kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কফিনে নিথর

শোকস্তব্ধ দেশের ফুটবল ভুবন

এক জীবনে তিনি ফুটবলকে অনেক দিয়েছেন। ফুটবল পায়ে মানুষকে আনন্দে ভাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, আবার প্রজন্মের চোখে নতুন স্বপ্ন এঁকে দিয়েছেন। ফুটবলের ফেরি করতে গিয়ে গেয়েছেন জীবনের গান, সেখানে তিনি বিপ্লবী ও প্রতিবাদমুখর। ফুটবল-আশ্রিত তাঁর এই জীবন আসলে আনন্দ-বেদনা আর হাসি-কান্নার এক কোলাজ, যা একসময় হয়তো গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াবে।

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:১৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শোকস্তব্ধ দেশের ফুটবল ভুবন

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ‘ম্যারাডোনা বাংলাদেশে আসছেন’—এই খবরে আর কখনো শোরগোল উঠবে না দেশে। এই সম্ভাবনার পিঠে পেরেক ঠুকে দিলেন বিধাতা।

করোনার আগে আগে এমন এক সম্ভাবনায় নেচে উঠেছিল ফুটবলাঙ্গন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী রাঙাতে দিয়েগো ম্যারাডোনাকে আনার এক উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। প্রতিবেশী কলকাতায় তাঁর পদধূলি পড়লেও এই বঙ্গে কখনো পা রাখেননি। এক বিপ্লবী রাষ্ট্রনায়কের শতবর্ষে আরেক ফুটবল বিপ্লবীর আবির্ভাব হবে—চমৎকার এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত আর সফল হয়নি। সেই উদ্যোগের মধ্যমণি বাফুফে সিনিয়র সহসভাপতি সালাম মুর্শেদীর আক্ষেপটা থেকেই গেল, ‘নানা কারণে তাঁকে আনা সম্ভব হয়নি। এরপর করোনাও শুরু হয়ে গেল...। এখন পয়সা থাকলেও আর তাঁকে পাওয়া যাবে না।’ ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডধারী এই তারকার চোখে দিয়েগোর চলে যাওয়াটা ফুটবলের এক কালরাত, ‘এটা ছিল ফুটবলের জন্য কালরাত। ম্যারাডোনার পায়ে ফুটবলের কত ম্যাজিক দেখেছি। অসাধারণ সব গোল, বিশ্বকাপ জয়, সাধারণ মানের দল নিয়ে আর্জেন্টিনাকে ’৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা—সবই স্মৃতিতে ভাসছে।’ সেই স্মৃতির রাজ্যে হানা দিয়ে দেশের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার শেখ মোহাম্মদ আসলাম বাঁ পায়ের শিল্পীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাচ্ছেন, ‘বাঁধাই করে রাখার মতো তাঁর বাঁ পা-টা। কোনো ঘাটতি ছিল না, বিধাতা ওই একটি পায়েই ফুটবলের সব মাধুর্য দিয়ে পাঠিয়েছিলেন।’ এই পায়ে সেরা গোল, বিশ্বজয়, ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধসহ কত বিপ্লবের জন্ম হয়েছে!

ফুটবলে সালাম-আসলামরা আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির সমসাময়িক। আর সেই জমানায় বাংলাদেশের বেশির ভাগ ফুটবলারই ছিলেন পেলে আর ব্রাজিল সমর্থক। তাঁদের পরের জমানায় প্রকট হয়ে ধরা পড়ে ম্যারাডোনার ফুটবল সম্মোহন, সুবাদে লাল-সবুজে এখন আকাশি-সাদার ব্যাপক প্রভাব। তাই আর্জেন্টাইন ঈশ্বরের বিদায়ে মন ভার হয়ে যায় বাংলাদেশ দলের ডিফেন্ডার তপু বর্মণের, ‘ম্যারাডোনা ফুটবল সৌন্দর্যের একটি অংশ। সুন্দরের সেই কারিগর বিদায় নিয়ে ফুটবলবিশ্বকে বিবর্ণ করে গেছেন। তবে তাঁর অসাধারণ সব কীর্তি থেকে যাবে, সেগুলোই আমাদের উজ্জীবিত করবে। পরলোকে ভালো থাকুন ফুটবল ঈশ্বর।’ নশ্বর পৃথিবীতে মৃত্যু অনিবার্য হলেও মামুনুল ইসলামের কাছে ম্যারাডোনা এক মৃত্যুঞ্জয়ী স্মারক, ‘মৃত্যুতে তাঁর আবেদন এতটুকু কমবে না ফুটবলে। কীর্তিতেই মহীয়ান তিনি। আমরা এখন ইউটিউবে তাঁর পায়ের কারুকাজ দেখি আর বিস্মিত হই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর দিকে ঝুঁকবে আরো বেশি করে।’ তাই বাংলাদেশ অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার সোজাসাপ্টা শ্রদ্ধাঞ্জলি, ‘এই বিশ্ব কখনো তোমাকে ভুলতে পারে না। তুমি অনেক দিয়েছ বিশ্বকে।’

এক জীবনে তিনি ফুটবলকে অনেক দিয়েছেন। ফুটবল পায়ে মানুষকে আনন্দে ভাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, আবার প্রজন্মের চোখে নতুন স্বপ্ন এঁকে দিয়েছেন। ফুটবলের ফেরি করতে গিয়ে গেয়েছেন জীবনের গান, সেখানে তিনি বিপ্লবী ও প্রতিবাদমুখর। ফুটবল-আশ্রিত তাঁর এই জীবন আসলে আনন্দ-বেদনা আর হাসি-কান্নার এক কোলাজ, যা একসময় হয়তো গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াবে। তাঁর এত বৈচিত্র্যে ভরা জীবন দেখে জেমি ডে-ও বিস্মিত, ‘একজন মানুষ একই ম্যাচে কিভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে সেরা গোল এবং বাজে গোল করতে পারেন! এটা কোনোভাবে আমি মেলাতে পারি না।’ ইংলিশদের পক্ষে ওই ম্যাচের হিসাব মেলানো কঠিন। ’৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেরা গোলের স্তুতি করে তারা। তবে তাদের বুকে শেল হয়ে বিঁধে হাতে গোলের (হ্যান্ড অব গড) যন্ত্রণা। গোলের বিচারে ‘সুন্দর ও শয়তানের’ এমন সহাবস্থানও হয়তো ফুটবলবিশ্বে আর দ্বিতীয়বার দেখা যাবে না! দেখা যাবে না ফুটবলের এমন বর্ণময় চরিত্রও। তাই বাংলাদেশের ইংলিশ কোচ শেষ শ্রদ্ধায় বলছেন, ‘মাঠে অন্যতম সেরা ফুটবলার এবং মাঠের বাইরে সবচেয়ে রঙিন মানুষটি চলে গেলেন। মাঠের ভেতর-বাইরের জীবনটা কেবল ম্যারাডোনাকেই মানাত।’

এমন আকর্ষণীয় চরিত্র ফুটবলে আর দ্বিতীয়টি হবে না। তা অদেখাই থেকে গেল এ দেশে। শোরগোলও থিতিয়ে গেল চিরতরে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা