kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

দুই আর্চারের স্বপ্নভঙ্গ

রাহেনুর ইসলাম   

৩ মার্চ, ২০২১ ০২:৪৪ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দুই আর্চারের স্বপ্নভঙ্গ

শ্যামলী রায় তখন হোটেলে ঘুমিয়ে। আর আবুল কাশেম মামুন পায়চারি করছিলেন কক্সবাজারের শেখ কামাল আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের বাইরে। জাতীয় আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে তখন চলছিল দুজনের প্রিয় ইভেন্ট কম্পাউন্ড। অথচ শিরোপাপ্রত্যাশী হয়েও সেখানে অংশ নেওয়ার ছাড়পত্র ছিল না দেশের অন্যতম সেরা এই দুই আর্চারের। বাংলাদেশ পুলিশ নিজেদের খেলোয়াড় তালিকায় জমা দিয়েছে দুজনের নাম। কিন্তু আনসার নিজেদের খেলোয়াড় দাবি করে ছাড়পত্র দিতে রাজি নয় তাঁদের! তাই আর্চারি ফেডারেশন কোনো দলের হয়েই খেলার অনুমতি দেয়নি তাঁদের। এ নিয়ে মামুন ও শ্যামলী যেমন ক্ষুব্ধ, তেমনি ফুঁসছেন জাতীয় দলে তাঁদের সতীর্থরাও।

২০১৬ রিও অলিম্পিকে বাংলাদেশের একমাত্র আর্চার হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন শ্যামলী রায়। কম্পাউন্ডে দুইবারের এই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন সোনা জিতেছিলেন ২০১৯ এসএ গেমসের দলীয় কম্পাউন্ডেও। আর ২০১৭ সালের এশিয়ান আর্চারিতে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন আবুল কাশেম মামুন। আনসারের সঙ্গে চুক্তিভুক্ত এই দুই আর্চারকে পাকাপাকি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কর্তারা। কিন্তু সেটি আর হয়নি। গত বছর করোনার সময়ে বাংলাদেশ পুলিশ থেকে চাকরির প্রস্তাব পেয়ে আনসার থেকে পদত্যাগের চিঠি দেন শ্যামলী ও মামুন। তবে তাঁদের সামনেই ছিঁড়ে ফেলা হয় সেই আবেদনপত্র।

তার পরও ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে পুলিশে যোগ দেন শ্যামলী ও মামুন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তখন থেকে আনসার ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে তাঁদের। প্রায় এক বছর নিয়মিত বেতন দিয়েও এবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁদের খেলাতে না পেরে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হকের ক্ষোভ, ‘করোনার সময় চুলোয় হাঁড়ি জ্বলছিল না আর্চারদের। কঠিন সেই সময়ে নিয়মিত বিকাশে ভাতা পাঠিয়েছি শ্যামলী-মামুনসহ ২৫ জন আর্চারকে। নড়াইলে রেখে অনুশীলন করিয়েছি। তখন কোথায় ছিল আনসার? এখন হুট করে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে দুজনকে নিজেদের খেলোয়াড় দাবি করে বসলে কিভাবে হবে?’

দুজনকে নিজেদের খেলোয়াড় দাবি করে আনসারের সহকারী পরিচালক (ক্রীড়া ও সংস্কৃতি) রায়হান ফকিরের যুক্তি, ‘আমাদের সঙ্গে ওদের যে চুক্তি আছে সেখানে স্পষ্ট করে লেখা, দুটি বাংলাদেশ গেমস না খেলা পর্যন্ত তারা আনসার ছাড়তে পারবে না।’ আনসারের এমন দাবি হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিলেন মোজাম্মেল হক, ‘বাংলাদেশ গেমস তো ১০ বছরে একটা করে হয়! তা ছাড়া চুক্তি হতে হবে দ্বিপক্ষীয়। ওরা যখন স্বাক্ষর করেছিল তখন বয়স কম ছিল। এত ধারা-উপধারা মাথাতেই ছিল না কারো।’

জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার সম্ভাবনা কম বুঝতে পেরে, কোনো দলের বদলে আর্চারি ফেডারেশনের হয়ে খেলার আবেদন জানান শ্যামলী ও মামুন। পাশের দেশ ভারতে এভাবে আর্চারদের খেলার উদাহরণ আছে। তবে সেই আবেদনে সাড়া না দেওয়ার কারণ হিসেবে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজিব উদ্দিন চপল জানালেন, ‘আনসার ওদের ছাড়পত্র দেয়নি। আমরা পুলিশ ও আনসারকে নিয়ে ব্যাপারটা সমাধানের জন্য বসেছিলাম। দুজন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে পুলিশ আর বাংলাদেশ গেমসে আনসারের হয়ে খেলুক—এমন প্রস্তাবও দিয়েছি, কিন্তু কেউ মানেনি।’

দুই দলের টানাটানির জাঁতাকলে পিষ্ট হলো দেশসেরা দুই আর্চারের স্বপ্ন। মামুনের দীর্ঘশ্বাস, ‘কক্সবাজারে এসে নিজেকে উদ্বাস্তু মনে হচ্ছে। পুলিশে আমাদের স্থায়ী চাকরি হওয়ার কথা, এখন সেটাও অনিশ্চিত।’ হতাশ শ্যামলীও, ‘জাতীয় দলের সতীর্থরাও মানতে পারছে না আমাদের খেলতে না পারাটা। এখন মনে হচ্ছে বাংলাদেশ গেমসেও হয়তো খেলতে পারব না।’ দুই আর্চারের জীবনের গতিপথ অনিশ্চিত করে তোলার দায়টা নেবে কে?



সাতদিনের সেরা