kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৫ কার্তিক ১৪২৮। ২১ অক্টোবর ২০২১। ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

‘সুরক্ষায় থাকুন, সুস্থ থাকুন’ লাইভ

শুধু ক্রিকেটে না, হারা পছন্দ করতাম না: জাভেদ ওমর বেলিম

অনলাইন ডেস্ক   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৪:৩৭ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



শুধু ক্রিকেটে না, হারা পছন্দ করতাম না: জাভেদ ওমর বেলিম

পুরনো ছবি

কালের কণ্ঠ ও বীকনের যৌথ উদ্যোগে 'সুরক্ষায় থাকুন, সুস্থ থাকুন' স্লোগানে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ অনুষ্ঠান হয়েছে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হয়ে প্রায় ৫০ মিনিট ধরে চলে। কালের কণ্ঠ'র ফেসবুক পেইজ, ইউটিউব চ্যানেল ও কালের কণ্ঠ'র ওয়েবসাইটে অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখানো হয়।

'সুরক্ষায় থাকুন, সুস্থ থাকুন' শিরোনামের এ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার জাভেদ ওমর বেলিম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন কালের কণ্ঠ'র স্পোর্টস এডিটর এ টি এম সাইদুজ্জামান। অনুষ্ঠানটি স্পন্সর করেছে হাইজিনেক্স।

কালের কণ্ঠ: অনেক দিন ধরে আপনি খেলেছেন, অনেক সাক্ষাৎকারে আপনি এসেছেন, সবাই আপনার সম্পর্কে অবগত। আপনার শিশুকালে একটু ফিরে যেতে চাই। কারণ, খেলাধুলার সাথে আপনার পুরো পরিবারের সম্পৃক্ততা আছে; সেটা ক্রিকেটে আছে, ফুটবলে আছে, হকিতে আছে। আপনি কি একটু সংক্ষেপে বলবেন যে, শিশুকালে কিভাবে খেলাধুলার সঙ্গে আপনার হাতেখড়ি? আপনি কেন ক্রিকেটে এলেন, হকিতে না গিয়ে? 

জাভেদ ওমর বেলিম: আজ থেকে ২৫ বছর আগের কথা চিন্তা করেন। ওই সময় স্কুলে সব খেলা খেলতো; ফুটবল, ক্রিকেট, হকি। কেউ তো চিন্তা করেতো না যে সে ক্রিকেট প্লেয়ারই হবে বা ফুটবল কিংবা হকি প্লেয়ার। বাসায় আসলে সবাই ফুটবল খেলতো কিন্তু প্রফেশনালভাবে হকি আর ক্রিকেট খেলতো।সেকেন্ড ডিভিশন যদি বলেন, আমার যে ভাই মারা গেছে, আসিফ; সে খেলেছে। শৈশবকাল যদি বলেন, থ্রি ফোর ফাইভ যতদূর আমার মনে আছে, ওই সময় নবকুমার স্কুলে চাচাতো সাত ভাই মিলে ম্যাচ খেলা হতো। যেহেতু আমি অনেক ছোট, কিন্তু ফিল্ডিংটা ভালো করতাম। ওই একটা কারণে দলে চান্স পাওয়া। ব্যাটিং হয়তো পেতাম না বা লাস্টের দিকে আসতো; কিন্তু ফিল্ডিংটা করতাম। ১৯৮৫ সালে সম্ভবত হকির একটা বড় টুর্নামেন্ট হয়েছিল। এশিয়া কাপ ছিল। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে টপ খেলে হেরেছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। 

তারপর তো হকির পুরো জোয়ার। ক্যাম্প ডাকে, ক্যাম্পে খেলি আমি। হকি মুক্ত বিহঙ্গতে খেললাম আমি। সাম হাউ বাসায় কালচার ছিল। যেহেতু বাবারা এবং বড় ভাইয়েরা মিলে রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনতাম। আমি স্কুল ক্রিকেটে ওই সময় ভেরি স্ট্রং। ১৯৮৫ সালে সম্ভবত আমি ফোরে না ফাইভে ছিলাম। ফিল্ডিংয়ে ভালো করতাম। ওই একটা জায়গার জন্য আমাকে নামানো হয়; কিন্তু আমি একটা ম্যান অব দ্য ম্যাচ পাই।

ওই সময় কিন্তু আমি ম্যান অব দ্য ম্যাচ পাওয়ার কথা না। টপ ফিল্ডিং দিয়েছিলাম আর ১৫ রান করেছিলাম। কিন্তু আমাকে ইন্সপায়ার করার জন্য নবকুমার স্কুলের আমাকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ করা হয়। তারপর এই তো ক্রিকেট খেলছি, ফুটবল খেলছি; মুন্না ভাই, কায়সার হামিদ তাদের সঙ্গে ফুটবল সেরকম খেলি। হকি আবার সেকেন্ড ডিভিশন খেলছি, ফুটবল শুটিং প্র্যাকটিস করছি, ক্রিকেট খেলছি মোটামুটি ম্যাচগুলো দেখতে দেখতে। কিন্তু ভাইয়েরা বা কাজিনরা তখন ইংল্যান্ড যেত। তখন তো আর ইংল্যান্ড বলতো না বিলেত বলতো।

তো ওইখানে একবার ক্যাম্প ডাকে। আমার বরাবরের শখ যে, একবার বিলেত যাবো। ওই সময় ১৪৫ জনকে মনে হয় বাংলাদেশ থেকে ডেকেছিল। তার মধ্যে ১৮ জনের চান্স পাওয়ার কথা ওইভাবে চিন্তা করিনি। আমার চিন্তা ছিল- বিলেত যেতে হবে। ওই বিলেতে যাওয়ার পর ঢাকায় এশিয়া কাপ হয়। আমি তখন এশিয়া কাপটা খেলি। খুব ভালো খেলেছিলাম।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৫৫ রানে আমি রানআউট হয়েছিলাম, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বোধ হয় ৫৪ রানে আউট হই, ইন্ডিয়ার সাথে ২৯ এরকম। এশিয়া কাপে ইউসুফ বাবু ভাই আমাকে বেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে একটা ব্যাট দেয়। ইন্ডিয়ার ওই টিমে সৌরভ গাঙ্গুলিও বোধ হয় ছিল। তারপর যে ক্রিকেটে আসা, তারপর অবশ্য খেলেছি হকি; কিন্তু ওই মাথাব্যথা আর নেই। তখন একটাই ভাবনা- ক্রিকেটার হতে হবে।

যেহেতু বাসায় পুরো ক্রিকেট কালচার ছিল, ফুটবল সাপোর্ট ছিল। আবাহনী-মহামেডান খেলা হলে রাত ৪টা পর্যন্ত তর্ক-বিতর্ক চলতো। সাত ভাই এক বোন ছিলাম তো। আগে তো আশপাশটাও এমন ছিল যে, এখন যেমন প্রেসটিজ ইগো প্রবলেম, কেউ কাউকে চেনে না। আগে আমি যেমন ডাল ছাড়া খেতে পারি না; বললাম এই পাশের বাড়ি থেকে ডাল নিয়ে আয়। বাসায় আমরা কেউ না থাকলেও পাশের বাড়ির লোকজন এসে বুয়াকে বলে- এই বুয়া চা বানান তো। 

আমার পাশের বাসার ওরা আমার খুব ক্লোজ। এরকম পরিবেশ ছিল। আমাদের একটা ক্লাব ছিল- বৈশাখী। ওই বৈশাখী ক্লাবে সারাদিন খেলা হতো। এরশাদ পতনের পর কারফিউ জারি হলো। প্রচুর খেলা হতো। সকাল, বিকাল দুপুর সবসময় খেলা হতো। স্কুল তো বন্ধ, হুলুস্থুল অবস্থা। ওই একটা জায়গা থেকে ক্রিকেটে, এশিয়া কাপে ভালো খেলার পরে ক্রিকেটার হতে হবে মনে প্রাণে ওই একটা জায়গা চুজ করি। কিন্তু আমি দেখা পছন্দ করতাম ফুটবল, হকি। 

ক্রিকেট কিন্তু খুবই কম দেখতাম। হয়তো ক্লাবের খেলা কিংবা বড় খেলা; সে ক্ষেত্রে এক ঘণ্টা দেখে চলে আসতাম। কিন্তু হকি ক্লাব লেভেলে আমি দেখতাম, ফুটবল খেলা দেখতে যেতাম। আবাহনী ক্লাবে মনে হয় আমি ৮৯, ৯০ এ খেলেছিলাম। ৯১ সালে মেট্রিক দিয়েছি, ৯০ সালে ক্লাস টেনে ছিলাম। তখন রুমি ভাই, মুন্না ভাই, রেহান ভাই; আবাহনী ক্লাবের কেউ আমাকে চিনতো না কিন্তু আমি আবাহনী ক্লাবের বাসে বসে বঙ্গবন্ধুতে খেলা দেখতে আসতাম। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম যেহেতু আমার বাসার পাশে। কিন্তু আমাকে বাসা থেকে অ্যালাউ করবে না। যাবো কিভাবে, টিকিটের ব্যাপার, সবকিছুর ব্যাপার। 

সে কারণে ক্লাবে চলে যেতাম দুপুর ৩টায়; ৪টার সময় বাস ছাড়তো, ৭টার সময় খেলা। ক্রিকেট যখন খেলেছিলাম আবাহনীতে, মনে পড়ে নাদির শাহকে, আল্লাহ উনাকে বেহেশত নসিব করুক। ওই একটা বছর আমার সুযোগ হয়েছিল উনার ফরে খেলার। বাঘ মামা ছিল, আসিফ ছিল, আমার যে ভাই মারা গেছেন। এহসান ভাই ছিলেন। আবাহনীতে খেলার পর সাপোর্টের যে মজা, এতো ক্রেজ পাবলিকের। তারপর প্রিমিয়ার লীগ, ৯৩ সালে তো ডাক পেলাম। জাতীয় লীগ বরাবরই সব সময় ভালো খেলতাম। ৯৩ এর পর ৯৪ এ সার্ক ক্রিকেটে চান্স পেলাম। খেলিনি একটা ম্যাচও। এরপর ইংল্যান্ড এ দল আসলো; সেখানে ভালো খেললাম। ১৯৯৫ সালে তো আমার ইন্টারন্যাশনাল ডেবিউ হলো। তারপর আর ফুটবল খেলি না, ফিটনেসের জন্য হয়তো খেলতাম। হকি তো আর খেলাই হয়নি। কিন্তু খেলা দেখতে মাঠে যেতাম।

আমার ছোটবেলা এমনভাবে কেটেছে যে, ক্লাস ফোর ফাইভেই পার্টি অন ছিল। পার্টি অন মানে হলো- ডেসপারেট ছিলাম খেলার প্রতি। শুধু ক্রিকেটে না, হারা পছন্দ করতাম না। ছোটবেলায় মানুষ পিকনিক করে, কিন্তু আমি কখনো যাইনি। ওই সময় হয়তো কোনো খেলা হতো। খেলার জন্য রাতের বেলা দেয়াল টপকে গিয়ে পানি নিয়ে এসে খেলার মাঠ দরমুজ করা হতো। তিনটা দরমুজ দিয়ে আমরা মারতাম মাটিতে। সকাল বেলা বাসায় আসতাম। নাস্তা করে সাড়ে ১০টায় খেলা। ৪০ ওভারের খেলা বা ৫০ ওভারের খেলা। সেটা কার্জন হল মাঠ বলেন আর নবকুমার স্কুল মাঠই বলেন। ওই সময় নবকুমার স্কুল মাঠে বড় টুর্নামেন্ট হতো। ওই একটা জায়গা থেকে ক্রিকেট একটা কালচার ছিল, বকশিবাজারের পুরো বিষয় ক্রিকেট। ইয়াং টাইমেও ক্রিকেটের প্রতি এতো ডেসপারেট ছিলাম, হয়তো কখনো পিকনিক বলেন, ইউনিভার্সিটির পিকনিক বলেন বা কলেজের বলেন- আমি কখনো যাইনি। ক্রিকেটটা এতো মজা লাগতো যে কারণে যাইনি। এখন মনে হয়, ওইটা প্রেশার ছিল। কিন্তু এতো এনজয় করেছি আমি, আমার কখনো প্রেশার মনে হয়নি। বাংলাদেশ টিম থেকে অনেকবার বাদ পড়েছি, কিন্তু কখনো প্রেশার মনে হয়নি। 

কালের কণ্ঠ: আপনাদের সময়ে অনেক টেলেন্টেড ক্রিকেটার ছিল। তাদেরকে আপনি হারিয়েছেন অনেক সময়। তাদের জায়গা আপনি নিয়েছেন। আপনাকে অনেক সময় তুলনা করা হতো ট্যালেন্ট ক্রিকেটারের সঙ্গে। এতোদিন পরে এসে সেই বিষয়টাকে কিভাবে বিচার করবেন? 

জাভেদ ওমর বেলিম: আমি এখন কোচ। অনেকেই কোচ পছন্দ করে না। কিছু হলেই বলে হি ইউ ট্যালেন্টেড। ট্যালেন্ট কী? আপনি যদি নামানো হয়, আপনি যদি চার-ছয় মেরে দেন; আপনিও ট্যালেন্ট। কিন্তু ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে আপনাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আপনি আমি টেনিস বলে ম্যাচ খেললাম। সৌম্য সরকার পাঁচ রানে আউট হয়ে গেছে, আপনি দুইটা ছয় মেরে আউট হয়ে গেছেন। আপনি জয়লাভ করেছেন, কিন্তু আমি আমার ক্যারিয়ারে এটা বিশ্বাস করি না যে, আমি অবশ্য এভাবে বললে আমার বউ দ্বিমত করে। কিন্তু আমি যখন বলি- একটা গর্ব অনুভব করি।

আমার সময়ে যারা ট্যালেন্ট আসছে ওহ মাই গড! গুড টু ওয়াচ। বিদ্যুৎ ওয়াও, আল শাহরিয়ার রোকন ওয়াও, অলোক কাপালি ওয়াও, মোহাম্মদ আশরাফুল, হান্নান সরকার নট অনলি এ প্লেয়ার। ওই জায়গা থেকে আমি বিশ্বাস করি নট অনলি ট্যালেন্ট। হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে এবং প্রোপার হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে। হার্ড ওয়ার্ক কিন্তু টপ লেভেলের সবাই করে। আমার ছেলেকে এই মেসেজ দিই যখন আমি কোচিং করাই। গত দুই দিন আগে আমি নাসিরকে ফোন দিয়েছিলাম। নাসির তোমার প্রমাণ করার কিছু নেই। হার্ড ওয়ার্ক, লাইফ স্টাইল আর চিন্তাধারা যে, আমি কী চাচ্ছি। আপনার চিন্তাকে পরিবর্তন করতে হবে। আমি ভালো, আমি এইটা, আমাকে নেয় না; এসব ফালতু কথা। আমি বকা দিয়ে বললাম- অল আর রাবিশ।

দিন শেষে নির্দিষ্ট পারফরমেন্স করলে আপনার জায়গা হয়ে যাবে। মেন্টালি আমি খুব স্ট্রং ছিলাম। আমি জানতাম দিনশেষে আমাকে পারফর্ম করতে হবে। আমি এমন ক্রিকেট খেলতাম যে আমাকে নিতে বাধ্য হতো। আমি উইকেটে টিকে থাকতে পারতাম। ওই সময়ে বাংলাদেশ ৫০ ওভার উইকেটে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতো। আমাকে অ্যাংকর রোল দিতো। অ্যাংকর রোল দেওয়ার জন্য যখন আমাকে ক্যাপ্টেন ম্যাসেজ দিলো বা মিডিয়া লেখলো- জাভেদ ওমর যদি ফার্স্ট খেলতো- তাহলে হয়তো আরো ২০ রান বেশি হতো। কিন্তু এর আগে ফার্স্ট খেলে ১১৩ তো তো আমরা অলআউট হয়ে গেছি। যখন রাস্তায় কেউ বলে, বস আপনি থাকলে টেনশন থাকতো না, আমি প্রাউড ফিল করি। 
ভিডিওটি দেখতে পারেন ... 



সাতদিনের সেরা