kalerkantho

সোমবার । ১১ মাঘ ১৪২৭। ২৫ জানুয়ারি ২০২১। ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সবার চোখে আজ জল : তসলিমা

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ১৫:১৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সবার চোখে আজ জল : তসলিমা

কী অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা ম্যারাদোনার! সেই যে রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে হাজার হাজার মানুষ সকাল থেকে যাওয়া শুরু করেছে তাঁকে এক পলক দেখবে বলে, শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করবে বলে, এখনও যাচ্ছে। জাতীয় পতাকায় আর তাঁর ১০ নম্বর জার্সি দিয়ে ঢাকা কফিনের সামনে কেউ হাত ওপরে উঠিয়ে মুষ্ঠিবদ্ধ করছে, কেউ বুকের বাঁদিকে চাপড় দিচ্ছে, কেউ আলিঙ্গনের দু'হাত বাড়াচ্ছে, কেউ মাথায় দু'হাত রেখে মুষড়ে পড়ছে, কেউ হাত তালি দিচ্ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ কাঁদতে কাঁদতে নুয়ে পড়ছে, কেউ চুমু ছুঁড়ে দিচ্ছে, কেউ জার্সি ছুঁড়ে দিচ্ছে, কেউ গোলাপ, কেউ প্রিয় খেলোয়াড়কে নিয়ে তৈরি করা ব্যানার। শোকে মূহ্যমান লাতিনো জনতা।

৬০ কোনও বয়স নয় মৃত্যুর জন্য। ম্যারাদোনার বাবা মা-ই ৮০র ওপরে বেঁচেছিলেন। তিনিও বাঁচতে পারতেন আরও দু'দশক। কিন্ত ‘ঈশ্বরের হাত’ তাঁকে উঠিয়ে নিল। শেষ দিকে এত অসুখ, এত হাসপাতাল, এত কাটাছেঁড়া! এক সময় তো মানসিক হাসপাতালেও যেতে হচ্ছিল। ভীষণ হচ্ছিল মাদক ছাড়ার প্রতিক্রিয়া। সেই আশির দশকের শুরু থেকেই কোকেন সেবন করেন। নেশাই তাঁকে থেকে থেকে খাচ্ছিল।

ম্যারাদোনার কী ভালো লাগে আমার? তাঁর আবেগ, তাঁর রসবোধ। নিজে তিনি ধার্মিক। কিন্তু ভাটিক্যানে গিয়ে যেদিন দেখলেন সোনায় মোড়ানো ছাদ, পোপকে বলেছিলেন গরিবকে সাহায্য করার জন্য যে এত বলো, তা তোমাদের এই সোনার ছাদটা তো বিক্রি করে দিতে পারো!

ছিয়াশি সালে হাত দিয়ে যে গোলটি ম্যারাদোনা করেছিলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে গিয়ে, তিউনেশিয়ার রেফারি ভালো দেখতে পাননি বলে গোল বলে রায় দিয়েছিলেন, লাইন্সম্যানও গোলই বলেছেন, অবশ্য পরে মেক্সিকোর এক ফটোগ্রাফারের ফটোই প্রমাণ করে গোলটি হাতে দেওয়া। কিন্তু যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা ২ঃ১ গোলে জিতে গেছে। যদি ওই খেলাটি আজ হতো, ম্যারাদোনা হলুদ কার্ড পেতেন, গোল নয়। তারপরও আমার মনে হয় কোয়ার্টার ফাইনালের ওই খেলাটিতে কোনও হাতে দেওয়া গোল না থাকলেও আর্জেন্টিনা সে-বছর ফাইনালে খেলতো, বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাই পেতো। ম্যারাদোনার জন্যই পেতো। গোলটি যে নির্ভেজাল নয় তা ম্যারাদোনা অস্বীকার করেননি । বলেছেন, গোল হয়েছে, কিছুটা তাঁর মাথায় লেগে, কিছুটা ঈশ্বরের হাতে লেগে। বেশ কয়েক বছর পর অবশ্য বলেছেন নিজের হাতেই সেদিন গোলটি করেছিলেন। ইংল্যান্ড-দলের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন, যদি সম্ভব হতো তাহলে নাকি পেছনে ফিরে গিয়ে রেফারির ভুলটা শুধরে দিতেন, কিন্তু পেছনে ফেরার তো কোনও উপায় নেই।

ম্যারাদোনা স্বীকার করার আগেই বিশ্ব জানে ম্যারাদোনা বর্ণিত ঈশ্বরের হাত আসলে কার হাত। বিশ্ব ক্ষমা করে দিয়েছে ম্যারাদোনাকে। বিশ্ব ক্ষমা করে দিয়েছে ম্যারাদোনার কোকেন সেবন। ক্ষমা করে দিয়েছে চুরানব্বইয়ে ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়া, বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া, ক্ষমা করে দিয়েছে ২০১০এর বিশ্ব কাপে ভালো কোচ হতে না পারা। ক্ষমা করে দিয়েছে তাঁর অনুদার আচরণ, মেসি তাঁকে গুরু মানলেও তিনি যে বলেছেন মেসির কোনও ব্যক্তিত্ব নেই।

আজ ম্যারাদোনার সব ভুল ত্রুটি ভুলে গেছে সবাই, শুধু মনে রেখেছে পায়ে বল নিয়ে তীরের মতো ছুটে চলেছে মাঠের এ মাথা থেকে ও মাথা এক উজ্জ্বল তরুণ। ম্যারাদোনা সে বছর শুধু আর্জেন্টিনাকে জয় দেননি, সারা বিশ্বকেই দিয়েছিলেন জয়, তাই বিশ্বের এ মাথা থেকে ও মাথা –সবার চোখে আজ জল। কিছু মানুষ এমনই, যাকে একবার ভালোবাসে লোকে, সারা জীবন তাঁকে শর্তহীন ভালোই বাসে। সে মানুষ ভালো-না- বাসার মতো কী কী কাজ করেছেন জীবনে , তা কেউ আর হিসেব করে না।

-তসলিমা নাসরিনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ থেকে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা