kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

এশিয়াডে ব্যক্তিগত ইভেন্টে একমাত্র পদকজয়ীর করুণ জীবনসংগ্রাম

কিংবদন্তির অসহায়ত্ব আমাদের লজ্জা

মাসে আয় দুই হাজার ৭৪৪ টাকা

অনলাইন ডেস্ক   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কিংবদন্তির অসহায়ত্ব আমাদের লজ্জা

ছবি : সালাহ উদ্দিন

১৯৮৬ সিউল গেমস বক্সিংয়ে ৮১ কেজি লাইট হেভিওয়েটে মোশাররফ হোসেন জিতেছিলেন ব্রোঞ্জ। এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক নেই বাংলাদেশের আর কারো। ১৯৮১ থেকে টানা ১০ বছর মোশাররফ ছিলেন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। দেশের অন্যতম সেরা এই ক্রীড়াবিদ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে প্রায় তিন বছর শয্যাশায়ী। ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে খোঁজ মিলল অসহায়ত্ব আর বঞ্চনায় ভরা জীবনের। অথচ বক্সিং ফেডারেশন, বিওএ আর এনএসসির কেউ পাশে দাঁড়ায়নি তাঁর। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সাবেক বক্সাররাও। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

প্রশ্ন : রাশভারী মোশাররফের কথায় একটা সময় গমগম করে উঠত রাজশাহীর তালাইমারীর এই বাড়ি। এখন তো চেনাই যাচ্ছে না আপনাকে?

মোশাররফ হোসেন : নিজেই ভুলে যাই যে বক্সার ছিলাম! খেলাটা ছাড়ার পর সেভাবে আর কেউ খোঁজ নেয়নি। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে প্রায় তিন বছর পুরোপুরি শয্যাশায়ী।

প্রশ্ন : যুব গেমসের ম্যাচ পরিচালনা করতে গিয়ে ২০১৮ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন আপনি। এর পর থেকেই তো এই অবস্থা...

মোশাররফ : হ্যাঁ। ৯ মার্চ ঢাকা যাই। বক্সিং ফেডারেশন থেকে রাখা হয়েছিল মতিঝিলের একটা সস্তার হোটেলে। অসুস্থ হয়ে পড়ি হঠাৎ। মধ্যরাতে আক্রান্ত হই হৃদরোগে। ভাগ্য ভালো সময়মতো ভর্তি হতে পেরেছিলাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। সেখানে সাত দিনের মতো চিকিৎসা চলল। সেখানেই অবশ হয়ে গেল শরীরের বাঁ পাশটা। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে হওয়ায় চিকিৎসাটা বিনা পয়সায় হয়েছে। নইলে সেই খরচও দিতে পারতাম না।

প্রশ্ন : ফেডারেশনের টুর্নামেন্ট পরিচালনা করতে এসেছিলেন, তারা সাহায্য করেনি?

মোশাররফ : তখন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দুল কুদ্দুস। তিনি তো বটেই, ফেডারেশনের কেউ আসেনি হাসপাতালে দেখা করতে। একটা অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য সাহায্য চেয়েছিলাম। ব্যস্ত আছি বলে ফোন রেখে দেন কুদ্দুস সাহেব। আমি বাড়ি ফিরি লোকাল একটা বাসে। নিজের জন্য দুই সিট নেব সেই সামর্থ্য ছিল না।

প্রশ্ন : চিকিৎসা কি রাজশাহীতেই চলছিল।

মোশাররফ : এ ছাড়া উপায় কী। ফিজিওথেরাপি করাতে হয় দিনে দুইবার। এক বেলা বাসায় আরেক বেলা স্থানীয় কমফোর্ট ফিজিওথেরাপি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। প্রতি বেলা খরচ ৪০০ টাকা। মানে দিনে দরকার অন্তত ৮০০ টাকা। সঙ্গে অটো ভাড়া আছে। আমার শরীরটা একটু ভারী। অচল বলে দু-তিনজন মিলে অটোতে তুলতে হতো।

প্রশ্ন : তুলতে হতো মানে?

মোশাররফ : মানে এখন আর হয় না। আসলে টাকার অভাবে ফিজিওথেরাপি বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের তালাইমারীর বাঁদুরতলার পৈতৃক বাড়িটার একটা ফ্লোর ভাড়া দিয়েছিলাম। করোনার জন্য ভাড়াটিয়া নেই দুই বছর। মাস চলছে তাই পেনশনের দুই হাজার ৭৪৪ টাকায়। এই যুগে এসে এত অল্প টাকায় কিভাবে সংসার চলে বলতে পারেন? আমার এক ছেলে জন্মের এক বছর পর থেকে হুইলচেয়ারে। দুই মেয়ের একজন মাহমুদা হোসেন ডাক্তার আর ছোট মেয়ে মাহফুজা হোসেন পড়ছে আইন নিয়ে। মেয়ে আর ডাক্তার জামাই সাহায্য না করলে পথে বসতে হতো। অবশ্য এখন ডাক্তার মেয়েই তো ভেঙে পড়েছে মানসিকভাবে। ঝড় বয়ে গেছে ওর জীবনের ওপর দিয়ে।

প্রশ্ন : কী রকম?

মোশাররফ : করোনায় এ বছরের মে মাসের ২৩ তারিখে মারা গেছে ডাক্তার জামাই। মেয়েটা তখন থেকেই পাগলপ্রায়।

প্রশ্ন : বক্সিং ফেডারেশন বা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বন্ধু, সতীর্থ বা কর্তাদের কেউই যোগাযোগ করেন না?

মোশাররফ : আগের সাধারণ সম্পাদকের কথা তো বললামই। নতুন সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম তুহিন বঙ্গবন্ধু কল্যাণ পরিষদ থেকে ২৪ হাজার টাকার অনুদান এনে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পারেননি। অবসরের পর আমার ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। এরপর সার্ভিস বেনিফিট পাওয়ার কথা। অথচ সেটাও পাচ্ছি না।

প্রশ্ন : ১৯৮৬ সালে এশিয়ান গেমস থেকে ব্রোঞ্জ জেতার পর সে সময়ের বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি জেনারেল এইচ এম এরশাদ তো অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আপনাকে?

মোশাররফ : ফুলের মালা নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন বিমানবন্দরে! আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন ঢাকায় ফ্ল্যাট আর গাড়ি দেওয়ার কথা। কিন্তু পরে সব ভুলে যান তিনি। এখন তো সাফে পদক জিতলেও বাড়ি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ সাফের চেয়ে এশিয়ান গেমসের ব্যক্তিগত ইভেন্টের একটা পদকের মূল্য হাজার গুণ বেশি। এই গুণের কদর করারই কেউ নেই এখন।



সাতদিনের সেরা