kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

বাংলাদেশের ফুটবল বন্ধু হতে চাই : ইউসুকে কাতো

রাহেনুর ইসলাম   

১২ জানুয়ারি, ২০২১ ২০:৪০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশের ফুটবল বন্ধু হতে চাই : ইউসুকে কাতো

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের অর্থসংকট চরমে পৌঁছেছিল। ক্যাসিনো কান্ডে ক্লাবে তালা পড়ায় বন্ধ হয়ে যায় আয়ের পথ। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে যখন দেশ, তখনই অনিশ্চিত হয়ে যায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের নামে গড়া ক্লাবটির ফেডারেশন কাপ ও লিগে অংশ নেয়া। ক্লাবের সংকটে বিদেশি হয়েও এগিয়ে আসেন অধিনায়ক ইউসুকে কাতো। তাঁর প্রচেষ্টায় ফেডারেশন কাপের পর মঙ্গলবার লিগের জন্যও টাইটেল স্পনসর পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধা। এক কোটি টাকার চুক্তি করেছে ‘হিসাব’। বাংলাদেশের কোনো ফুটবল ক্লাবের জন্য একজন বিদেশির এভাবে এগিয়ে আসাটা বিরল ব্যাপার। চুক্তি স্বাক্ষরের পর রাহেনুর ইসলামকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্লাব নিয়ে নিজের উদ্যোগ আর বাংলাদেশ ফুটবলে অবদান রাখতে চাওয়ার কথা জানালেন জাপানি এই ফুটবলার।

প্রশ্ন : আদর্শ অধিনায়কের মতোই নেতৃত্ব দিলেন সামনে থেকে। সংগঠকদের কাজটা করলেন অধিনায়ক হয়ে।

ইউসুকে কাতো : এটা আমার দায়িত্ব ছিল। দল অর্থ সংকটে পড়েছে আর আমি অধিনায়ক হয়ে হাত গুটিয়ে থাকব- কোনোভাবে হতে পারে না। খুব ভালো লাগছে পৃষ্ঠপোষক হয়ে ‘হিসাব’ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র পরিবারে যুক্ত হওয়ায়। এতে সামান্য অবদান রাখতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি আমি। ধন্যবাদ জানাচ্ছি আপনাকেও।

প্রশ্ন : আমাকে কেন?

কাতো : নানা কারণে সংকটে পড়েছিল আমাদের ক্লাব। ক্যাম্প চালানোর টাকাও ছিল না এক সময়। বাংলাদেশের অনেক পত্রিকা, অনলাইন আর টেলিভিশনে রিপোর্ট হচ্ছিল এ নিয়ে। সে সময় ক্লাব উপদেষ্টা আর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেয়া আপনার সাক্ষাৎকারটা দলের ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম দেখিয়েছিল আমাকে। আমি বাংলা জানি না। আরিফই বুঝিয়ে বলেছিল,‘ মন্ত্রী ক্লাবের সংকট কাটাতে পৃষ্ঠপোষক খোঁজার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় দৈনিক কালের কণ্ঠে দেয়া সাক্ষাৎকারে’। তখনই বুঝতে পারি এটা সরকারি ক্লাব না, অন্যদের মত পৃষ্ঠপোষক দরকার মুক্তিযোদ্ধারও।

প্রশ্ন : ক্লাব নিয়ে শতভাগ না জেনেই পৃষ্ঠপোষক খুঁজতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ফেললেন?

কাতো : হা, হা, হা। আমি খুব বেশি গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। কারণ জানি, এই ক্লাব মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে গড়া হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশ স্বাধীন হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে। তাঁদের হৃদয় থেকে শ্রদ্ধা করি। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে গড়া এই ক্লাবকে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে দেখে খারাপ লেগেছে। আপনার রিপোর্টের মাধ্যমে যখন প্রথমবার জানলাম, মন্ত্রী পৃষ্ঠপোষক খোঁজার কথা বলেছেন- তখনই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই। আবেদন জানাই ক্লাবটিকে সাহায্য করার। মুক্তিযোদ্ধারা চিরদিন বেঁচে থাকবেন না। কিন্তু এই ক্লাব তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখবে। সাতটা দেশের লিগে খেলেছি, কোথাও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নামে গড়া ক্লাব দেখিনি। 

প্রশ্ন : আপনার জাপানি ভাষায় স্ট্যাটাস তো এই দেশের কারও বোঝার কথা না। তাহলে কি জাপানি কোনো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে ধরে নিয়েই সাহায্যের আবেদন করেছিলেন?

কাতো : বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী জাপান, এটা আমি জানি। কুতুবদিয়ার মাতারবাড়ীতে বাংলাদেশের যে প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে উঠছে সেখানে জাপানের অর্থায়ন আছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি আমাকে বলেছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মাতারবাড়ী হবে দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর। তিনিই জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বিশেষ অর্থনেতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে জাপান। অন্তত ১০০ জাপানি কম্পানির বিনিয়োগ থাকবে সেখানে। আমিও বাংলাদেশের ফুটবলবন্ধু হতে চাই। এই আশায় আমি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। সেটা চোখে পড়ে, এ উইং তাগুচি কম্পানি লিমিটেডের (এটিসি) কোনো কর্মকর্তার। এরপর ওরা ফেডারেশন কাপের জন্য আমাদের ১০ হাজার ডলার দিয়েছিল।

প্রশ্ন : ফেডারেশন কাপ শেষে চ্যালেঞ্জটা আরো বড় ছিল। কারণ পুরো মৌসুমের জন্য একটা ক্লাবের কয়েক কোটি টাকা দরকার হয়।

কাতো : অন্তত তিন-চার কোটি টাকা দরকার মৌসুম শেষ করতে। ফেডারেশন কাপ শেষে তাই আরো একবার উদ্যোগী হই। কথা হয় রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকির সঙ্গে। তিনি সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জানতে পারি জাপানের টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কম্পানির সঙ্গে এদেশে সহযোগী হিসাবে কাজ করছে ‘হিসাব’। যোগাযোগ করি ওদের সঙ্গে। এক কোটি টাকায় ওরা আমাদের টাইটেল স্পনসর হতে রাজি হওয়ায় আমি সম্মানিতবোধ করছি। 

প্রশ্ন : মুক্তিযোদ্ধার ৩৫ ফুটবলারের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বেতন বকেয়া ছিল। মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন সবাই।

কাতো : আমাদের মিডফিল্ডার মোহাম্মদ সোহেলের বাবা চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু টাকার অভাবে অস্ত্রোপচার করাতে পারছিলেন না। ক্লাবও পরছিল না সোহেলকে টাকা দিতে। এরকম আরো কয়েকজন খুব কষ্ট করেছেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বেতনের অনেকটা পরিশোধ করা হয়েছে। বাকিটাও হয়ে যাবে। এখন আমরা সব ভুলে খেলায় মনযোগ দিতে চাই। দরকার সমর্থনও। সমর্থকরা যদি মাঠে আর মাঠের বাইরে আমাদের সাহায্য করে, তাহলে এগিয়ে যেতে পারব।

প্রশ্ন : করোনার জন্য ক্রিকেট হচ্ছে জৈব সুরক্ষা বলয়ে। একই হোটেলে রাখা হয়েছে বাংলাদেশ, ওয়েস্টইন্ডিজের সব খেলোয়াড় আর অন্য স্টাফদের। কিন্তু ফুটবলে এসবের বালাই নেই। এভাবে খেলা কি অনিরাপদ নয়?

কাতো : করোনার মত রোগের জন্য জৈব সুরক্ষা বলয় অবশ্যই দরকার। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ফুটবলে সেটা সম্ভব নয়। ক্লাব যেখানে বেতন দিতে পারছে না, সেখানে জৈব সুরক্ষা বলয় কেউ আশা করে না। তবে বাফুফে থেকে প্রতি ১৫ দিন পর সব খেলোয়াড়ের করোনা পরীক্ষার ফল জমা দিতে বলা হয়েছে। এটা মন্দের ভালো।

প্রশ্ন : আপনি আর মোহামেডানের জাপানি ফুটবলার উরিয়ু নাগাতা মিলে অনলাইন ফুটবল কর্মশালা চালু করেছেন। সাড়া পাচ্ছেন কেমন?

কাতো : জাপানি দূতাবাসের সহায়তায় এটা করছি আমরা দুজন। জাপানে আমরা কোনো টেকনিকে ফুটবল খেলি, কিভাবে ফিটনেস ধরে রাখি-এসবই তুলে ধরেছি কয়েকটি ভিডিওতে। যথেষ্ট সাড়া পেয়েছি আমরা। শিশু-কিশোররা এই জিনিসগুলো মেনে খেললে উন্নত একটা প্রজন্ম পাবে বাংলাদেশ।

প্রশ্ন : আপনার শুরুটা আর্জেন্টিনায়। এরপর জাপান, থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, হংকং আর মঙ্গোলিয়ার শীর্ষ লিগে খেলেছেন। বাংলাদেশে এলেন কিভাবে?

কাতো : হাইস্কুল শেষ করেই আর্জেন্টিনায় চলে গিয়েছিলাম। বুয়েন্স আইরেসে খেলেছি হুরাকানের যুব দলে। একই দলের হয়ে খেলেছি প্রিমেরা ডিভিশনে। ২০১১ সালে আসি জন্মভূমি জাপানের বিয়াকো শিগা ক্লাবে। ২০১২ সালে ভারতের ডেম্পো স্পোর্টসে। সেই বছরই যাই থাইল্যান্ডে। এরপর খেলেছি হংকং, মঙ্গোলিয়া আর ইন্দোনেশিয়ার লিগে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে আসি আমার এক জাপানি বন্ধুর মাধ্যমে। অনেক ক্লাবে ট্রায়াল দেয়ার সুযোগ ছিল। মুক্তিযোদ্ধা নামটা শুনে আবেগী হয়ে যাই। ওদের ওখানেই প্রথম ট্রায়াল দেই, টিকেও যাই। প্রথম মৌসুমে ২১ ম্যাচে ৮ গোল করেছিলাম। পরের মৌসুমে খেললাম শেখ জামালে। এবার আবারও ফিরে এসেছি পুরনো দলে। ওরা অধিনায়কত্বের সম্মান দিয়েছে আমাকে। আরো অনেক জাপানি খেলোয়াড় ট্রায়াল দিতে চায় বাংলাদেশে। ওরা যোগাযোগ রেখেছে আমার সঙ্গে। ভ্যাকসিন এসে গেলে অন্তত দশজনকে আনতে চাই ট্রায়ালের জন্য। 

প্রশ্ন : আমরাও অপেক্ষায় রইলাম।

কাতো : আমার মনে হয় আফ্রিকানদের চেয়ে বাংলাদেশের ফুটবল বেশি লাভবান হবে, বিদেশি কোটায় জাপানিরা খেললে। বাংলাদেশের ফুটবল বন্ধু হয়ে সাহায্য করতে পারলে খুশিই হব আমি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা