kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

অপেক্ষা ফুরাল মেসির আর্জেন্টিনার

রাহেনুর ইসলাম    

১২ জুলাই, ২০২১ ০৩:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অপেক্ষা ফুরাল মেসির আর্জেন্টিনার

জাতীয় দলের হয়ে প্রথম শিরোপা জিতেছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তাঁকে ঘিরে বাঁধনহারা উল্লাসে মেতেছেন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা।

ফাইনাল শেষে অঝোরে কাঁদলেন লিওনেল মেসি। সুখের সেই অশ্রুতে ভেসে গেল জমে থাকা হাজারো হতাশা। ব্রাজিলকে তাদেরই মাটিতে ১-০ গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শিরোপা জিততে না পারার ২৮ বছরের দীর্ঘ আক্ষেপ কাটল অবশেষে। দেশের হয়ে মর্যাদার শিরোপা না পাওয়ার আক্ষেপ মিটেছে কিংবদন্তি মেসিরও। আবেগী মেসি ম্যাচ শেষে সামনে যাঁকেই পাচ্ছিলেন, কোলে চড়ে বসছিলেন তাঁরই! ব্রাজিলের মাটিতে ব্রাজিলকে হারিয়ে শিরোপার হাহাকার ভোলার চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে। তাই মাঠ থেকেই ফোনে আনন্দ ভাগাভাগি করলেন পরিবারের সঙ্গে। মেসিকে কাঁধে চড়িয়ে শূন্যে ছুড়ে উল্লাসে মেতেছিলেন সতীর্থরাও। ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় প্রিয় সতীর্থটিকে একটা শিরোপা উপহার দিতে পেরে গর্বিত তাঁরা।

এর আগে চারটি ফাইনাল জিততে না পারার যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছেন মেসি। তাই দল যখন উত্সবে বিভোর তখনো ভোলেননি বন্ধু নেইমারকে। ব্যর্থতার গ্লানি মুছে দিতে উল্লাস থামিয়ে ছুটে আসেন নেইমারের কাছে। জড়িয়ে ধরেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাকে। কাঁদতে থাকেন দুজনই। সেই মুহূর্তে নিঃশব্দে যেন জিতে গেছে ফুটবল। মারাকানার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়তো এটাই। দেশজ বৈরিতার কাঁটাতার সমূলে উপড়ে তাঁদের বন্ধুত্বটা ফুটে ওঠে আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমেও। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সীমান্ত মাঝে থাকলেও দুজন আসলে একই পৃথিবীর। অসীম প্রত্যাশার পৃথিবী। মরণ চাপের পৃথিবী। সেই চাপে এবার ভেঙে পড়েছেন নেইমার। আর এত দিন রক্তশূন্য মুখে অন্যদের শিরোপা উদযাপন করতে দেখা মেসি এবার হাসলেন বিজয়ীর হাসি।

অথচ কোচ লিওনেল স্কালোনি জানিয়েছেন, সেমিফাইনালের মতো ফাইনালটাও মেসি খেলেছেন হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে! ইংলিশ কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকার তাই দেখছেন আরো একটি ব্যালন ডি’অর, ‘দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বারবার ব্যর্থতার পর অসাধারণ সাফল্য মেসি ও আর্জেন্টিনার। টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ ছিল মেসি, সেই সঙ্গে এখন ব্যালন ডি’অরের দাবিদারও।’ টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনে আয়োজকরা শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে। ফাইনাল শেষে ’৮৬ বিশ্বকাপজয়ী এই কিংবদন্তিকে টুইটারে স্মরণ করল তাঁর ক্লাব নাপোলি, ‘চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। খুশি ম্যারাডোনাও। তিনি সব সময় দলের সঙ্গেই থাকবেন।’

ব্রাজিলের কাছে আরো একবার মারাকানা হয়ে উঠল দুঃখের দোসর। ১৯৫০ বিশ্বকাপে ফাইনালে পরিণত হওয়া শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে শিরোপা হারায় তারা। গতকাল কোপার ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার সঙ্গে হারের বেদনাও পোড়াবে অনেক দিন। এর আগে কখনো নিজেদের মাটিতে হওয়া কোপার শিরোপা হাতছাড়া হয়নি ব্রাজিলের। সেই রেকর্ডটা কেড়ে নিল কিনা আর্জেন্টিনা।

মূল জাতীয় দল না হলেও ২০০৮ অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার হয়ে সোনা জিতেছিলেন মেসি। ফাইনালে নাইজেরিয়াকে ১-০ ব্যবধানে হারানো ম্যাচে একমাত্র গোলটা আনহেল দি মারিয়ার। সেই দি মারিয়ার গোলে আরেকটি স্বপ্নপূরণ মেসির। গতকাল ২২তম মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকে বাতাসে ভাসানো অসাধারণ এক থ্রু বাড়ান রদ্রিগো দি পল। রেনান লোদির সুযোগ ছিল সেটা ফেরানোর। তাঁর ভুলে বল পেয়ে যান ফাঁকায় থাকা দি মারিয়া। জাদুকরী প্রথম ছোঁয়ায় বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগুয়ান গোলরক্ষক এদেরসনের মাথার ওপর দিয়ে করা লবে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়া গোলটি তাঁর।

সেমিফাইনালের একাদশ নিয়েই খেলতে নেমেছিল ব্রাজিল। তবে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি দলে বদল এনেছিলেন পাঁচটি। তাতে দলে আসে সজীবতা। তবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচে লাতিন যে সৌন্দর্য-সুধার অপেক্ষায় থাকে বিশ্ব, সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি ম্যাচটি। এর পরও বদলি হয়ে নামা ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ৭৮ মিনিট পর্যন্ত মাঠে থেকে নিকোলাস ওতামেন্দির সঙ্গে দুর্গ গড়েছিলেন রক্ষণে। আনহেল দি মারিয়া কাজে লাগিয়েছেন তাঁর গতি। আর অসাধারণ কয়েকটি সেভ করা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের বিশ্বস্ত হাত আরেকবার বেদনায় পুড়তে দেয়নি  আর্জেন্টিনাকে।

মেসির পায়ে বল গেলেই তিনজন ঘিরে ধরেছেন তাঁকে। ব্রাজিলের এমন কৌশলের পাশাপাশি চোটের জন্যও নিজের চেনা ছন্দে ছিলেন না মেসি। আর্জেন্টাইনরা নেইমারের কার্যকারিতা থামিয়েছেন লুকাস পাকুয়েতার সঙ্গে সংযোগটা বিচ্ছিন্ন করে। কয়েকটি ড্রিবলিং আর দারুণ কিছু পাস দিলেও নেইমার পারেননি ম্যাচের ভাগ্য গড়তে। বিরতির আগে তেমন সুযোগ তৈরি করতে না পারা ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড রিচার্লিসনের ৪৩তম মিনিটে করা ক্রসে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি পাকুয়েতা। পরের মিনিটে নেইমারের কর্নার থেকে রিচার্লিসনের হেডে দূরের পোস্টে পা ছোঁয়াতে পারেননি কেউ।

বিরতির পর প্রতি-আক্রমণনির্ভর খেলছিল আর্জেন্টিনা। রবার্তো ফিরমিনো, গ্যাব্রিয়েল বারবোসা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়ররা নামার পর আক্রমণের ধার বাড়ে ব্রাজিলের। ৫২ মিনিটে একটা গোলও করেন রিচার্লিসন। অফসাইডের জন্য বাতিল হয় সেটা। দুই মিনিট পর এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে একা পেয়ে গিয়েছিলেন রিচার্লিসন। দুর্দান্ত সেভে সেই যাত্রায় আর্জেন্টিনাকে বাঁচান এই গোলরক্ষক। ৮৭ মিনিটে নেইমারের ফ্রিকিক থেকে বারবোসার বুলেট শট কর্নারের বিনিময়ে বাঁচান মার্তিনেজ। ৮৯ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। দি পলের দারুণ থ্রু ধরে গোলররক্ষক এদেরসনকে একা পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অন্য সময় ১০০ বারে ৯৯ বার যেটা গোল হতো, সেই সুযোগটাই মেসি নষ্ট করেন অপ্রত্যাশিতভাবে।

ব্রাজিলের বলের দখল ছিল ৫৯ শতাংশ, পোস্টে শট ১৩টি আর লক্ষ্যে দুটি। সেখানে আর্জেন্টিনা ৪১ শতাংশ বলের দখল নিয়ে পোস্টে শট নিয়েছিল ছয়টি, যার লক্ষ্যে ছিল দুটি। এর পরও শেষ হাসিটা মেসি আর আর্জেন্টিনারই। উরুগুয়ের সমান ১৫টি কোপা এখন আর্জেন্টিনার।

মেসির হাত ধরে আর্জেন্টিনা কোপার ফাইনাল খেলেছে চারটি আর বিশ্বকাপে একবার। সব মিলিয়ে ছয়টি কোপায় ৩৪ ম্যাচে দুই হাজার ৯০৭ মিনিট খেলে গোল করেছেন ১৩টি, যার চারটি এবার। আর চারটি বিশ্বকাপে ১৯ ম্যাচে এক হাজার ৬২৪ মিনিটে গোল ছয়টি। দুই টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ফাইনাল খেলেছেন পাঁচটি, শিরোপাখরা কাটল পঞ্চমটিতে এসে। মেসির চোখ নিশ্চয়ই এখন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। সেই শিরোপাটা জিতলে সর্বকালের সেরার প্রশ্নটার সমাধানও হয়ে যাবে হয়তো।



সাতদিনের সেরা