বিশ্বজয়ের স্বপ্ন গতবার কাতারেই পূরণ করে ফেলেছেন লিওনেল মেসি। চার বছর পর আরো একবার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা। ১৯ জুলাই, রবিবার নিউ জার্সির মেগাফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা ইউরোপসেরা স্পেনের মুখোমুখি হবে।
নিউজ আঠেরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর সেই ফাইনালে লড়াই হবে মহাতারকা মেসি ও ইয়ামালের। মেসিদের লক্ষ্য পরপর দুবার বিশ্বজয়। তবে শুধু বিশ্বজয় নয়, মেসির সামনে সুযোগ ১২ রেকর্ড গড়ার।
আগামী রবিবার রাতে নিউইয়র্ক নিউ-জার্সি স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ৩৯ বছর বয়সী মেসি এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবেন। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে ফাইনালে নামার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠবেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সের ‘আউটফিল্ড’ খেলোয়াড়। যদিও সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বেশি বয়সে ফাইনাল খেলার বিশ্বরেকর্ডটি এখনো ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক দিনো জফের (৪০ বছর ১৩৩ দিন) দখলে, তবে গোলকিপিং গ্লাভস ছাড়া মাঠের মূল পজিশনে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে মেসিই হতে যাচ্ছেন প্রবীণতম খেলোয়াড়।
এই মেগা ফাইনালের একাদশে মেসির অন্তর্ভুক্তি তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম এক অভিজাত ও এক্সক্লুসিভ ক্লাবের সদস্য করে তুলবে। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের ফাইনালে (২০১৪, ২০২২ এবং ২০২৬) মাঠে নামার বিরল নজির গড়বেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। এর আগে একমাত্র ব্রাজিলের কিংবদন্তি ডিফেন্ডার কাফু ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২ সালে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নেমে খেলার এই অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন। রবিবার কাফুর সেই ২৪ বছরের পুরোনো রেকর্ডে ভাগ বসাবেন মেসি।
তবে কাফুকে ছুঁয়ে ফেলার দিনেও মেসি এমন একটি চূড়ায় আরোহণ করবেন, যেখানে ইতিহাসের আর কোনো ফুটবলার পা রাখতে পারেননি। স্পেনের বিরুদ্ধে টসের জন্য মাঠে নামার মুহূর্তে মেসি হবেন ফুটবল ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র অধিনায়ক, যিনি তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে নিজের দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার গৌরব অর্জন করবেন। এর আগে দিয়েগো মারাডোনা, কার্ল-হেইঞ্জ, দুঙ্গা এবং হুগো লরিসের মতো কিংবদন্তিরা দুটি করে ফাইনালে অধিনায়কত্ব করলেও, অধিনায়ক হিসেবে ৩টি ফাইনাল খেলার রেকর্ড থাকবে শুধু মেসির নামে।
ইতিহাসে ইতালি ও ব্রাজিলের বহু ফুটবলার একাধিকবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে দুবার ট্রফি জেতার ভাগ্য হয়নি কারো। ড্যানিয়েল পাসারেলা, জুসেপ্পে মেয়াজ্জা কিংবা খোদ কাফু—তাঁরা প্রত্যেকেই অধিনায়ক হিসেবে মাত্র একবারই বিশ্বজয়ের ট্রফি স্পর্শ করেছিলেন। রবিবার যদি আর্জেন্টিনা স্পেনের বাধা টপকাতে পারে। তবে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে অধিনায়ক হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার রাজকীয় কীর্তি গড়বেন লিওনেল মেসি। ফুটবল বিধাতা যেন তাঁর বিদায়ি মঞ্চের জন্য এই অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের আসনটি ফাঁকা রেখেছিলেন।
বিশ্বকাপে মেসি ইতিমধ্যেই আটটি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার শীর্ষে রয়েছেন। রবিবারের ফাইনালে স্পেনের জাল যদি একবারের জন্যও তিনি কাঁপাতে পারেন, তবে সুইডেনের নিলস লিডহোমের (৩৫ বছর ২৬৪ দিন) ৬৮ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে তিনি হবেন ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা। একই সঙ্গে এই একটি গোল মেসিকে নিয়ে যাবে আর্জেন্টিনার নিজস্ব ইতিহাসের চূড়ায়। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে গুইলারমো স্তাবিলের করা ৮ গোলের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলা মেসি এই গোলের মাধ্যমে এক আসরে কোনো আর্জেন্টাইনের সর্বাধিক গোলের দীর্ঘদিনের রেকর্ডটি নিজের করে নেবেন।
যদি ফাইনালের বড় মঞ্চে মেসির চেনা জাদু আরো একটু খোলস ছেড়ে বের হয়। তিনি জোড়া গোল করতে পারেন, তবে ভেঙে যাবে আরো বেশ কিছু মহাদেশীয় ও বৈশ্বিক রেকর্ড। প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং ফুটবল ইতিহাসের সামগ্রিকভাবে মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের একটি একক সংস্করণে ১০ বা তার বেশি গোল করার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করবেন তিনি। এর আগে কেবল ফ্রান্সের ফন্টেইন (১৩ গোল), হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোকসিস (১১ গোল) এবং পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার (১০ গোল) এই ডাবল ডিজিটের গোলের চূড়ায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
ফাইনালে মেসির পা থেকে আসা যেকোনো গোল তাঁকে আরেকটি এলিট তালিকায় যুক্ত করবে। তিনি হবেন ইতিহাসের মাত্র ষষ্ঠ খেলোয়াড়, যিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার বিরল নজির স্থাপন করবেন। ২০২২ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেছিলেন মেসি। স্পেনের বিরুদ্ধে আরেকটি গোল পেলে তিনি ব্রাজিলের ভাভা ও পেলে, জার্মানির পল ব্রেইটনার এবং ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান ও কিলিয়ান এমবাপের পাশে নিজের নাম খোদাই করবেন, যাঁরা দুটি ভিন্ন ফাইনালে গোল করেছিলেন।
আর্জেন্টিনা যদি রবিবারের এই মহারণে জয়ী হয় এবং মেসি যদি অন্তত একটি গোল পান, তবে তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় এক রেকর্ড নিজের করে নেবেন। টুর্নামেন্টে নিজের গোলসংখ্যা ৯-এ নিয়ে গিয়ে তিনি হবেন বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে সর্বাধিক গোল করার একক রেকর্ডের মালিক। ২০০২ সালে ব্রাজিলের রোনাল্ডো আটটি গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিলেন। ২৪ বছর পর রোনাল্ডোর সেই রাজকীয় রেকর্ড ভাঙার সুযোগ মেসির।
ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচগুলোতে দুটি গোল করা মেসির সামনে সুযোগ থাকছে কিলিয়ান এমবাপ্পের সর্বকালীন রেকর্ড ভাঙার। ফাইনালে যদি মেসি দুটি গোল করতে পারেন, তবে বিশ্বকাপের ফাইনালে মোট ৪টি গোল করা এমবাপ্পের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। আর ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণ করে মেসি যদি রবিবারের ফাইনালে একটি হ্যাটট্রিক উপহার দিতে পারেন, তবে এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে ৫টি গোল করার অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়বেন তিনি। একইসঙ্গে ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের হার্স্ট ও ২০২২ সালে এমবাপ্পের পর তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করবেন মেসি।
মেসির ব্যক্তিগত এই ডজন রেকর্ডের ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা দলগতভাবেও এক বিশাল ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে। ১৯৩৪-১৯৩৮ সালে ইতালি এবং ১৯৫৮-১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর ফুটবল ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দেশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা সফলভাবে ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। আর দল যদি এই ঐতিহাসিক মিশন সফল করতে পারে, তবে লিওনেল মেসি হবেন বিশ্বমঞ্চে ট্রফি ধরে রাখা ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের নিলতন স্যান্তোস ৩৭ বছর বয়সে এই রেকর্ড গড়েছিলেন, যাকে ৩৯ বছর বয়সে ছাড়িয়ে যাবেন মেসি।
সব মিলিয়ে, ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল ম্যাচটি কেবল একটি ট্রফি নির্ধারণের ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি মূলত লিওনেল মেসির ফুটবল জীবনের এমন এক মহাকাব্যিক শেষ অধ্যায়, যা ফুটবল খেলাটির ইতিহাসকে চিরকালের জন্য বদলে দিতে পারে। ডজন খানেক রেকর্ডের এই হাতছানিকে সামনে রেখে মেসি যখন মাঠে নামবেন, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের চোখ থাকবে তাঁর পায়ের জাদুতে। এক নক্ষত্রের বিদায়ের লগ্নে ফুটবল বিশ্ব হয়তো প্রত্যক্ষ করতে চলেছে ইতিহাসের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ও অলৌকিক এক রেকর্ডের মেলা।