ও হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কোহিনূরও তাঁর লম্বা সাংগঠনিক জীবনে দেখেননি এমন চুক্তি, ‘দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এ রকম চুক্তি এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আমি দেখিনি এবং শুনিনি। আমার ফেডারেশন কিংবা বিওএতে গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজন হয়নি কখনো। সংগঠকরা সব সময় খেলার স্বার্থেই কাজ করে, কী করা উচিত আর অনুচিত সেগুলো তারা ভালোভাবেই জানে। তা ছাড়া এমন উদ্যোগ সরকারের তথ্য অধিকার আইনের পরিপন্থীও।’

এর পরও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রথমবারের মতো ফুটবল ফেডারেশন শুরু করছে ‘গোপনীয়তা চুক্তি’ নামে কালা-কানুনের চর্চা। এই খবর শুনে বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদও যেন চমকে গেলেন। বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটির অনেকে চুক্তিনামা সংবলিত বাফুফের চিঠি পেলেও তিনি এখনো হাতে পাননি, ‘এখনো চিঠি হাতে পাইনি তবে গোপনীয়তা চুক্তি কাম্য নয়। আমার সময় (যখন ফুটবলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন) সবই ছিল উন্মুক্ত, এর পরও কোনো ক্ষতি হয়নি তো। সংগঠকরা আসেন বিনা পয়সায় শ্রম দিতে। এ রকম আইন করা তাদের জন্য অপমানজনক।’ তবে বাফুফে সাধারণ সম্পাদক দোহাই দিচ্ছেন ফিফা-এএফসির, ‘ফিফা-এএফসির সাব কমিটিতেও এ রকম গোপনীয়তার ফরম পূরণ করতে হয় সদস্যদের।’

হায় রে ফিফা-এএফসি! যখন যেভাবে দরকার সেভাবে দুই আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ব্যবহার করে বাফুফে। বহুল আলোচিত ‘ফিফা দুর্নীতি কেলেঙ্কারি’র পর ফিফায় হয়েছে নানা সংস্কার। তারা সব ধরনের চুক্তি এবং আর্থিক বিষয়-আশয় উন্মুক্ত করে দিয়ে স্বচ্ছতার চর্চা শুরু করেছে। ফিফার নিয়মের বুলি আউড়ালেও এই লাইনে হাঁটেনি বাফুফে। বরং দিনকে দিন অবগুণ্ঠিত হচ্ছে বাফুফে।

মন্তব্য