kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

টি-টোয়েন্টিতে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াবধ

বাংলাদেশ : ২০ ওভারে ১৩১/৭, অস্ট্রেলিয়া : ২০ ওভারে ১০৮, ফল : বাংলাদেশ ২৩ রানে জয়

মাসুদ পারভেজ    

৪ আগস্ট, ২০২১ ০২:৩৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টি-টোয়েন্টিতে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াবধ

নাসুম আহমেদের বিষে নীল অস্ট্রেলিয়া। তাঁর ঘূর্ণিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ছবি : মীর ফরিদ

ম্যাচের প্রথম ডেলিভারিটাই দুরন্ত গতির। তাতে যেন চোখে-মুখে অন্ধকার দেখলেন নাঈম শেখ। ঠিক পরের বলেই অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার মিচেল স্টার্ককে পাল্টা অন্ধকার দেখালেন বাংলাদেশ দলের ওপেনারও। ফ্লিক করে মারলেন বিশাল এক ছক্কা। অবশ্য এরপর এ রকম পাল্টাপাল্টি অন্ধকার দেখানোর ব্যাপারটি আর তেমন জমলই না। একেই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট ধীরগতির। এমন উইকেটে নিয়মিত খেলে অভ্যস্ত দলের ব্যাটিংটা হলো আরো ঢিমেতালের। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সঙ্গে বেমানান ব্যাটিংয়ে যেন অন্ধকারে ডুবে থাকল স্বাগতিকরাই।

পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে সফরকারীদের লক্ষ্য তাই খুব বেশি দেওয়া গেল না। তবু অন্ধকারে আলো ফুটতে শুরু করল। শুরু করল এ জন্যই যে, এ রকম বল থেমে ব্যাটে আসা উইকেটে খেলতে একদমই অভ্যস্ত নন এই অস্ট্রেলিয়া দলের ব্যাটসম্যানরা। ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভেন স্মিথ ও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের মতো ব্যাটসম্যানরা তবু আইপিএল খেলার সুবাদে ভারতীয় উপমহাদেশের উইকেটের চরিত্র বুঝে খেলায় পারদর্শী। এই সফরে তাঁদের অনুপস্থিতিতে তাই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অভিজ্ঞতা ছায়াহীন। আবার অনভিজ্ঞরা যে উইকেট বুঝে নিয়ে ধাতস্থ হবেন, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সেই সুযোগও নেই।

তার ওপর বাংলাদেশের স্পিনারদের বলও ঘুরতে শুরু করল। দুয়ে মিলে পথ হারালেন সফরকারী দলের ব্যাটসম্যানরাও। মাহমুদ উল্লাহর দলের ৭ উইকেটে তোলা ১৩১ রানও যেন এক পর্যায়ে অনেক দূরের পথ বলে মনে হতে থাকল ম্যাথু ওয়েডদের কাছে। শেষ পর্যন্ত ২৩ রান দূরেই থামলেন তাঁরা। থামার আগে ব্যাটিংয়ের অন্ধকার তাঁরা যেন দেখলেন আরো বেশিই। সেই অন্ধকার তাঁদের যেন একটু বেশিই দেখালেন নাসুম আহমেদ। এর আগে চারটি টি-টোয়েন্টি খেলে মাত্র ২ উইকেট পাওয়া এই তরুণ বাঁহাতি স্পিনার নিজের মহিমা মেলে ধরলেন অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষেই। করলেন ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। ১৯ রানে নিলেন ৪ উইকেট। তাই নিজেদের ব্যাটিংয়ের অন্ধকার ফুঁড়ে আলো ফোটানো এক জয়ের দেখা পেল বাংলাদেশও।

যা আবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের প্রথম জয়ও। এর আগে দুই দল মাত্র চারবার একে অন্যের মুখোমুখি হয়েছে। তা-ও আবার সেসব দেখা টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসরেই। এটি দুই দেশের মধ্যে কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। এই সিরিজে শীর্ষ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের অনেকের না থাকা এবং অনভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনের এখানকার উইকেটের চ্যালেঞ্জ সামলানোর সম্ভাব্য অক্ষমতা নিয়ে গত কিছুদিন ধরেই চলছিল জোর আলোচনা। সেই আলোচনাকেই কাল যুক্তির দৃঢ়তা দিল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং। রান তাড়ায় শুরুতেই তারা নাকাল। তা-ও আবার ইনিংসের প্রথম বল থেকেই।

শুরুটা অবশ্য নাসুম নন, শেখ মেহেদী হাসানের। স্পিন করে বেরিয়ে যাবে ভেবে জায়গা বানিয়ে খেলতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার অ্যালেক্স ক্যারি। কিন্তু বাংলাদেশের অফস্পিনারের বল অ্যাঙ্গেলে ঢোকে ভেতরে। ক্যারির ব্যাট ফাঁকি দিয়ে বল আঘাত হানে স্টাম্পে। দ্বিতীয় ওভারে মাহমুদ আক্রমণে নিয়ে আসেন নাসুমকে। অন্য ওপেনার জশ ফিলিপ তাঁকে হাঁকান ছক্কা। এতে যেন বেরিয়ে মারার নেশায় পেয়ে বসে তাঁকে। তা মারতে যানও। কিন্তু নাসুমের ফ্লাইটে পরাস্ত হন ফিলিপ। পেছনে অপেক্ষায় থাকা উইকেটরক্ষক নুরুল হাসান উড়িয়ে দেন বেল। ১.৪ ওভারেই অস্ট্রেলিয়া পরিণত হয় ১০ রানে ২ উইকেট হারানো দলে।

বিপদ আরো ঘনীভূত হয় তৃতীয় ওভারে সাকিব আল হাসান আক্রমণে আসতেই। তাঁর অফস্টাম্পের ওপরে করা ডেলিভারিতে সুইপ করতে যান মোয়েজেস হেনরিক্স। কিন্তু বল তাঁর ব্যাটের নিচে লেগে দুই পায়ের ফাঁক গলে আঘাত হানে স্টাম্পে। ২.১ ওভারে ১১ রানে ৩ উইকেট নেই সফরকারীদের। রান তাড়ায় ১৩ বলের মধ্যেই স্পিনাররা ৩ শিকার ধরে দিতেই প্রথম ফোটে লো-স্কোরিং ম্যাচেও আলো ফোটানো জয়ের রেখা!

সেই রেখা এরপর উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতরই হতে থাকে কেবল। অথচ এর আগে টস হেরে ব্যাটিং পাওয়া বাংলাদেশকেও দেখিয়েছে অনুজ্জ্বলই। দলীয় সর্বোচ্চ ৩৩ বলে ৩৬ রান করা সাকিবও যেন সংগ্রাম করে ঠিক কুলিয়ে উঠছিলেন না। স্টার্ককে ফ্লিক করে নিজের দ্বিতীয় ছক্কাটি গ্যালারিতে নিয়ে ফেলা নাঈম শেখও ৩০ রান করতে খেলে গেছেন ২৯ বল। স্বাগতিকদের দেওয়া ডট বলের সংখ্যা ৪৭টি! যা ১২০ বলের ইনিংসের এক-তৃতীয়াংশ। অবশ্য শুধু এটুকু বললেই সব বলা হয় না। পাওয়ার প্লেতে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বলই ডট দিয়েছে বাংলাদেশ। ৩৬ বলের মধ্যে ২৩ বলে কোনো রানই হয়নি। পাওয়ার প্লেতে ১ উইকেটে মাত্র ৩৩ রান তোলা দলের রানরেট ৬ ছুঁতে পেরিয়ে গেছে ১৬ ওভার।

এমন ব্যাটিংয়ের পরও জেতার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে যা দরকার ছিল, তিন স্পিনার প্রথম তিন ওভারেই তা দিলেন। ম্যাচ সেরা নাসুম এরপর আরো চড়াও হলেন প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের ওপর। একে একে তুলে নিলেন ওয়েড, অ্যাস্টন অ্যাগার ও মিচেল মার্শকে। ৮৪ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বসা অস্ট্রেলিয়ার কাছে ততক্ষণে ২৭ বলে ৪৮ রানের সমীকরণ মেলানো দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। ওই অবস্থায় জয়ের ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড় দিতে এগিয়ে এলেন দুই পেসার মুস্তাফিজুর রহমান (২/১৬) এবং শরীফুল ইসলামও (২/১৯)। দুজন মিলে তুলে নিলেন সফরকারীদের শেষ ৪ উইকেট।

ব্যাটিংয়ের অন্ধকার ঢেকে গিয়ে তাই জয়ের আলোয় ভাসল বাংলাদেশও।



সাতদিনের সেরা