kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ফুটবল ঈশ্বরের পাগলাটে জীবনের যত গল্প

অনলাইন ডেস্ক   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ১৭:৫১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফুটবল ঈশ্বরের পাগলাটে জীবনের যত গল্প

১৯৯১ সাল। আধা কেজি কোকেনসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন ম্যারাডোনা। ছবি : এএফপি

নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম হওয়া ম্যারাডোনার দারিদ্র ছিল শৈশবের নিত্যসঙ্গী। ঘরে অর্থাভাব থাকলেও নামের পাশে বসে গিয়েছিল সোনার ছোঁয়া। ফুটবলে অসামান্য দক্ষতার সুবাদে দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা ফ্রাঙ্কোর নাম হয়ে গিয়েছিল 'এল পিবে দে ওরো'। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ 'সোনার বালক'। পাশাপাশি আজীবন বিতর্ক তাড়া করে ফিরেছে ম্যারাডোনাকে। এক পাগলাটে সুপারস্টারের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো যাক।

২০০৪ সালে জীবনের সব ওঠানামায় পাশে থাকা স্ত্রী ক্লদিয়ার সঙ্গে ম্যারাডোনার ২০ বছরের দাম্পত্য ভেঙে গিয়েছিল। বিবাহ বিচ্ছেদের সময় ম্যারাডোনা স্বীকার করেন, তিনি ইতালির নাগরিক দিয়েগো সিনাগ্রার জন্মদাতা! অথচ এই দিয়েগোর জন্ম ১৯৮৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। তখন ম্যারাডোনা-ক্লদিয়ার দাম্পত্যের বয়স ২ বছর। বড় মেয়ে ডালমার জন্ম হতে দেরি আছে আরও ১ বছর। কিন্তু দিয়েগো সিনাগ্রা বরাবরই ম্যারাডোনার পিতৃত্ব অস্বীকার করে গেছেন। ডিএনএ পরীক্ষাতেও রাজি হননি।

দীর্ঘ দিনের প্রেমিকা এবং পরবর্তীতে স্ত্রী ক্লদিয়ার সঙ্গে বিয়ে ভাঙার সময় ম্যারাডোনা স্বীকার করেন, ইতালির ক্লাবে খেলার সময় স্থানীয় তরুণী ক্রিস্টিনা সিনাগ্রার সঙ্গে সম্পর্কের ফসল দিয়েগো সিনাগ্রা। বাবার নাম এবং মায়ের পদবি নিয়ে বড় হওয়া এই তরুণ নিজেও এক জন ফুটবলার। জন্মের ১৯ বছর পরে দিয়েগো সিনাগ্রা তার বাবাকে প্রথম চাক্ষুষ দেখেছিলেন গল্ফের মাঠে। এরপর ক্লদিয়া বলেছিলেন, বিচ্ছেদই তাঁদের সমস্যার শ্রেষ্ঠ সমাধান। কিন্তু তার পরেও ম্যারাডোনা-ক্লদিয়ার সুসম্পর্ক ব্যাহত হয়নি।

বিচ্ছেদের পরেও সাবেক স্ত্রী ক্লদিয়া, দুই মেয়ে ডালমা এবং জিয়ানিন্নাকে প্রায়ই দেখা গেছে ম্যারাডোনার সঙ্গে। ২০০৯ সালে জিয়ান্নিনার সন্তানই তাকে দাদু হওয়ার আনন্দ উপহার দেয়। আশির দশকে ইতালিতে থাকাকালীন আরও এক বিতর্ক ম্যারাডোনার সঙ্গী হয়। সে সময়েই তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তবে মাদক সেবন নাকি তিনি শুরু করেছিলেন স্পেনে বার্সেলোনার হয়ে খেলার সময়। মাদকাসক্তির প্রভাবে তার ক্যারিয়ার ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। ১৯৯১ সালে মাদক সেবনের দায়ে তাঁকে ১৫ মাসের জন্য নির্বাসিত করে নাপোলি।

১৯৯৪ সালে আমেরিকায় ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায় নিষিদ্ধ মাদক সেবনের জন্য ফুটবলের রাজপুত্রের দেশে ফিরে যাওয়া। তবে ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপ অভিযানের কাছে বাকি সব কিছু মলিন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর 'ঈশ্বরের হাত' দিয়ে করা গোল ছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। চিরবিতর্কিত সেই গোলের ঠিক ৪ মিনিটের মাথায় এসেছিল আজীবন বন্দিত আর এক পায়ের জাদু। ব্রিটিশ ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে হতভম্ব করে সেই গোল।

১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ থেকে নাটকীয় এবং লজ্জাজনক বিদায়ের পর ম্যারাডোনা আবার ফিরেছিলেন এই প্রতিযোগিতায়। ২০১০ সালে তিনি কোচ ছিলেন আর্জেন্টিনার। আরও এক বার তাঁর জাদু দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন সারা পৃথিবীর ভক্তরা। কিন্তু এ বারও অপ্রাপ্তিই সঙ্গী হয় তাঁর। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-০ গোলে চূর্ণ করে জার্মানি। এর পরে তিনি বিশ্বকাপে উপস্থিত থেকেছেন আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে।

অতিরিক্ত মাদক ও সুরার নেশার কারণে ম্যারাডোনা অনেক শারিরীক সমস্যায় ভূগেছেন। ২০০০ সালের পর থেকেই অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধির জন্য তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। ২০০৪ সালে এক বার হৃদরোগেও আক্রান্ত হন। সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য কলম্বিয়ায় তার গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারি করানো হয়। এর পর তার খাওয়াদাওয়ার ওপর চরম নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু ম্যারাডোনা তা মানলে তো!  ২০০৭ সালে বুয়েনাস আইরেসের হাসপাতালে চিকিৎসা হয় হেপাটাইটিস আক্রান্ত ম্যারাডোনার। এর পর থেকে তাঁর শরীর ও স্বাস্থ্য নিয়ে ক্রমেই গুজব ছড়াতে থাকে।

ওই সময় ম্যারাডোনার মৃত্যুর গুজব রটলে তিনি একটি টিভি চ্যানেলে এসে বলেন, তিনি বেঁচে আছেন। গত আড়াই বছর মদ স্পর্শ করেননি। জীবনযাত্রায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও অসুস্থতা তাঁকে ছেড়ে যায়নি। ছেড়ে যায়নি বিতর্কও। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ২-১ গোলে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়ে তাঁর অশালীন আচরণ অথবা আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে সঞ্চালকের প্রতি বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

ম্যারাডোনা ছিলেন বদমেজাজী। ১৯৯৪ সালে বুয়েনাস আইরেসে নিজের বাড়ির সামনে সাংবাদিকদের উপর গুলি চালিয়েছিলেন! তাঁর এয়ার রাইফেলের গুলিতে আহত হন ৪ জন। ওই ঘটনার জন্য ম্যারাডোনাকে ২ বছর ১০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ম্যারাডোনার অভিযোগ ছিল, সাংবাদিকরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বিঘ্নিত করছেন। একবার খেলায় অসুবিধে হওয়ার জন্য তিনি সমর্থকের হাতে আঘাত করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওই সমর্থক তাঁর পোস্টার তুলে ধরায় খেলার সময় সমস্যা হচ্ছিল।

আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসিও তার আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। একবার পেলের সঙ্গে কথোপকথনে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, মেসি প্রতিভাবান ফুটবলার হতে পারেন; কিন্তু তাঁর কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। নেতৃত্ব দেওয়ারও ক্ষমতা নেই। শারীরিক বা আর্থিক কোনো সমস্যাই ম্যারাডোনাকে বিতর্ক থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। কলম্বিয়ার কুখ্যাত মাদক মাফিয়া পাবলো এসকোবারের সঙ্গে বান্ধবীকে নিয়ে তিনি পার্টি করেছিলেন। ম্যারাডোনার অবশ্য দাবি ছিল, ফুটবলপ্রেমী এসকোবারের অন্য পরিচয় তিনি জানতেন না। এসব ঘটনাই এখন অতীত। ম্যারাডোনা পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা