লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ফুটবলের খুদে জাদুকর থেকে পুরো বিশ্বে পরিচিত এখন ‘গ্রেটেস্টে অব অল টাইম’ হিসেবে। ফুটবলের সব কিছুই যার অর্জনের ঝুলিতে পুরেছেন। ফুটবলে পেলে-ম্যারাডোনার যুগের পর চলছে মেসি যুগ। ২০২৬ বিশ্বকাপে ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলতে নামছেন মেসি। রবিবার রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হয়তো শেষ হবে মেসি যুগের। মেসিস লাস্ট ডেন্স দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। শেষটাও রাঙাতে ফাইনালে সোনালি ট্রফিটি আবার উঁচিয়ে ধরতে সব কিছু উজার করে দিয়েছেন তিনি।
তবে আর্জেন্টিনার বদলে স্পেনের জার্সিতে বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলতে পারতেন মেসি। আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্মেছেন মেসি, কিন্তু তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করিয়েছেন স্পেন। স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমি। ২০০০ সালে ১৩ বছরের মেসিকে সই করাতে রোজারিওতে ছুটে গিয়েছিলেন বার্সেলোনার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ। হাতের কাছে কাগজ না পেয়ে একটি টিস্যুতে পেপারে সই করিয়েছিলেন মেসিকে। সেই কাহিনি তো ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। দুই বছর আগে প্রায় ১০ কোটি টাকায় নিলাম হয়েছে সেই টিস্যুটি।
পরের ২১ বছর বার্সায় ছিলেন মেসি। চার বছর জুনিয়র স্তরে। ১৭ বছর সিনিয়র ক্লাবে। বার্সাকে কী দেননি মেসি। ফুটবলের যত ট্রফি হয়, সব জিতিয়েছেন। সেই জন্যই তো ফাইনালের আগে বার্সার সভাপতি জোয়ান লাপোর্তা নিজের দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে মেসিকে সমর্থন জানিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার আগে মেসির খোঁজ পেয়েছিল স্পেন
যুব মেসির ওপর আগে থেকেই নজর ছিল স্পেনের। তাই তো রোজারিওতে গিয়ে মেসিকে সই করানোর মধ্যে দিয়েই স্পেন তা বুঝিয়ে দিয়েছিল। উল্টো দিকে সে সময় মেসির নামই জানত না আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা। তার সুবিধা নিতে চেয়েছিল স্পেন।
স্পেনের আইন অনুযায়ী, সে দেশে ১০ বছর থাকার পর কেউ সেখানকার নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকার দেশের কেউ দুই বছর থাকলেই সেই আবেদন করতে পারেন। তার অর্থ, সাবালক হওয়ার পর স্পেনের হয়ে খেলতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না মেসির। আর্জেন্টিনার হয়ে বয়সভিত্তিক দলে না খেলায় আরো সুবিধা হয় স্পেনের। সেখানকার ফুটবল সংস্থা মেসিকে সই করাতে মরিয়া ছিল।
একটি টেপের কাহিনি
সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে যার নাম, ‘মেসি : দ্য ফরগটেন টেপ’। মেসিকে কিভাবে আর্জেন্টিনা চিনেছিল, এটি তারই কাহিনি। লা মাসিয়ায় খেললেও মেসির প্রথম ম্যানেজার হোরাসিও গাগিয়োলি ও বাবা জর্জ মেসি বরাবর চাইতেন মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলুক। ঠিক সেই সময়ই স্পেনের যুব দলের কোচ গিনেস মেলেন্দেজ সোটোস বার্সার যুব দলের কোচ অ্যালেক্স গার্সিয়া ও মেসির সতীর্থ ভিক্টর ভাজকেজের মাধ্যমে মেসিকে স্পেনের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাব শুনে হোরাসিয়ো ও জর্জে ঠিক করে ফেলেন তাদের কী করতে হবে।
২০০২ সালে আর্জেন্টিনার কোচ মার্সেলো বিয়েলসা ও তার সহকারী ক্লদিয়ো ভিভাস বার্সেলোনায় যান। সেখানে খেলা আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলের ফুটবলারদের দেখতেই গিয়েছিলেন তারা। মেসির কথা তখনো তারা জানতেন না। মেসির বুঝে গিয়েছিলেন, এটাই শেষ সুযোগ। বার্সার এক ক্রীড়া সাংবাদিক জাউমে মারসেতের সাহায্যে মেসির বিভিন্ন ম্যাচের কিছু ঝলক একটি টেপে ধারণ করেন তারা। সেই টেপ পাঠানো হয় বিয়েলসা ও ভিভাসের কাছে।
এই প্রসঙ্গে ভিভাস প্রামাণ্যচিত্রে বলেছেন, মারসেত আমাকে একটা টেপ দেয়। বলেন, ‘স্পেন এই ছেলেটাকে খেলাতে মরিয়া। কিন্তু ওর পরিবার চায়, ও আর্জেন্টিনার হয়ে খেলুক। পারলে একটু দেখবেন।’
আমি টেপ চালিয়ে অবাক হয়ে যাই। ওর স্কিল দেখে মাথা ঘুরছিল। সঙ্গে সঙ্গে বিয়েলসার কাছে যান ভিভাস। সবটা বলেন, বিয়েলসা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ছেলেটি কি ভালো খেলে? ভিভাস জানান, শুধু ভালো নয়, অবিশ্বাস্য ভালো খেলে।
প্রথমবার মেসিকে দেখে নিজের চোখতে বিশ্বাস করতে পারেননি বিয়েলসা। ভিভাস বলেছেন, ওই টেপে মেসির পাঁচটা ম্যাচের ঝলক ছিল। আমাকে বিয়েলসা বললেন, ‘দ্রুতগতিতে চালাচ্ছ কেন? স্বাভাবিক গতিতে চালাও।’ আমি ওকে বললাম, ‘টেপ স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। ছেলেটা এতটাই দ্রুত, চোখ ফেরানো যাচ্ছে না।’
বিশ্বকাপের বাস মিস মেসির
সব ঠিক থাকলে ২০০৩ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ খেলতে পারতেন মেসি। কিন্তু বিয়েলসাদের পাঠানো টেপ আর্জেন্টিনায় পৌঁছয় দুই মাস পর। তত দিনে বিশ্বকাপের দল ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৭ কোচ হুগো টোকালি দল বদলাতে চাননি। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের ১৫ দিন আগে টেপটা হাতে পেয়েছিলাম। মেসির খেলা দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার পরেও দল বদলাতে চাইনি। কারণ যারা ছিল, তারা দুই বছরের পরিশ্রমের পর জায়গা পেয়েছিল। মেসিকে ঢোকাতে আমি ওদের কাউকে বার করতে চাইনি।’
আর্জেন্টিনার হার, স্পেনের শেফের খোঁচা
সেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছেই হারতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। বার্সায় মেসির সতীর্থ ও সাবেক স্প্যানিশ ফুটবলার সেস ফাব্রেগাস জোড়া গোল করেছিলেন। ম্যাচ শেষে টোকালিকে খোঁচা মেরেছিলেন স্পেনের রাঁধুনি।
টোকালি বলেন, “রাতে আমরা খেতে বসেছিলাম। পাশেই স্পেনের দল খাচ্ছিল। ওদের রাঁধুনি আমাকে এসে বলল, ‘আপনি যদি বার্সেলোনা থেকে ওই ছেলেটাকে আনতেন, তাহলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরতেন।” তা শুনে ওকে বলি, ‘কার কথা বলছেন? মেসি।’ সেটা শুনে আরো অবাক হয়ে রাঁধুনি বলেন, ‘আপনি ওকে চেনেন। তা-ও খেলাননি।’
এই কথা ধাক্কা দিয়েছিল টোকালিকে। সারা রাত ঘুমাতে পারেননি। পরের দিন আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থাকে জানিয়েছিলেন, যেভাবেই হোক মেসিকে সই করাতে হবে। তা শুনে সংস্থাটি জানিয়েছিল, আর্জেন্টিনায় তারা একটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করবে। সেখানে একজন আন্তর্জাতিক মানের রেফারি থাকবেন। সেখানেই দেখে নেওয়া যাবে মেসিকে।
রোজারিওর সব মেসি পরিবারে ফোন
মেসিকে সই করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেও তার সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ করবেন, তা বুঝতে পারছিলেন আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার কর্মকর্তারা। কারণ, তাদের কাছে ফোন নম্বর ছিল না। বাধ্য হয়ে একটি বুথে গিয়ে রোজারিওর সব মেসি পরিবারে ফোন করেন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ম্যানেজার ওমার সৌতো। তিনি বলেন, ‘মেসির পরিবারকে কেউ চিনত না। ফোন নম্বরও ছিল না। তাই আমি একটা বুথে গিয়ে রোজারিওর ফোন ডায়েরি হাতে নিই। সেখানে মেসি নামের সবাইকে ফোন করি। অবশেষে মেসির দাদির সঙ্গে কথা হয়। তার কাছ থেকে মেসির কাকা ও তার কাছ থেকে মেসির বাবার নম্বর পাই। তাকে বলি, আমি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে ফোন করছি। লিয়োনার্দো মেসির সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
মেসির নাম বলতে ভুল করেন সৌতো। তা শুনে জর্জ বলেছিলেন, ‘যাক, শেষ পর্যন্ত আমার ছেলের কথা মনে হলো। ও আর্জেন্টিনার হয়েই খেলতে চায়। তবে ওর নাম লিওনার্দো নয়, লিওনেল।’
নামের ভুলে মেসি বাদ
শুধু একবার নয়, দুবার ভুল করে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা। তারা বার্সাকে যে ফ্যাক্স পাঠায় সেখানে মেসির পদবির বানান ভুল করে। ফলে মেসির বদলে তা হয়ে যায় ‘মেকি’। বার্সা জানিয়ে দেয়, এই নামে কোনো ফুটবলার নেই সেখানে। সেটা শুনে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা ভাবে, ইচ্ছা করে মেসিকে ছাড়তে চাইছে না স্পেন। তাতে আবার যোগাযোগ শুরু করে তারা। মেসির বাবার সঙ্গে কথা বলেন এএফএ সভাপতি। নামের বানান ভুল না করলে হয়তো এতটা মরিয়া হয়ে উঠতেন না তারা।
অবশেষে আরো এক বছর পর ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলেন মেসি। স্পেনের সেই রাঁধুনির কথা সত্যি প্রমাণিত হয়। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতে। মেসি জেতেন সোনার বল। সেই বছরই আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক হয় মেসির।
মেসির ইচ্ছা
নিজের বই ‘মেসি, দ্য প্যাট্রিয়ট’য়ে তিনি লিখেছেন, ছোট থেকে একটি দলের জার্সি পরাই তার স্বপ্ন ছিল। মেসি লিখেছেন, ছোট থেকেই ভাবতাম আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থা আমাকে ডাকবে। আমি সব সময় আর্জেন্টিনার জার্সিই পরতে চেয়েছি। স্পেনে বসেও টেলিভিশনে আর্জেন্টিনার খেলা দেখতাম। মাঠে গিয়ে দেখার সুযোগ কোনো দিন হয়নি। কিন্তু একটাই স্বপ্ন ছিল। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলব।
২০১০ সালে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, মেসিকে সই করাতে কতটা মরিয়া ছিলেন তারা। দেল বস্ক বলেন, ‘আমি সব রকম চেষ্টা করেছি, যাতে মেসি স্পেনের হয়ে খেলে। কিন্তু ও বারবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। নিজের দেশকেই ও ভালোবেসেছে।’
সেই দেশের হয়েই রবিবার রাতে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলতে নামবেন মেসি। সম্ভবত শেষবারের জন্য আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দেখা যাবে তাঁকে। আরো একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ করতে চাইবেন তিনি। কিন্তু মেসির সেই স্বপ্নের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্পেন। আর একটু হলে যে দেশের হয়েই হয়তো খেলতে হতো তাকে। আর্জেন্টিনা হারাত তাদের অন্যতম সেরা মহাতারকাকে।