kalerkantho

আফগানদের কাছে পরাজয়ে পাগলাঘণ্টি

নোমান মোহাম্মদ   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৬:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আফগানদের কাছে পরাজয়ে পাগলাঘণ্টি

গ্রহণকালের ফেরে এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট। মাঠ থেকে তাই আর জয় নিয়ে ফেরে না জাতীয় দল। এমনকি হেরে যায় আফগানিস্তানের মতো নবীন টেস্ট খেলুড়ে দেশের কাছে; দেশের মাটিতে। খামচে ধরা এই দুঃসময়ে দিশেহারা লাল-সবুজের ক্রিকেট মানচিত্র।

এমন নয় যে, পরাজয়ের সঙ্গে সেভাবে পরিচয় নেই বাংলাদেশের। যতটা হার, তার চেয়ে বেশি জয় তো গেল কয়েক বছরের চিত্র মাত্র। ক্যানভাসের পুরো ছবিটায় বরং পরাজয়ের আঁকিবুকিই বেশি। আফগানদের বিপক্ষে এই ম্যাচের আগে ৮৫ টেস্ট হেরেছে; হেরেছে ২৪১ ওয়ানডে এবং ৫৭ টি-টোয়েন্টি। তবে সাকুল্যের এই ৩৮৩ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হারের কোনোটিই এমন সতর্কঘণ্টা বাজাতে পারেনি, যতটা পাগলাঘণ্টি বাজাচ্ছে রশিদ খানের দলের কাছে টেস্ট হারে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের হর্তাকর্তারা তা আমলে আনছেন কি না, সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

আর যদি আমলে না আনেন, তাহলে তো দেশের ক্রিকেটেরই চোরাবালিতে তলিয়ে যাবার আশঙ্কা।

একটি মাত্র ম্যাচ হারে এমন আতঙ্ক বাড়াবাড়ি ঠেকতে পারে। কিন্তু আফগানিস্তানের কাছে টেস্টকে ‘শুধু একটি ম্যাচ হার' হিসেবে দেখার উপায় নেই যে! বছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দুঃস্বপ্নের গহবরে। নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে যাচ্ছেতাই পরাজয় সব ম্যাচে। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ট্রফি জয় একটু আলোর রেখা দেখায় বটে। তাতে অন্ধকার লেপ্টে দেয় বিশ্বকাপের বিবর্ণ পারফরম্যান্স। এরপর শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ধবলধোলাই। তারপর আফগানদের বিপক্ষে টেস্ট হার।

এটিকে তাই বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ কোথায়!

আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচের আবহে এমন কিছুর শঙ্কা অবশ্য কারোই ছিল না। নতুন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো হয়তো নিজেকে খানিকটা ভাগ্যবানই ভাবছিলেন। কারণ তাঁর আগের দুজন স্থায়ী কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে এবং স্টিভ রোডসের প্রথম সিরিজ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। তুলনায় ঘরের মাঠে আফগানরা তো সহজ প্রতিপক্ষ। টেস্ট বলে তা আরো সহজ! মাত্রই দুটো টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতাই ওদের সম্বল। সে পুঁজি নিয়েই যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দেউলিয়াত্ব এভাবে প্রকাশ করে দেবে রশিদ খানের দল, সেটি ডমিঙ্গো নিশ্চয়ই ভাবতেই পারেননি। অন্য কেউও না!

টেস্টের আগে থেকেই উইকেট নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা। বছর তিনেক হল নিজেদের মাঠে প্রবল স্পিনিং উইকেট বানিয়ে সাফল্যের ‘চোরাপথ' খুঁজে নেয় বাংলাদেশ। সেভাবেই হারায় ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো পরাশক্তিদের। যাঁদের কারোই বোলিং আক্রমণের মূল শক্তি স্পিন নয়। আফগানিস্তানের মূল শক্তি স্পিন। রশিদ-নবী-কায়েস-জহিরের বিপক্ষে কেমন উইকেট বানানো হবে, এ নিয়ে সেজন্য চলে বিস্তর গবেষণা। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামে যে ২২ গজে খেলা হয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট নন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। এটি নাকি যথেষ্ট স্পিনিং উইকেট না। ওদিকে টেস্টের মাঝপথেই বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান অবধারিত পরাজয়ের সামনে দাঁড়িয়ে উইকেট নিয়ে উগড়ে দেন নিজের ক্ষোভ। এটি নাকি স্পিনিং উইকেট। স্পিননির্ভর আফগানদের বিপক্ষে এমন উইকেটে খেলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

দুজনের বিপরীতমুখী দাবির পরও এ সত্য পাল্টায়নি যে, উইকেট দুই দলের জন্যই সমান। হ্যাঁ, টস জিতে আফগানেরা এগিয়ে গেছে বটে। কিন্তু নিজেদের তৈরি করা ফাঁদে পড়ার এ আশঙ্কা নিয়েই তো এমন উইকেট তৈরির চর্চায় গিয়েছে বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে আগের ১০ টেস্টের যে পাঁচটিতে জেতে, এর সবগুলোর পূর্বশর্তে স্বাগতিক অধিনায়কের টস জয়ের বাধ্যবাধকতা। এবার জেতেননি বলে টেস্টের প্রথম বল গড়ানোর আগেই যেন ম্যাচ থেকে গড়িয়ে ছিটকে যাবার দশা বাংলাদেশের।

সেই মাঠের ক্রিকেটটাও সাকিবের দল খেলেছে যাচ্ছেতাই। আফগান স্পিন চতুষ্টয়ের বিপক্ষে রীতিমতো অসহায় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। বাংলাদেশের চার স্পিনার আবার প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইনকে ততটা ভোগাতে পারেনি। যে কারণে ম্যাচে আফগানেরা একটি সেঞ্চুরির পাশাপাশি করে চারটি ফিফটি; যার মধ্যেও ৯২ ও ৮৭ দুটি ইনিংস প্রায়-সেঞ্চুরি! আর দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলাদেশের একটি মাত্র পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংস। তা-ও মোটে ৫২ রানের!

তুলনামূলক অচেনা টেস্ট ক্রিকেটে আফগানরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে কী দারুণভাবে! বিপরীতে খেই হারিয়ে খাবি খাবার দশা বাংলাদেশের। অতিথি অধিনায়ক রশিদ খান ম্যাচে ১১ উইকেট নেবার পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে প্রথম ইনিংসে করেন গুরুত্বপূর্ণ ফিফটি। আবার স্বাগতিক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান হয়ে থাকেন অবিমৃশ্যকারিতার চূড়ান্ত উদাহরণ। শেষ দিনের শেষ বিকেলের ওই শটের কারণে।

পুরো টেস্টে বাজে খেলা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সামনে ড্রয়ের সুযোগ আসে বৃষ্টির দাক্ষিণ্যে। শেষ বেলায় চার উইকেট নিয়ে ১৮.৩ ওভার টিকে থাকলেই হত! সাকিব করলেন কী, নেমে অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরের প্রথম বলেই মারতে গিয়ে আউট! যেন সেটি চার বা ছক্কা হলেই জিতে যাবে বাংলাদেশ! যেন ওভারপ্রতি ১৩.৯৩ রান করে নিয়ে ১৮.৩ ওভারে ২৫৫ রান করে ফেলবে দল! অন্যরা অধিনায়কের অনুগামী হয়ে ঐতিহাসিক এক জয় আফগানিস্তানকে উপহার দেয় বাংলাদেশ। নিজেরা ঐতিহাসিক পরাজয়ের শিকার হয়ে।

ম্যাচের আগ-পরের ছয় দিনের মধ্যে চার দিনই সংবাদ সম্মেলনে আসেন অধিনায়ক সাকিব। অহেতুক নয়। তিনি যে টেস্ট অধিনায়ক থাকতে চান না, সে বার্তা স্পষ্ট করে দেবার জন্যই হয়তো-বা। ওদিকে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান ফল নিয়ে নিজের ক্রোধের কথা জানিয়েছেন। চারিদিকে তাই নানা কথা; হরেক গুঞ্জন। রীতিমতো হ-য-ব-র-ল অবস্থা। সামনে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের আগে যদি সবার সুর না মেলে, তাহলে অসুর ভর করবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওপর।

-ডিডাব্লিউ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা