kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

ভুল শুধরে সাফল্যের খোঁজে বাংলাদেশ

সাইদুজ্জামান   

২৩ মে, ২০২১ ০২:৫৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভুল শুধরে সাফল্যের খোঁজে বাংলাদেশ

ড্রেসিংরুমের সামনে সেলফি তোলার হিড়িক, করোনাকালের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা বায়ো-বাবল তছনছ! নজরে পড়তেই অবশ্য বিসিবির প্রতিনিধি ডাগ আউট থেকে খেদিয়ে বের করে এনেছেন বিসিবির বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকদের। দেখে মনে হচ্ছিল এ তো বাংলাদেশ দলেরই অবস্থা। সিরিজপূর্ব যাবতীয় প্রস্তুতি-পরিকল্পনা ঠিকঠাক হয়, কিন্তু সেসবের বাস্তবায়নে মাঠে নেমে দেখা যায় বিস্তর ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। তাতে পরিকল্পিত ‘বায়ো-বাবল’ অসার প্রমাণ হয়। আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ওয়ানডের প্রথম ম্যাচে একই আশঙ্কার মেঘও উড়ছে বাংলাদেশ দলের আকাশে, প্রস্তুতি মাঠে মারা যাবে না তো!

অবশ্য আশঙ্কার আগে আছে আশা। তিন ম্যাচের এই সিরিজ জিতলে ওয়ানডে সুপার লিগের শীর্ষে উঠে যাবে বাংলাদেশ! যদিও এতে রোমাঞ্চিত হওয়ার কারণ নেই। ৯ ম্যাচে ৪০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে ইংল্যান্ড। আবার ৩ ম্যাচে শতভাগ সাফল্য পাওয়া নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ ৩০। বাংলাদেশের পয়েন্টও ৩০, তবে ৬ ম্যাচে। সোজা কথা, এই সিরিজে শীর্ষে উঠলেও ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণের এই সাপ-লুডু খেলায় অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি থাকবে তামিম ইকবালদের।

তবে খেলাটা ঘরের মাঠে। সব ফরম্যাট মিলিয়ে গত ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয়ের মুখ না দেখা বাংলাদেশের জন্য যা জিয়নকাঠি। ২০১৯ বিশ্বকাপের পর আকস্মিক পথ হারিয়ে ফেলা বাংলাদেশের যাবতীয় সাফল্য কিন্তু দেশের মাটিতেই, ওয়ানডেতে। করোনার আগে জিম্বাবুয়ে এবং সর্বশেষ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও হোয়াইটওয়াশ করেছে বাংলাদেশ। স্বভাবতই ঘরের মাঠে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত তারকাকে দেশে রেখে আসা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশা তামিমদের অনুসারীদের।

এই প্রত্যাশার কথা বাংলাদেশ দলের সবাই-ই জানেন। গত কয়েক দিনের দৌড়-ঝাঁপ দেখলে সেসব অনুসারীও আশ্বস্ত হতেন যে, অন্তত প্রস্তুতিতে ঘাটতি নেই। ব্যাটিং ঝালাইটা মনঃপূত হচ্ছে না দেখে নিজে আলাদাভাবে অনুশীলন করেছেন সাকিব আল হাসান। গতকাল শেষ সেশনে তিনজনকে দিয়ে থ্রো-ডাউন খেললেন তিনি। কিন্তু সেটা শেষ করে নিজের কিটব্যাগের ওপর ব্যাটটাকে যেভাবে ছুড়ে ফেলেন, তাতে বোঝা যায় নিজের ব্যাটিং নিয়ে খুশি নন সাকিব। তবে তিন নম্বরে যেহেতু খেলবেন, তাতে উইকেটে থিতু হওয়ার জন্য কিছুটা বাড়তি সময় তিনি পাবেন। গুছিয়ে নিতে পারলে এই সিরিজ দিয়েই প্রত্যাবর্তন ঘটতে পারে ‘ব্যাটসম্যান’ সাকিবের।

কিন্তু তামিম স্থিতি দেবেন, সাকিব সেটাকে টেনে নেওয়ার পর মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদ উল্লাহর কাঁধে চড়ে প্রতিপক্ষের মনে সমীহ জাগাবে বাংলাদেশের ইনিংস—পুরনো এই ফর্মুলার আর বাজার নেই। এই ফর্মুলা ফেল করায় ২০১৯ বিশ্বকাপে ভুগেছে বাংলাদেশ দল। সাকিব ছাড়া বড় ইনিংস নেই ‘বড়’দের কারোর। তাতেই চুরমার বাংলাদেশ। সঙ্গে দৃষ্টিকটূ ফিল্ডিং। সর্বশেষ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ক্ষত সম্ভবত এটাই। নিউজিল্যান্ড আর ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে একটি করে রান আউট আর ক্যাচ মিসের দীর্ঘশ্বাস এখনো কান পাতলে শোনা যায়। আশ্চর্যজনকভাবে, এর পর থেকে গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়েও অধঃপতন ঘটেছে বাংলাদেশ দলের। এমনিতে কখনোই বিশ্বসেরাদের কাতারে ছিল না বাংলাদেশের ফিল্ডিং। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের ভুলভালের সূচক আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বগামী। ক্যাচ পড়ে, প্রতি ম্যাচেই অলক্ষ্যে রানও গলিয়ে যায় ফিল্ডারের ভুলে।

এ সমস্যার সমাধানের খোঁজে ইদানীং ওয়ার্ম আপের পরই ফিল্ডিং অনুশীলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ দল। ব্যাটিং-বোলিং পরে। দলের মিডিয়া ম্যানেজারকেও একদিন দেখা গেছে মুশফিককে কিপিং প্র্যাকটিস করাতে! হ্যাঁ, উইকেটের পেছনে মুশফিকই দাঁড়াচ্ছেন। আপাতত এটাই কম ঝুঁকিপূর্ণ। আউটফিল্ডের চেয়ে উইকেটের পেছনেই তিনি অধিকতর আস্থাশীল। আফিফ হোসেন যদি একাদশে থাকেন, তবে ফিল্ডিংয়ে ক্ষিপ্রতাও বাড়বে। গতকালের প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা দেখে মনে হলো সাত নম্বরে সৌম্য সরকারের চেয়ে আফিফকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন টিম ম্যানেজমেন্ট। টপ অর্ডারে তামিম, লিটন দাস ও সাকিবের পর মুশফিক, মোহাম্মদ মিঠুন, মাহমুদ উল্লাহর পর আফিফ। ম্যাচের আগের শেষ প্রস্তুতি যদি একাদশের পূর্বাভাস হয়, তবে এ ম্যাচে নেই মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে তিন পেসার জুড়ে দিলে মুস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম—এই হলো বাংলাদেশের একাদশ। অবশ্য প্রচণ্ড গরমের কারণে উইকেটে স্পিন ধরতে পারে। মনে হয় না সাকিব ও মিরাজের সঙ্গে মাহমুদ বোলিং করতে প্রস্তুত থাকায় শরিফুলের জায়গায় শেখ মেহেদী হাসানকে খেলাবেন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো। গতকাল তাঁর কথাতেও সেরকমই ইঙ্গিত, ‘আগামীকালের (আজ) ম্যাচে তিন সিমার খেলানোর ভাবনা ভালমতোই আছে। সাকিব ফিরেছে, রিয়াদও (মাহমুদ) বোলিং করতে পারছে। তাতে আমাদের স্পিন বিকল্পও বাড়ছে।’

আবাহওয়া যদি ধারাবাহিক থাকে, তবে আজ দুপুর ১টায় টস হওয়ার সময় তাপমাত্রা ‘ফিলস লাইক’ ৪১ ডিগ্রি হওয়ার কথা। অন্তত গত দিন তিনেক ধরে এভাবেই ‘পুড়ছে’ মিরপুর। এতে সফরকারী দলের ছাই হওয়ার কথা। কিন্তু শ্রীলঙ্কার পেসার ইসুরু উদানার কাছে এই গরম কোনো ইস্যু নয়, ‘দেশে পাঁচ-ছয় দিন অনুশীলন করেছি। আমাদের ওখানে এর চেয়েও বেশি গরম ছিল। তাই এটাকে কোনো সমস্যা মনে করছি না।’ বরং চার মৌসুম ঢাকায় ক্রিকেট খেলা উদানার বাউন্সার আর স্লোয়ার নিয়ে বেশি চিন্তিত মনে হলো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের। নিয়মিত ব্যাটিং অনুশীলনের পর শেখ মেহেদী ছুড়ে ছুড়ে বাউন্সার খেলিয়েছেন তামিমকে। শরিফুলকে বারবার স্লোয়ার বাউন্সার দেওয়ার অনুরোধ করেছেন মুশফিক। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পেসারদের চেয়ে লঙ্কার স্পিন বৈচিত্র্য নিয়েও বিস্তর ভাবছেন তামিম-মুশফিকরা। অফস্পিনার, লেগস্পিনার, চায়নাম্যান—কী নেই সফরকারীদের বোলিং র‌্যাংকে!

লঙ্কানদের ভেতরের ঝাঁজও কম শক্তিধর নয়। এক দিন আগে উদানা তো বলেই রেখেছেন, ‘বাংলাদেশ দলে বেশ কজন তারকা ক্রিকেটার আছে। আমাদের দলটা তরুণ। তাই আমাদের হারানোর কিছু নেই। তবে আমরা এখানে জিততে এসেছি। নিজেদের সেরাটাই দেব।’ দলটির কোচ মিকি আর্থার ভবিষ্যতে চোখ রেখে যে দল নিয়ে এসেছেন, তাতে বাংলাদেশে ওলটপালট কিছু হলে জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে তাঁকে। এ অবস্থায় উতরে যাওয়ার একটা ‘টোটকা’ হিসেবে শিষ্যদের ভয়ডরহীন ক্রিকেটের দীক্ষা দিয়েছেন আর্থার। যত দূর মনে পড়ে, চাকরি নিয়েই মাশরাফি বিন মর্তুজাদের এ মন্ত্রই পড়িয়েছিলেন এক শ্রীলঙ্কান—চন্দিকা হাতুরাসিংহে।

বাংলাদেশ কোচের অবশ্য অত বিলাসিতার সুযোগ নেই। এমনিতেই আতশকাচের নিচে কাজ করছেন তিনি। খুব ভালো করে জানেন যে, এই সিরিজ হারলে নিজের ডোশিয়ারে আরো কিছু ডিমেরিট পয়েন্ট যোগ হবে। তাই কেন্দ্রীয় চুক্তি নিয়ে উত্তাল শ্রীলঙ্কার ড্রেসিংরুমের দিকেও সমীহের দৃষ্টিতে তাকাতে হচ্ছে ডমিঙ্গোকে, ‘আমার মনে হয় দুটো দলই সমান শক্তির। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঘরের মাঠের সুবিধা আছে। ঘরে আমরা সব সময়ই ফেভারিট হিসেবে শুরু করি। তাই বলে শ্রীলঙ্কাকে খাটো করে দেখা যাবে না। ওদের দলেও কয়েকজন খুব ভালোমানের ক্রিকেটার আছে, যারা নিজেদের প্রমাণ করতে চাইবে।’ 

বরং ডমিঙ্গোর চিন্তা নিজের দলকে ঘিরেই, ‘সাম্প্রতিক সময়টা ভালো যায়নি আমাদের। গত দুই মাসের ভুল থেকে আমাদের শিখতে হবে। পেছনে কী ঘটেছে, সেসব নিয়ে পড়ে থেকে লাভ নেই, সামনে তাকাতে হবে। আমরা যদি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারি, তবে জেতার সুযোগ আছে। ম্যাচের ফল সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।’

গতকাল যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি অনাহূতদের মাঠের ‘বায়ো-বাবলে’ প্রবেশ। সমস্যা হলো, ম্যাচে তো মাঠে নেমে ভুল শুধরে দেওয়া যাবে না!



সাতদিনের সেরা