kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

ধূসর মরুতে আরেকটি সবুজ বিপ্লবের স্বপ্নে

অনলাইন ডেস্ক   

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধূসর মরুতে আরেকটি সবুজ বিপ্লবের স্বপ্নে

এক পাশে একটু দূরে ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আল হাজর মাউন্টেন রেঞ্জের একাংশ। অন্য পাশে আল আমরাত পাহাড়। দুই পাশের পাথুরে পাহাড়ের মাঝখানেই রুক্ষ আর শুষ্ক মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আল আমরাত ক্রিকেট স্টেডিয়াম। মাসকাট শহরের প্রাণকেন্দ্র রুয়ি থেকে সেখানে যেতে-আসতে কোথাও সবুজের চিহ্ন তেমন চোখেই পড়ল না। শুনে মেলবোর্ন থেকে টেলিফোনে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলামের পরামর্শ, ‘ওমানের মরুভূমিতে সবুজ দেখতে হলে আপনাকে মাসকাট থেকে একটু দূরে যেতে হবে।’

এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হওয়ার সুবাদে এই দেশে নিয়মিত যাতায়াত আছে বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়কের। সেই সূত্রে ঘুরে দেখা আছে এখানকার অনেক জায়গাও। ওমানের ধূসর মরুতে খণ্ড খণ্ড সেসব সবুজ ভূমি হয়তো তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না। তবে বুক ফুলিয়ে দেয়। কারণ শুনলে গর্বানুভব করতে পারেন আগামীকাল স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে এখানেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর অপেক্ষায় থাকা মাহমুদ উল্লাহরাও, ‘ওমানের সবুজ বিপ্লবের নায়ক যে বাংলাদেশিরা, সেটি কি জানেন? এখানে কৃষিকাজ ও চাষাবাদ থেকে শুরু করে বাগান করার কাজ মূলত বাংলাদেশিরাই করে থাকেন। ওঁদের জন্যই খটখটে মরুও এখন সবুজের ছোঁয়া পাচ্ছে।’

সেই ছোঁয়া দিতে এখানে প্রতিনিয়ত শ্রমে-ঘামে ভিজছেন শ্রমিক হিসেবে আসা বাংলাদেশিরাই। বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী এখানে থাকা বাংলাদেশিদের সংখ্যাটা ছয় লাখ থেকে সাত লাখের মাঝামাঝিই। এঁদের বেশির ভাগই শহর থেকে একটু দূরে নয়তো বহু দূরে সবুজ ফলাচ্ছেনই না শুধু, নিষ্প্রাণ মরুকে প্রাণবন্ত করার চ্যালেঞ্জেও জিতছেন। এই মুহূর্তে মাসকাটেই থাকা আরো ১৫ জন বাংলাদেশির জন্যও একই রকম চ্যালেঞ্জ নিয়ে অপেক্ষায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। হারের দুঃসহ মরুতে জয়ের সবুজ ফলানোর কাজটি মাহমুদ উল্লাহদের কাছে ততটাই কঠিন হয়ে আছে, যতটা একসময় ছিল মরুভূমিতে ফসলের ক্ষেত-খামার করতে আসা বাংলাদেশিদের জন্যও।

তাঁদের এক দিনে হয়নি, সময় লেগেছিল। সময় লাগলেও তাঁরা সফল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ক্রিকেটের বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সে রকম বলার উপায় নেই। তাঁরা বরং একটু বেশিই সময় নিয়ে ফেলছে। সেই ২০০৭ সালে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে হৈচৈ ফেলে দেওয়ার শুরুর পর মূল পর্বে আর কোনো জয়ই নেই। এমনকি প্রথম পর্বের মোড়কে হওয়া বাছাই পর্বেও আছে হংকংয়ের মতো দলের কাছে হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে ১৪ বছর। এই সময়ে ওয়ানডের বিশ্বকাপে সাফল্যের সোনা রোদ দেখলেও টি-টোয়েন্টিতে শুধুই মরুর জ্বালা ধরানো সূর্যালোক দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া সবুজ জার্সিধারীরা এবার সত্যি সত্যিই মরুভূমিতে এসে পড়েছেন।

এখানে এসেও ধাক্কা খেয়েছেন তাঁরা। মাসকাটে অল্প কয়েক দিনের অনুশীলন শিবির করেই অফিশিয়াল প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে গিয়েছিল আরেক মরু শহর আবুধাবিতে। সেখানে শ্রীলঙ্কার পর আয়ারল্যান্ডের কাছেও হারে যেন পুরনো শঙ্কার মেঘই ভেসে উঠেছে আবার। প্রথম পর্বের বাধা পেরোনো নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সংশয়ের কথা উচ্চারিত না হলেও ‘সুপার টুয়েলভ’ নামের মূল পর্বে যখন অপেক্ষায় ভারত, পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ড, তখন শেষ প্রস্তুতি ম্যাচের ফল ভয়ের দামামা বাজিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

তা কিছুটা টের পেয়েছেন বলেই কি না বাংলাদেশের এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ স্বপ্ন নিয়ে খুব বেশি আর কথা বাড়াতে রাজি হলেন না আরেক সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান। জাতীয় দলের দেখভাল করা কমিটির প্রধান গতকাল ভোরেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ড্রিমলাইনারে পরিবার নিয়ে মাসকাটে এসেছেন। একই উড়ানে সহযাত্রী সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপে জানালেন, আয়ারল্যান্ডের কাছে হারে ‘প্রচণ্ড মন খারাপ’ তাঁর। সে জন্যই হয়তো নতুন কোনো স্বপ্নের কথা বলতেও উৎসাহী হলেন না। তাই বলে এমন নিশ্চয়ই নয় যে এই সংস্করণের বিশ্বকাপে হারের মরুতে তিনি জয়ের সবুজ ফোটানোর স্বপ্নও দেখছেন না। 

সেই ‘সবুজ’-এর পরিধি বিস্তৃত আপাতত মূল পর্বে জয়ের দেখা পাওয়া পর্যন্তই। ২০০৭-এর পর হয়ে গেছে আরো পাঁচ-পাঁচটি আসর। মূল পর্বে জয় নেই আর একটিও। এই সংস্করণের বিশ্ব আসর তাই বাংলাদেশের জন্য হয়ে আছে ধূসর মরুভূমিই। যেখানে এবার সবুজ ফলানোর স্বপ্নে মাঠের লড়াই শুরু হচ্ছে এমন জায়গা থেকে, যেখানে বাংলাদেশিরাই সবুজ বিপ্লবের নায়ক। মাহমুদ উল্লাহরাও নিশ্চয়ই এখান থেকে এ রকমই আরেকটি সফল বিপ্লবের মধ্যমণি হয়ে উঠতে চাইবেন!



সাতদিনের সেরা