kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

সুপার লিগ থেকে সরে দাঁড়াল সবগুলো ইংলিশ ক্লাব

অনলাইন ডেস্ক   

২১ এপ্রিল, ২০২১ ১০:০৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সুপার লিগ থেকে সরে দাঁড়াল সবগুলো ইংলিশ ক্লাব

ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছিল ১৮ এপ্রিল। শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে তিনটি লিগের ১২টি ক্লাব মিলে 'ইউরোপিয়ান সুপার লিগ' নামে নতুন এক প্রতিযোগিতা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই সুপার লিগে ইউরোপের মোট ২০টি ক্লাবের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ক্লাব ১৫টি (১২টির নাম প্রকাশ করা হয়েছে)। বাকি পাঁচটি দলকে আগের মৌসুমের পারফরমেন্স বিচারে কোয়ালিফাই খেলে সুপার লিগে আসতে হবে।

তবে বিতর্কিত প্রতিযোগিতাটি শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার দুই দিনের মাথাতেই তা ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা জোরাল হয়েছে। একে একে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ছয়টি ক্লাবই সুপার লিগ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ম্যানচেস্টার সিটি প্রথম ক্লাব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের খাতা থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে ফেলার উদ্যাগ নেয়। এই ক্লাবটিকে অনুসরণ করে চেলসিও কাগজপত্র প্রস্তুত করে এই নতুন লিগ থেকে নাম সরিয়ে নেওয়ার। এরপর একে একে আর্সেনাল, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, টটেনহ্যাম হটস্পারও ইউরোপিয়ান সুপার লিগ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়।

প্রবল সমালোচনার মুখে পড়া এই টুর্নামেন্টের বাকি ছয় দল হলো স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ এবং ইতালির জুভেন্টাস, ইন্টার মিলান ও এসি মিলান।

চলমান ঘরানার ফুটবল কাঠামো থেকে অর্থের দাপটের টুর্নামেন্ট শুরুর ঘোষণার পরপরই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে 'বিদ্রোহী' প্রতিযোগিতাটি। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (উয়েফা্), বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্থা ও ঘরোয়া লিগ কর্তৃপক্ষ ঐক্যবদ্ধভাবে নানারকম নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া শুরু করে। ক্লাবগুলোর সমর্থকরাও বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

ম্যানচেস্টার সিটি নিশ্চিত করেছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা সুপার লিগ থেকে সরে এসেছে। লিভারপুল বিবৃতিতে জানিয়েছে সুপার লিগের সাথে তাদের যাত্রা এ পর্যন্তই।

আর্সেনাল একটি খোলা চিঠি লিখেছে ভক্তদের উদ্দেশে, যেখানে তারা বলেছে একটি ভুল হয়ে গেছে তাদের এবং বৃহত্তর ফুটবল কমিউনিটির কথা শুনেই তারা নাম সরিয়েছে সুপার লিগ থেকে।

টটেনহ্যাম হটস্পারের চেয়ারম্যান ডেনিয়েল লেভি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, এই প্রস্তাবের ফলে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা ক্লাবের জন্য হতাশাজনক।

ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউয়েফার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার কেফেরিন সবগুলো ক্লাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, 'ইউরোপিয়ান ফুটবলকে এখনো অনেক দেওয়ার আছে এই ক্লাবগুলোর। এখন আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা'।

ফুটবল ভক্তরা, ফুটবল সংশ্লিষ্টরা, যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা পর্যন্ত এই সুপার লিগের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। ব্রাইটনের বিপক্ষে চেলসির ম্যাচের আগে কমপক্ষে এক হাজার ভক্ত জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করে। চেলসির কিংবদন্তি গোলরক্ষক পিতর চেক নিজে এসে ভক্তদের বোঝান যাতে তারা সরে যায়।

এদিকে এই ঘটনার পর ম্যানচেস্টার ইউনাইডের নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান এড উডওয়ার্ড ২০২১ সালের শেষে নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে এই ঘটনায় বেশ কয়েকটি ক্লাবের কোচ ও শীর্ষ ফুটবলাররা নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। লিভারপুল কোচ ইয়র্গুন ক্লপ সরাসরি বলেছেন, এই সুপার লিগ ফুটবলের জন্যই হতাশাজনক, ক্লাবটির অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন লিখেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যে সমষ্ঠিগতভাবেই লিভারপুলের ফুটবলাররা চান না যে সুপার লিগ হোক।

ম্যানচেস্টার সিটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার পরে ক্লাবটির ফুটবলার রাহিম স্টারলিং, "ওকে বাই" লিখে একটি টুইট করেন।

রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ও সুপার লিগের চেয়ারম্যান ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ গতকাল বলেন, 'ফুটবল বাঁচাতেই নিয়ে আসা হয়েছে এই সুপার লিগ।'

তবে ইংলিশ ক্লাবগুলো সরে দাঁড়ানোর পরে স্প্যানিশ বা ইতালিয়ান ক্লাবগুলো কোন বিবৃতি দেয়নি।

কি আছে এই সুপার লিগে?
এই লিগে থাকবে ২০টি দল। ১২টি ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং আরো তিনটি ক্লাব নাম দিতে যাচ্ছে এখানে। আরো পাঁচটি ক্লাব এখানে খেলবে ঘরোয়া ফুটবলে সাফল্যের ভিত্তিতে। প্রতি বছরই আগস্টে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ শুরু হবে সপ্তাহের মাঝে খেলাগুলো হবে। ১০ টি দল করে দুই ভাগে ভাগ হয়ে ঘরের মাঠ ও প্রতিপক্ষের মাঠে খেলবে।

সেরা তিনটি করে দল কেয়ার্টার ফাইনালে সরাসরি যাবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম ক্লাবটি নিজেদের মধ্যে প্লে অফ খেলবে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো করে দুই লেগের নকআউট পর্ব শেষে প্রতি বছর মে মাসে একটি নিরপেক্ষ স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলা হবে।

ইএসএল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের চেয়ে বেশি অর্থ জোগান দেবে বলে আশাবাদি ক্লাবগুলো।

কেন সুপার লিগ নিয়ে এত আপত্তি?
সুপার লিগের ঘোষণা আসার সাথে সাথে এটি ফুটবলের বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার তুমুল সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রিমিয়ার লিগের ছয়টি বড় ক্লাব এই সুপার লিগের অংশ, সেই প্রিমিয়ার লিগ বলেছে, এই সুপার লিগ যেকোনো ভক্তের কাছে স্বপ্নভঙ্গের মতো। যে প্রক্রিয়ায় একটি ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে প্রিমিয়ার লিগে উঠে আসে এবং সেরা ক্লাবগুলোর সাথে খেলে সেই প্রক্রিয়া এবং কাঠামোই ভেঙ্গে দেবে এই সুপার লিগ।

বুন্দেসলিগা অর্থাৎ জার্মান লিগে কোনো ক্লাব চাইলেই নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কারণ জার্মান ফুটবল মডেল অনুযায়ী অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ক্লাবের ৪৯ শতাংশ মালিকানা রাখতে পারবে। যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ভক্তদের ভোটের প্রয়োজন হয় জার্মানিতে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল এই পরিকল্পনার ওপর 'পুরোপুরি বীতশ্রদ্ধ' ছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি ৪০ বছর ধরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ভক্ত এবং আমি এটা নিয়ে প্রচণ্ড নাখোশ'। নেভিল এই ক্লাবগুলোর মালিকদের 'বেইমান' বলে অভিহিত করে বলেন, 'এটা কেবলই লোভ'।

এই সুপার লিগ ক্লাবগুলোর যে সমর্থকগোষ্ঠী তারাও সুপার লিগের বিপক্ষেই মত দিয়েছেন। লিভারপুল, চেলসি, আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, টটেন্যাম- সবগুলো ক্লাবের ভক্তরাই আপত্তি জানিয়েছে এই পরিকল্পনার। এটাকে 'ঘোরতর বেইমানি' বলছেন তারা।



সাতদিনের সেরা