kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

জীবনধারা বদলে এই তাসকিন

মাসুদ পারভেজ    

২৮ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:০১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবনধারা বদলে এই তাসকিন

সেই সময় তিনি শতভাগ ফিট ছিলেন বলে এখন দাবিও করেন না। তখনকার লাইফস্টাইলও একজন ফাস্ট বোলারের পক্ষে বেমানান ছিল বলে মানেন। নিজের যত্ন-আত্তি নেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘাটতি ছিল বেশ। সব কিছুর যোগফল তাঁর বোলিংয়েও ফেলেছিল ছাপ। টেস্ট ক্রিকেটে শুরুর ছন্দ নিজের ২০ কিংবা ২৫তম ওভারে গিয়ে তাই আর অটুটও থাকেনি। চলে যেতে হয় বিবেচনার বাইরে। একসময় ছিটকে পড়তে হয় সব ফরম্যাটের বাংলাদেশ দল থেকেও। আবার ফিরে আসার আগে বিরতিটাও হয় অনেক দীর্ঘ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিচ্ছিন্নতার সেই পর্ব শুরুর আগে খেলা নিজের সর্বশেষ টেস্টের দিকে ফিরে তাকিয়ে এখন কেবলই আরো ‘নিখুঁত’ হতে চাওয়া তাসকিন আহমেদ খুঁজে বের করলেন এত্ত এত্ত খুঁত!

সাড়ে তিন বছর আগে নিজের সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে। ২০১৭-র সেপ্টেম্বরে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৩০ ওভার বোলিং করেও কোনো উইকেট না পাওয়া পেসার অবশ্য এখন শুধু সামনেই তাকাচ্ছেন। পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টেস্টে বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে থাকা বাংলাদেশ দল ড্রয়ের স্বস্তি নিয়ে মাঠ ছাড়ার পরদিন সন্ধ্যায় ক্যান্ডি থেকে টেলিফোনে তাসকিনের কণ্ঠে ফুটে উঠল প্রবল আত্মবিশ্বাসী এক ফাস্ট বোলারই, ‘টেস্ট ক্রিকেটে বেসিক ব্যাপারটি বাস্তবায়ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ। অনেক লম্বা সময় বোলিং করতে হয়। প্রথম ওভার ও ২৫তম ওভারটি একইভাবে করতে পারাটাই চ্যালেঞ্জ। এটি নিয়েই কাজ করছি। ফিটনেস ও স্কিল আরো বাড়ানোর চেষ্টায় আছি। আগের থেকে অবশ্যই উন্নতি হয়েছে। আশা করি, ভবিষ্যতে আরো হবে।’

এই কথা বলার সময়টি তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের পুনর্জন্মের সবে শুরু। মাঝখানে সাড়ে তিন বছরের বিরতি পার করে ক্যান্ডিতে খেলেছেন নিজের জীবনের মাত্র ষষ্ঠ টেস্ট। তাও আবার এমন প্রাণহীন ও রুক্ষ-শুষ্ক উইকেটে, যেখানে পেস বোলাররা প্রাণপাত করে মরেছেন রীতিমতো। সেই উইকেটেই তাসকিনের জন্য জুটেছে দারুণ বোলিংয়ের প্রশংসাপত্রও। ৩০ ওভার বোলিং করে বুঝিয়েছেন একসময় পথহারা নিজেকে পেছনেও ফেলে আসতে পেরেছেন, ‘রান আটকানো কঠিন ছিল পাল্লেকেলেতে। সেখানে আমি আমার সর্বোচ্চটি দিয়ে বোলিং করেছি। বেসিকেই বেশি মনোযোগী ছিলাম। গুড লেন্থে বল ফেলেছি। বাউন্সারও দিয়েছি সেরকম, যেরকমটি দিতে হয়। নতুন বলে সুইং করানোর চেষ্টাও করেছি।’

পচেফস্ট্রুম আর ক্যান্ডির তাসকিনের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরতে গিয়ে নিজেকে বদলানোর কথাই বললেন সবার আগে, ‘আমি আসলে আমার লাইফস্টাইল বদলে ফেলেছি। এখন ভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করছি। একজন সত্যিকারের ফাস্ট বোলার যা করে, সেগুলোই করছি। জানি না কতটুকু সঠিক হচ্ছে, কিন্তু করছি। এখনো উন্নতির পথেই আছি। এভাবে চলতে থাকলে আরো উন্নতি হবে।’ বাদ পড়ার পর নিজের মধ্যে এই বোধ আসতেও অবশ্য সময় লেগেছে কয়েক বছর। নির্দিষ্ট করে বললে, ২০২০ সালের শুরুর দিকে। টেস্ট খেলতে বাংলাদেশ দল যখন পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে, তখন ওমরাহ করতে তাসকিন পবিত্র মক্কায়। সেখান থেকেই ঘনিষ্ঠ এক কোচকে ফোন করে বলেছিলেন, সত্যিকারের ফাস্ট বোলার হওয়ার জন্য নিজেকে নিংড়ে দিতে চান। দেশে ফিরে শুরু হয় লড়াই। লকডাউনের সময়ও বন্ধ থাকেনি তা। ব্যক্তিগত ট্রেনার তো ছিলই, মাইন্ড ট্রেনারেরও শরণাপন্ন হয়েছিলেন। নেতিবাচক অনেক কিছু মন থেকে তাড়ানোয় শুরু করেন নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইও। সেই লড়াইয়ে বিজয়ী তাসকিন নিজের অতীত দোষ-ত্রুটিও উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাই এখনো চলমান লড়াইয়ে অন্য কেউ নয়, নিজেকেই দাঁড় করান নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে, ‘আমার প্রতিযোগিতা একমাত্র আমার নিজের সঙ্গেই।’ সেই প্রতিযোগিতায় জিতেই যেতে চান শুধু, ‘১৫০ কিলোমিটার গতি তোলা অবশ্যই আমার লক্ষ্য। সে জন্য ফিটনেসে উন্নতির প্রক্রিয়াও চলছে। এভাবে চলতে থাকলে অবশ্যই একসময় হয়ে যাবে। তবে শুধু ১৫০ নিয়ে যে চিন্তা করছি, তা নয়। আসলে ধারাবাহিকভাবে ১৪০ গতিতে ভালো লেন্থে বৈচিত্র্যসহ বোলিং করাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে জরুরি। কারণ শুধু জোরে বোলিং করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকাই মুশকিল।’ টিকে থাকতে গেলে একে একে সব খুঁতও দূর হতে হতো, যার প্রতিটিই ছিল পচেফস্ট্রুমের সেই টেস্টে। ক্যান্ডির প্রাণহীন উইকেটেও তাসকিনের প্রাণোচ্ছল বোলিং বুঝিয়েছে, সেই সময়টি সত্যিই পেছনে ফেলতে পেরেছেন।



সাতদিনের সেরা