kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

টাচলাইন থেকে

বাদলাস্ত

মোস্তফা মামুন   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:১৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাদলাস্ত

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্পোর্টিং ট্র্যাজেডির একটির সঙ্গে জড়িয়ে বাদল রায়ের নাম। আমি একা নই, তখনকার ফুটবলমুখী অর্ধেক মানুষই বাদলের এই কীর্তি বা অপকীর্তির শিকার। ১৯৮৬ লিগের মোহামেডান-আবাহনী ম্যাচ, বাদল মোহামেডানের অধিনায়ক। জ্বর বা কোনো ইনজুরির জন্য ছিলেন সাইড বেঞ্চে, নামলেন শেষ হওয়ার ১৫-২০ মিনিট আগে। গোলশূন্য ম্যাচ তখনো, শেষ পর্যন্তও তা-ই থাকত। বাদল তা রাখতে দিলেন না। শেষ মিনিটে বলটি যখন জালে পাঠালেন তখন হৃদয়ে যে ধাক্কাটা লেগেছিল, এত বছর পরও সেটা কালকের ঘটনার মতো টের পাই। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে হারলেই পরের ম্যাচ পর্যন্ত জীবন অন্ধকার হয়ে থাকে। এরপর আবার শেষ মিনিটের গোল! আবার বদলি খেলোয়াড়ের পায়ে! না, ঠিক বহন করা যাচ্ছিল না।

বয়স বেড়েছে। আবাহনী-মোহামেডান তলানিতে গেছে। পেশাগত কারণে সমর্থনও একরকম নিষিদ্ধ। তবু কিছু চোট ঠিক থেকে গিয়েছিল। ‘মহাপাগল’ নামে মোহামেডান সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বাদল রায়কে বসা দেখে আবার জমানো ব্যথাটা যেন ফিরে এলো। অতিথি হিসেবে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেই ফেললাম, ‘এই যে সামনের সারিতে বসা বাদল রায়, কী যে কষ্ট উনি দিয়েছিলেন।’ বাদল রায়ের বুঝতে একটু কষ্ট হলো। পুরো ঘটনাটা শোনার পর ঠোঁটের কোণে সেই মিষ্টি হাসি। আর কী আশ্চর্য, সামান্য সেই হাসিতেই যেন ৩০ বছরের ক্ষতটা শুকিয়ে গেল। সামান্য হাসি, কিন্তু অসমান্য শক্তিধর। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা এই হাসি মায়াময় চেহারা আর সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলে এমন একটা ত্রিভুজ তৈরি করত যে বাদল দা’র থাকা না থাকাতে অনেক কিছুই আসে যায়। স্ট্রোকের পর লাঠি হাতে, নির্জীব তিনি। মৃত্যু দুয়ার ঘুরে আসার পর জীবন থেকে অবসরই নিয়ে ফেলারই কথা। তিনি অবসর না নিয়ে যে মারমার কাটকাট দ্বিতীয় ইনিংস খেললেন সেটাকে কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেন এভাবে যে, এ ছাড়া, ফুটবল ছাড়া তাঁর আর বাঁচার কোনো অবলম্বন ছিল না। কিন্তু সত্যি বললে, আমার কাছে মনে হয় এটা খুব সাধারণীকরণ। বাদল চরিত্রের গুরুত্ব বরং এখানেই যে যা আমরা দেখছি বাদল ঠিক তা ছিলেন না। যে হাসির কথা বললাম, বা যে ব্যক্তিত্ব সেটা বাইরের রূপ। অন্তর্গত বাদল লড়িয়ে, জেদি এবং মেজাজিও। দৈবচক্রে পেয়ে যাওয়া দ্বিতীয় জীবনে আর হারাবার কিছু ছিল না বলে কিছু ক্ষেত্রে নিজের ভেতরের রূপটা বেরিয়েছে। এই দেখে আফসোস হয়, যদি নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করতেন তাহলে হয়তো না পাওয়ার হাহাকারে শেষ হয় না এমন নিবেদিত ক্রীড়াজীবন।

১৯৯৯ সালের কোনো এক সময়। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের দখল নিয়ে ক্রিকেট-ফুটবলে তখন রীতিমতো বিশ্বযুদ্ধ। ক্রিকেটের এক কর্মকর্তা তখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম পুরোপুরিই ক্রিকেটের বলে ফুটবলাঙ্গনকে খেপিয়ে তুলেছেন। অনুষ্ঠানের সবাই ওই কর্মকর্তার মুণ্ডপাত করবেন স্বাভাবিক। এর মধ্যে হঠাৎ একটা উচ্চকণ্ঠ ভেসে এলো, ‘রাখো মিয়া, ওসব ফালতু লোকের রেফারেন্স দিও না। সে কে জানো?’ বাদল দা’র গলা মনে হচ্ছে কিন্তু উচ্চকণ্ঠ বা এমন তিক্ততা তো ঠিক তাঁকে মানায় না। বাদল রায়ই। এরপর সেই কর্তা নিয়ে আরো এমন কিছু বললেন, যেগুলো ঠিক তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না। একটু অবাক। বাদল দা এভাবে কথা বলতে পারেন। এমন ভাষা হতে পারে তাঁর! ফুটবলের উত্তেজনা ক্রিকেটে পৌঁছে দেওয়া তখন আমাদের সাংবাদিকদের গুরুদায়িত্ব ছিল। ক্রিকেটের লোকজনও একচোট নিচ্ছে। বাদল দা-ই যে এদের মধ্যে সবচেয়ে উগ্র সেই খবরও সেখানে এসেছে। কিন্তু অবাক ব্যাপার, যখনই তাঁর নাম আসছে তখন ক্রিকেটের কেউ আর খারাপ কথা বলছে না। অথচ বাকিদের ব্যাপারে গলা উজাড় করে দিচ্ছে। দুটোই বেখাপ্পা। বাদল দা’র এই উগ্রতা যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি তাঁকে এমন ছাড় দেওয়ার হিসাবও কোথায় যেন মেলে না। অনেক অঙ্ক করে এবং বাদলচরিত ঘেঁটে পরে মেলালাম। বাদল রায় নামের মানুষটির ভালোমানুষি এবং ক্রীড়ামুখিতা ক্রীড়াঙ্গনে এমন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে বাদলের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলা যায় না। কিন্তু মনে রাখতে তো সমস্যা নেই। সবাই এভাবে মনে রেখে দিত আর দরকারমতো কাজে লাগাত। ওদিকে প্রকাশ্যে দারুণ ভালোবাসা। এই ভালোবাসা আবার এমন কমফোর্ট জোন হয়ে গিয়েছিল যে আর ওপরে যেতে গেলে যেটুকু সংঘর্ষে নামতে হবে বা ঝুঁকি নিতে হবে সেটাও তিনি একটা সময় পর্যন্ত চাননি। নিজের ভালোমানুষি আর সর্বজনীন ব্যক্তিত্বটাই হয়ে গিয়েছিল তাঁর জন্য একটা ফাঁদ। একভাবে দেখলে এমনকি খেলোয়াড়ি জীবনের কীর্তিটাও পেছনেই চেপে রেখেছে। নিজে ১৪ গোল করলেন, এখনকার মতো অ্যাসিস্টের হিসাব না রাখা যুগের দর্শকদেরও মনে আছে কিভাবে সালামের জন্য গোলের থালা সাজিয়ে রাখতেন বাদল, তবু ২৭ গোলের সালামই নায়ক। বাদল আসেন দ্বিতীয় হয়ে। খুবই উজ্জ্বল দ্বিতীয়। কিন্তু দ্বিতীয়ই তো!

অথচ কতগুলো জায়গাতে তিনি প্রথম ছিলেন! ১৯৯৯ সাফ গেমস। কাঠমাণ্ডুতে মালদ্বীপের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ। এটা বড় সমস্যা নয়। বড় সমস্যা হলো, এরপর দল আর ম্যানেজমেন্টে এমন বিরোধ যে একেকবার মনে হচ্ছিল হাতাহাতি পর্যন্ত বিষয়টা গড়ায় কি না! এই সময়ই উদ্ধারকারী জাহাজ হয়ে ঢাকা থেকে গেলেন বাদল রায়। আর যেন ম্যাজিক। দুই পক্ষকে নিয়ে বসলেন। একসঙ্গে বসালেন। এমনকি ঢাকা থেকে যাওয়া সাংবাদিকদেরও ডাকলেন। যেখানে ভাঙা টুকরার মতো নানাদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল সবাই, সেখানে তাঁর জাদুতে একেবারে সুখের সংসার। মাঠেও এর প্রভাব। ফিনিক্স পাখির মতো পুনরুত্থানের বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জিতল সাফ। সংগঠকদের সাফল্য সাধারণত সময়সাপেক্ষ এবং খুব প্রকাশ্যে দেখা যায় না। এটা দেখা গেল। সবাই মানল, শামির সাকিরের ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধি যদি এক নম্বর কারণ হয় দ্বিতীয় কারণ বাদল রায়ের মোহময় উপস্থিতি এবং বিচক্ষণ অভিভাবকত্ব।

এরও আগে, মাঠের ফুটবল। এবং সেখানে তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা খেলোয়াড়ই বোধহয়। ১৯৭৭ সালে দাউদকান্দি থেকে মোহামেডানে এসে এলাম-দেখলাম এর গল্প লেখাটা সবার চোখে পড়েছে। আর ধ্রুপদি দর্শক দেখেছে সাধারণ একটা মফস্বলের তরুণ একটা বটবৃক্ষের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে না। সেই ছায়াটাকেই নিজের আশ্রয় করে নিয়েছে। বলছিলাম এনায়েতের কথা। বাংলাদেশের ফুটবলের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের একজন তাঁর বিদায়ি বিদ্যা যেন তাঁকেই দিয়ে গেছেন। মোহামেডানে তিনি এনায়েতের ১০ নম্বরের উত্তরসূরি, উত্তরাধিকার তাঁর খেলার ধরনের। তখনকার ৪-২-৪ এর দুই ফরোয়ার্ডের একজন হলেও নিচে নেমে খেলা বানিয়ে, গোল করিয়ে এখনকার সময়ের আদর্শ নাম্বার ১০-ই যেন তিনি। এনায়েত গেলেন, বাদলও গেলেন সময়ের নিয়মে। কিন্তু গিয়েও রয়ে গেলেন। আরো প্রবলভাবে। খেলোয়াড়ি জীবনেই ডাকসু সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন, এমন বড় কোনো অর্জন হয়তো নয়, কিন্তু সময়টা মনে রাখতে হবে। সেই সময়, যখন ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের পায়ের নিচে মাটি নেই, মাথার ওপরে ঘোরে নির্যাতন-নিপীড়নের কালো ছায়া, তখন তিনি ক্রীড়া সম্পাদক। এখানে আরেকটি মোচড়। এখানে আরেকবার বাদলময়তা। তিনি ছাত্রলীগ এবং বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। তখনকার সমাজের শ্রেণিবিন্যাসে, এদের আবাহনীই হওয়ার কথা। অথচ কিনা পুরো বিপরীত মেরুতে। এই বেমানান জিনিসটাকেই বাদল করে তুললেন নিজের আরেক অলংকার এবং এভাবেই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের খেলা আর রাজনীতির ব্যালান্সিং ফ্যাক্টরও। আওয়ামী লীগ করেও মোহামেডানে খেলা যায়, অধিনায়ক হওয়া যায়—এর মানে আবাহনী-মোহামেডান মানে ঠিক আওয়ামী লীগ-বিএনপি নয়। বিরোধের এই রাজনৈতিক রংটা যাদের জন্য জেঁকে বসতে পারেনি তাদের নেতা বাদল রায়। খেলাকে রাজনীতির কালিমামুক্ত রাখার কাজটা পরেও তিনি করেছেন। সেখানেও ব্যালান্সিং ফ্যাক্টর। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসা মানেই আবাহনী। বিএনপি মানে মোহামেডান। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ আর মোহামেডান হওয়াতে সাংগঠনিক জীবনে বিরোধ আর উগ্রতার মাঝখানে শান্তি আর সাম্যের দূত।

এর মধ্যে ২০১৬ সালে ফোন পেলাম একদিন। কারণ, বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি নির্বাচন জিতে। যাঁকে হারিয়েছি তিনি মোহামেডান ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বাদল দা’র বিরোধী বলয়ের মানুষ বলে স্বভাবতই সন্তুষ্ট। একথা-ওকথার পর বললেন, ‘ভালো কাজের চেষ্টা করো। অবশ্য পারবা না বোধহয়। চারদিকে সব খারাপ লোক।’ কেমন যেন একটা ভেঙে যাওয়া গলা। সত্যি বললে, সেই ১৯৮৬-র গোল যেমন হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল, এই গলাটাও ধাক্কা দিল খুব। সামগ্রিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি বিশ্বাস হারানোর ঘোষণা যেন।

আড়ালে থেকে আলোর জোগান দিয়ে, ত্যাগী হয়ে সতীর্থকে সুখী বানিয়ে, সাম্য আর ভারসাম্যের দূত হয়ে শেষ বেলায় তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর তখনই জমা হয়ে থাকা অন্তর্গত জেদ আর প্রতিবাদের সত্তা দিয়ে নিজের মতো করে প্রতিরোধের চেষ্টা। করতে গিয়ে, ক্রীড়াঙ্গন-রাজনীতি আর জীবনের যে রূপটা দেখলেন, এরপর বোধহয় আর টিকে থাকা যায় না। ভঙ্গুর শরীরে এই লড়াই লড়া কঠিন কিন্তু ক্ষয়টা মনেরই বেশি হয়েছিল।

বাদল রায়ের এই বিদায় তাই শেষ পর্যন্ত বাকি বাদলদের জন্য শিক্ষাও। বাদলদের কাছ থেকে এই সমাজ দুহাত ভরে নেবে। তাঁর ভালোমানুষি নেবে, তাঁর ত্যাগ নেবে, তাঁর আত্মনিবেদনকে নেবে। দেবেও। পিঠ চাপড়াবে। গুণগান করবে। কিন্তু যখন ওরা নিজের প্রাপ্য বুঝে নিতে আরেক ধাপ এগোতে যাবেন তখন...।

তখনই বাদলময়তার করুণ সমাপ্তি। বাদলাস্ত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা