kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

যেভাবে অনন্য ক্রিকেট বিশ্বকাপ

মোস্তফা মামুন, লন্ডন থেকে   

১৫ জুলাই, ২০১৯ ০৯:১৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যেভাবে অনন্য ক্রিকেট বিশ্বকাপ

‘আমি একজন নিউজিল্যান্ডের সত্যিকারের ভক্ত। আমাকে একটি টিকিট দেবে’—এই বুকভরা আর্তনাদের দেখা মিলল সেন্ট জনস উড স্টেশনে নেমেই। আক্ষরিক অর্থেই বুকভরা আর্তনাদ। বুকের মধ্যে প্ল্যাকার্ডে দাবিটা লেখা।

আরেকজন লিখে জানাচ্ছেন, ‘শুধু এই ম্যাচটি দেখতে সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে এসেছি। কেউ কি একটি টিকিট দেবে না!’

দিল না। দেওয়ার নেই যে। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ম্যাচে উল্টো চিত্র দেখেছিলাম বার্মিংহামে। টিকিটের ঝুলি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা রঙের কালোবাজারিরা। সেমিফাইনাল ম্যাচ, চিরদিনের শত্রুতা, তবু আকর্ষণ নেই দেখে মনেই হয়নি ফাইনালের টিকিট নিয়ে এমন আগ্রহ তৈরি হবে। হলো। ফাইনাল যে!

টুর্নামেন্টের মজা এখানেই, অন্য ম্যাচে যত যা-ই অনাগ্রহই থাকুক ফাইনালে উৎসাহ মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। এবং সেই আগ্রহটা যতটা না স্বাগতিক ইংল্যান্ডের, তার চেয়ে বেশি যেন দূরের নিউজিল্যান্ডের। হতে পারে সম্ভাবনা নেই ভেবে ওদের কেউ ফাইনালের টিকিট কাটার সাহস দেখাননি। ফাইনালে ওঠার পর মনে হয়েছে, ‘চান্স অব লাইফটাইম।’ তাই অ-উপমহাদেশীয় ম্যাচের বিবেচনায় অবিশ্বাস্য ছবি। ম্যাচের দিনে টিকিট বিক্রেতার চেয়ে বেশি। অন্যান্য দিনে অন্য দৃশ্য দেখে তাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

যাই হোক, এই ছবির ভিত্তিতে এই পর্যবেক্ষণে পৌঁছার কোনো সুযোগ নেই বিশ্বকাপ একদম মাত করে দিয়েছে দশ দিক। বরং উল্টো একভাবে দেখা যায়। ফাইনাল সব সময়ই মর্যাদায় অনেক উঁচুতে। তবে উচ্চতাটা অন্য যেকোনো ম্যাচের সঙ্গে নিচতলা আর দশতলা ব্যবধান। যেমন ঠিকই একই রকম বিশ্বকাপ ক্রিকেট আর সাধারণ ক্রিকেট সিরিজের পার্থক্য।

এটা খুব জ্ঞানের কথা নয় যে বিশ্বকাপ আর দশটা সিরিজ থেকে আলাদা থাকবে। বিশ্বের সব দেশ খেলে, শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়, কাজেই সেটা তো আগ্রহের তুঙ্গে পৌঁছাবেই। কিন্তু অন্য বৈশ্বিক খেলাগুলোর সঙ্গে ক্রিকেটের পার্থক্য হলো, ক্রিকেট জাতীয় দলভিত্তিক খেলা। সারা বছর একে অন্যের সঙ্গে খেলে। সবাই সবার চেনা। এই ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ডই হয়তো কিছুদিন পর একগাদা ম্যাচে মুখোমুখি হবে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে। কিন্তু সেসব ম্যাচ ঘিরে যদি এখনকার একশ ভাগের এক ভাগ আগ্রহ থাকে সেটাও হবে বলার মতো ঘটনা। সেই দল, সেই ম্যাচ, সেই চেনা সব খেলোয়াড় তবু বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো মর্যাদার রং নিয়ে নয়। তাত্ত্বিকভাবে তা-ই হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে হওয়ার কথা তো নয়। শুধু নামটা বিশ্বকাপ হওয়াতেই রংটা এতখানি বদলে যাবে!

বোঝার সুবিধার্থে অন্য খেলাগুলোর সঙ্গে একটু তুলনা করি। ফুটবল বিশ্বকাপের পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে সুবিধা হবে। প্রথম পার্থক্য হলো, ফুটবলে বিশ্বকাপ ছাড়া সেভাবে সারা দুনিয়ার ফুটবলের একীভূত হওয়ার সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত ফুটবল ক্লাবভিত্তিক খেলা বলে জাতীয় দল সেভাবে খেলেও না। যাও কিছু মুখোমুখি হয় সেগুলো বন্ধুত্বের ম্যাচ। বিশ্বকাপ তাই আক্ষরিক অর্থেই সবার মিলনের জায়গা। দর্শকদের কাছে এ জন্য অনন্য হয়ে ওঠে যে এখানে নতুন অনেক প্রতিভার সঙ্গে পরিচয় হয়। না চেনা এক দক্ষিণ আমেরিকান কিংবা অজানা আফ্রিকান চমকে দেয়। ঠিক যে এখন ক্লাব ফুটবলের সম্প্রচারগত ব্যাপ্তিতে ফুটবলেও আবিষ্কারের ব্যাপারটা কমে গেছে। পেলে-গারিঞ্চাকে দেখে দুনিয়া চমকে গিয়েছিল, কারণ আগে সেভাবে এঁদেরকে দেখেইনি। এখন ক্লাব ফুটবল এত দেখা যায়, গুগলের দুনিয়া এমন আঙুল টেপা দূরত্বে যে সেভাবে অচেনা কেউ থাকে না। কিন্তু চেনা হলেও জাতীয় দলে এঁরা অন্য জার্সিতে। অন্য পরিবেশে কেমন করে সেটা দেখার থাকে। ক্রিকেটে এমনও নয়। সেই খেলোয়াড়। সেই দল। সব কিছু সে রকম। তা-ও দশটা মাত্র দেশ। সবাই ইংরেজি অধ্যুষিত দুনিয়ার হওয়াতে ভাষাগত ব্যবধানও নেই। এর মধ্যে আবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাও এত বেশি হয় যে সেখানেও একরকম একঘেয়েমি।

কিন্তু বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে মনে হলো তবু আসলে ব্যাপার আছে। আসলে মাঝের চার বছর যে ক্রিকেট হয়ে চলে তাতে আসলে বিকাশও চলে। চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বিশ্বমঞ্চে সেই পরীক্ষা সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে তবেই মডেলটা সফল। যেমন ধরা যাক, বিশ্বকাপে গ্রেটব্যাচ বা সেই সময়ের নিউজিল্যান্ড প্রথম ১৫ ওভারের ফিল্ডিং সীমাবদ্ধতাটা কাজে লাগাতে পারল বলেই এর পর থেকে সেটা অনুসরণীয়। শ্রীলঙ্কা ওয়ানডে ক্রিকেটে আরেক ধাপ এগিয়ে একটা বিপ্লব করল ১৯৯৬ বিশ্বকাপে। এবং সেই বিপ্লবের রেশটা এত দূর গেল যে এর ফলে বড় দৈর্ঘ্যের কাঠামোহীন শ্রীলঙ্কা টেস্ট ক্রিকেটেও সফল হতে শুরু করল। বিশ্বকাপের বিশ্বাসটার বিস্তার এতটাই। এবং এই বিশ্বকাপের বিশেষত্বের সিদ্ধান্তে পৌঁছার বেলায় ভূমিকা রাখছে এবারের আসরের অবদানও।

এই বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ক্রিকেট দুনিয়া মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল যে আগামীর ক্রিকেট হবে শুধুই ব্যাটসম্যানশাসিত। মানুষ চার-ছয় দেখতে আসে, সর্বোচ্চ সংস্থাও খেলার টিকে থাকার স্বার্থে তা-ই চায়। পরাক্রমশালী ভারত এবং স্বাগতিক ইংল্যান্ড ব্যাটিংমুখী দল হওয়াতে রানবন্যার একটা মেলা হবে ইংল্যান্ডে। তাতে বোলাররা ভেসে গিয়ে টেমসে সলিলসমাধিস্থ হবে। কিন্তু পেছন ফিরে যখন বিশ্বকাপ দেখছি তখন সবার আগে যে দৃশ্যটা ভাসে, সেটা তো একজন বোলারের কীর্তি। স্টোকসের স্টাম্প উড়িয়ে দেওয়া যে বলটি করেছেন স্টার্ক এটা ক্রিকেট মিউজিয়ামে ভরে রাখার মতো। আবার ব্যাটিংয়ের বিশ্বকাপে টেন্ডুলকারের ৬৭৩ রান প্রবল হুমকির মুখে পড়েও খুব সম্ভব অক্ষত থেকে যাচ্ছে, যখন স্টার্ক ম্যাকগ্রার ২৬ উইকেটকে পেছনে ফেলে দিলেন। ব্যাটিংয়ের সাজানো বিশ্বকাপে বোলিংই বরং চূড়ায় পৌঁছাল। সাধারণ যেসব অনুসিদ্ধান্তে ক্রিকেটজগৎ পৌঁছে যায় বিশ্বকাপ তাকে ভুল প্রমাণ করে নিজের শক্তি এভাবেই জানায়।

আর এভাবেই ক্রিকেট বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। জানা জিনিস বিশ্বকাপের পরীক্ষাগার পেরোতে পারলেই মডেল। নইলে বিভ্রান্তি।

যেমন বিশ্বকাপের আগে জানা ছিল, ওয়ানডেতে বিশাল রান করতে হবে। বোলাররা নাচের দলের পেছনের তাল দেওয়াদের মতো মূল্যহীন হয়ে যাবেন ক্রমে। বিশ্বকাপ দেখাল ওরা থাকবেন। এবং ব্যাটসম্যানদের নাচাবেনও।

ক্রিকেট বিশ্বকাপে আবিষ্কার নেই কে বলে! এই আবিষ্কার বরং আরো মজার। সবাই সব কিছু দেখছে। তবু বোঝার জন্য বিশ্বকাপ লাগছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা