kalerkantho

সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ ফাল্গুন ১৪২৬। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

এক ক্রিকেটারের ব্যর্থ জীবনের কাহিনী

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ১৬:৫০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক ক্রিকেটারের ব্যর্থ জীবনের কাহিনী

টেস্ট অভিষেকটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো। একই ম্যাচে অভিষেক হয়েছিল ভারতের ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের। ওই ম্যাচেই পাকিস্তানের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন ওয়াকার ইউনুস। কিন্তু ক্রিকেটজীবনে শচীন-ওয়াকারের ছায়ার কাছেও পৌঁছতে পারেননি ভারতের একসময়ের প্রতিভাবান ক্রিকেটার সলিল আঙ্কোলা। ক্রিকেটের পরে অভিনয়ে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করেন তিনি। সেখানেও ব্যর্থ হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তার সাবেক স্ত্রীও আত্মহত্যা করেন। জানা যাক এই ক্রিকেটারের ব্যর্থ জীবনের কাহিনি।

১৯৬৮ সালে এক কর্নাটকী-কোঙ্কনি পরিবারে জন্ম আঙ্কোলার। ২০ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে গুজরাটের বিপক্ষে ৪৩ রান এবং হ্যাটট্রিকসহ এক ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে তিনি নির্বাচকদের নজর কাড়েন। ওই মৌসুমে লাগাতার ভাল পারফরম্যান্সের সুবাদে জাতীয় দলের দরজা তার সামনে খুলে যায়। ডানহাতি ফাস্ট বোলার হিসেবে তিনি যোগ দেন ভারতীয় দলে। করাচিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে জীবনের প্রথম টেস্টে আঙ্কোলা ১২৮ রানে ২ উইকেট পান। কিন্তু ওই ম্যাচে চোট পেয়ে বাকি ম্যাচগুলোতে খেলা হয়নি। 

আশ্চর্যের হলেও সত্য যে, আঙ্কোলার ক্যারিয়ারে সর্বসাকুল্যে টেস্টের সংখ্যা ওই একটিই! কোনো কারণ না দেখিয়েই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এই নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রচলিত হয়েছিল 'আঙ্কোলাড' শব্দটি। টেস্টে বাদ পড়লেও ওয়ানডে ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু তার সেই দৌড়ও ছিল সংক্ষিপ্ত। সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ২০টি ওয়ানডেতে। ৪৭.৩০ বোলিং গড় নিয়ে তার সংগ্রহ ১৩টি উইকেট। মোট রান ৩৪। সেরা বোলিং ১৯৯৩ সালের হিরো কাপের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে, ৩৩ রানে ৩ উইকেট।

১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়েছিলেন আঙ্কোলা। খেলেছিলেন একটিমাত্র ম্যাচে। ৫ ওভারে ২৮ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। বিশ্বকাপের পরেই দল থেকে বাদ পড়েন আঙ্কোলা, বিনোদ কাম্বলি ও মনোজ প্রভাকর। আঙ্কোলার পরিবর্তে দলে জায়গা পান প্রশান্ত বৈদ্য। এরপরেও বিক্ষিপ্ত ভাবে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে ডাক পেয়েছেন সলিল আঙ্কোলা। কিন্তু ওয়ানডে খেললেও সাদা পোশাকে আর মাঠে নামতে পারেননি। ১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে জিম্বাবুয়েকে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় ত্রিদেশীয় সিরিজে শেষবার সুযোগ পেয়েছিলেন আঙ্কোলা।

ওই সিরিজের ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভারত হেরে গিয়েছিল। ওই ম্যাচে আঙ্কোলা ৫০ রান করেছিলেন। ওটাই ছিল তার শেষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ।সুযোগ না পেয়ে হতাশ আঙ্কোলা ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে নেন। নতুন ইনিংস শুরু করেন অভিনয়ে। ২০০০ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম ছবি 'কুরুক্ষেত্র'। সে বছরই তিনি অভিনয় করেন 'পিতা' ছবিতেও। তার অভিনেতা-জীবনের এখনও অবধি উল্লেখযোগ্য ছবি হল 'চুরা লিয়া হ্যায় তুম নে'। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে আঙ্কোলা অভিনয় করেছিলেন এষা দেওল এবং জায়েদ খানের সঙ্গে।

সিনেমার আগে আঙ্কোলা অভিনয় শুরু করেছিলেন ছোট পর্দায়। অভিনয় করেছেন 'রিশতে', 'নুরজাহান', 'শশশ…কোই হ্যায়', 'কহেতা হ্যায় দিল', 'প্যায়ার কা বন্ধন'-এর মতো জনপ্রিয় সিরিয়ালেও। পাশাপাশি তিনি অংশ নিয়েছেন 'বিগ বস'-সহ অন্যান্য রিয়্যালিটি শো-তেও। তিনি বালাজি টেলিফিল্মস-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি ভেঙে অংশ নিয়েছিলেন বিগ বস-এ। ফলে তার বিপক্ষে জারি হয় আদালতের নিষেধাজ্ঞা। নির্দেশ দেওয়া হয়, তিনি সনির প্রতিপক্ষ কোনো টিভি চ্যানেলের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন না।

কাজের জায়গার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তখন আঙ্কোলা বিধ্বস্ত। ২০০৮ সালে অতিরিক্ত মদ্যপান করায় রিহ্যাবেও যেতে হয়েছিল তাকে। ক্রিকেটার বা অভিনেতা, কোনো ভূমিকাতেই সাফল্য না পাওয়ার পাশাপাশি নেশার প্রকোপ। এই দুয়ের আক্রমণে টালমাটাল হয়ে পড়ে আঙ্কোলার দাম্পত্য জীবন। দুই সন্তানকে নিয়ে আঙ্কোলার প্রথম স্ত্রী পরিণীতা বাড়ি ছেড়ে চলে যান বাবা-মায়ের কাছে। রিহ্যাব থেকে আঙ্কোলা সুস্থ হয়ে ফেরার পরেও পরিণীতা ফিরে আসেননি। ২০১১ সালে তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। দুই বছর পরে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলিং থেকে পরিণীতার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ধারণা, বাবা-মা ও দুই সন্তানের অনুপস্থিতিতে ফাঁকা বাড়িতে আত্মঘাতী হন আঙ্কোলার সাবেক স্ত্রী। সুইসাইড নোটে তাঁর মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেননি। শুধু লিখেছিলেন, তিনি জীবন নিয়ে 'হতাশ ও বীতশ্রদ্ধ'। ঘটনাচক্রে ২০১৩ সালের নভেম্বরেই দ্বিতীয় বিয়ে করেন সলিল আঙ্কোলা। দ্বিতীয় স্ত্রী রিয়া চক্রবর্তীর সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল ফেসবুকে। সেখান থেকেই প্রেম এবং বিয়ে। পেশায় চিকিৎসক রিয়ারও এটি দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। তার প্রথম পক্ষের মেয়ে ঋষিকা এবং সলিল-পরিণীতার ছেলে করণ ও মেয়ে সানাও সলিল আঙ্কোলা ও রিয়ার পরিবারেরই অংশ।

সলিল আঙ্কোলার প্রথম পক্ষের মেয়ে সানা বিয়ে করেছেন আর এক সাবেক ক্রিকেটার তথা ভারতীয় দলের সাবেক ম্যানেজার সন্দীপ পাতিলের ছেলে চিরাগকে। চিরাগ মরাঠি ছবির অভিনেতা। সানা পত্রিকায় কাজ করেন। চিরাগ-সানার একমাত্র শিশুকন্যার নাম রিয়ানা। জীবনের এতসব ভাঙাগড়া শেষে ধীরে ধীরে কাজের জগতে ফিরে এসেছেন আঙ্কোলা। ২০১৩ সালে অংশ নেন রিয়্যালিটি শো 'পাওয়ার কাপল ১'-এ। সে বছরই 'সাবিত্রী' সিরিয়ালে অভিনয় করেন। ৩ বছর তাকে দেখা যায় 'কর্মফলদাতা শনি' সিরিয়ালে সূর্যদেবের ভূমিকায়। আপাতত এভাবেই চলছে সলিল আঙ্কোলার জীবন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা