kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

সব সময়ের অস্ট্রেলিয়া, না এবারের ইংল্যান্ড

মোস্তফা মামুন, বার্মিংহাম থেকে    

১১ জুলাই, ২০১৯ ০৮:৫১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সব সময়ের অস্ট্রেলিয়া, না এবারের ইংল্যান্ড

অস্ট্রেলিয়া গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। থাকুক চ্যাম্পিয়ন।

ইংল্যান্ড এবারের স্বাগতিক। হোক স্বাগতিক।

তাতে আসলে নাকি কিছু আসে-যায় না। বলছিল ইথিওপিয়ান ইয়াসির।

ওর কাছে ক্রিকেট মানে ভারত। কারণ ম্যানচেস্টারে সেমিফাইনাল ম্যাচের দিনটা দেখে ওর মনে হয়েছে ক্রিকেটের নিয়ম বোধ হয় এ রকমই। সেমিফাইনালে একটা দল খেলে।

‘আরেকটা দল আছে তো।’

‘কারা এরা?’

‘নিউজিল্যান্ড।’

‘তাই নাকি। পুরো শহরে তো ওদের কোনো সমর্থককে দেখলাম না। আচ্ছা আমিই ওদের সমর্থন করি। ওহ হো, আমি তো আবার ক্রিকেটটা ঠিক বুঝি না।’

ইংল্যান্ড এমনই। ব্রিয়ারলি-বয়কটদের মতো বোদ্ধা পণ্ডিতদের দেশে ক্রিকেটবোধহীনের সংখ্যা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। পত্রপত্রিকায় এখন প্রধান খবর উইম্বলডন, অফ সিজনের ফুটবল তার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে! ক্রিকেট! সাগরে সুই খোঁজার মতো করে পত্রিকা ঘাঁটতে হয়। স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে নিয়েও বাড়তি কোনো পরিবেশনা নেই।

এত সাতকাহনের কারণ কাল বার্মিংহামে নেমে স্থানীয় কাগজ হাতে নিয়ে এই প্রথম মনে হলো, একটা ম্যাচ হচ্ছে। এই প্রথম এ-ও মনে হলো, ভারত ছাড়াও ক্রিকেট ম্যাচ হয়। মনে পড়ে, অনেক বছর আগের স্মৃতি। ১৫ বছর আগে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সময় একবারই পত্রিকায় প্রথম পাতায় জায়গা পেয়েছিল ক্রিকেট। যেদিন ইংল্যান্ড হারিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে। ক্রিকেটে বৃদ্ধাশ্রমের মানুষদের বাইরে সাদা ব্রিটিশদের বিশেষ আগ্রহ নেই কিন্তু যখন সামনে অস্ট্রেলিয়া তখন খোদ প্রধানমন্ত্রীও ব্রেক্সিট জটিলতা ভুলে ক্রিকেটের জালে ঢুকে পড়েন। তখন ভাবী দুই প্রধানমন্ত্রীর টেলিভিশন বিতর্কও ম্লান হয়ে যায়। তখন ট্রাম্পের সঙ্গে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের লেগে যাওয়াটাও পেছনে চলে যেতে পারে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটা ক্রিকেটের, তাই দেখব আমরা কিন্তু দেখব না এ-ও আসলে জাতিগত ইতিহাসের মীমাংসার একটা মঞ্চও। সব জায়গায় ওরা লড়িয়ে। আর কোনো খেলায় ঠিক বিশ্বশ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে সমান গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে ক্রিকেট লড়াই হয়ে ওঠে মর্যাদার হাতিয়ার।

ইতিহাসের এ-ও এক খেয়াল যে কোন জিনিসটা যে সে ধরে রাখবে ধারণাই করা যায় না। নইলে ১৩৭ বছর আগে স্পোর্টিং টাইমসের তরুণ সাংবাদিকটি যে শোকগাথা লিখেছিলেন সেটা তো স্থায়িত্বের জন্য নয়। ইংলিশ ক্রিকেটকে উপহাস করার জন্য। অস্ট্রেলিয়ার কাছে সিরিজ হারের পর লিখলেন, ‘ইংলিশ ক্রিকেট ভস্মীভূত হয়েছে আর এর ছাই নিয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ানরা।’ একদিনের পত্রিকার একটা লেখা পরদিন পত্রিকা বেরোলেই নাই হয়ে যাওয়ার কথা। থেকে গেল। এমন যে পরের সফরের আগে ইংলিশ অধিনায়ককে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে তো আপনারা সেই অ্যাশেজ বা ছাই পুনরুদ্ধার করতে যাচ্ছেন? অধিনায়ক বললেন, ‘হ্যাঁ। পুনরুদ্ধারের জন্যই যাচ্ছি।’ ব্যস, এর পর থেকে ক্রিকেট ইতিহাসের আদি এবং সম্ভ্রান্ত লড়াইয়ের নাম অ্যাশেজ। টেস্ট সিরিজের ক্ষেত্রেই নামটা প্রযোজ্য, তবু ওয়ানডে লড়াইয়েও সেই ইতিহাস আসে। বোঝাতে যে দুই দলের এই ‘যুদ্ধে’ ছাইও কী গুরুত্বপূর্ণ। কী গুরুতর হয়ে অমরত্ব পেয়ে যায় আবেগী সাংবাদিকের হৃদয় নিংড়ানো দুঃখের গল্প।

একভাবে দেখলে ইতিহাস কত ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। নামকরণ কেমন ব্যর্থ হতে পারে। নাম ছাই, অথচ এই লড়াই-ই ক্রিকেটকে উপুড় করে ভরে দিয়েছে প্রাচুর্যে। ব্র্যাডম্যানের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার প্রায় গল্পই তো এই সিরিজে। কিংবা জার্ডিনের চূড়ান্ত ক্রিকেট ধুরন্ধরতা। হ্যারল্ড লারউড বোলার থেকে হয়ে গেলেন ‘রক্তখেকো’। এখানেই মার্ক উডফুল ইংলিশদের শেখালেন ক্রিকেটীয় সভ্যতার পাঠ, যখন বডিলাইন বোলিংয়ে আক্রান্ত হওয়ার পর ইংলিশ ম্যানেজারকে গিয়ে বললেন, ‘মাঠে একটা দলই ক্রিকেট খেলছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেই দলটার নাম ইংল্যান্ড নয়।’ কত কিছু এরপর। লেগ সাইডে বল করার আইন বদলাল। ক্রিকেটীয় সভ্যতা বিনষ্ট নিয়ে হৈচৈ। এসব লড়াই পেরিয়ে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে এসে অবশ্য অন্য চিত্র। চূড়ান্ত একপেশে। অস্ট্রেলিয়ার দাপটের কাছে ইংলিশরা এমন মলিন যে অ্যাশেজ আর সেভাবে মানুষকে টানে না। অস্ট্রেলিয়া যখন বারবার চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড তখন ২৭ বছর আগের ফাইনাল নিয়ে পড়ে থাকে। তা-ও সেই ফাইনালও মনে করার কিছু নয়। ফাইনালের হার মানে তো রানার্স-আপ হওয়া নয়। চ্যাম্পিয়ন না হওয়া।

আরেকবার যখন দুই দল মুখোমুখি তখন সামনে বিশ্বকাপ ফাইনালের অঙ্ক। যে অঙ্ক মেলানোয় অস্ট্রেলিয়ার দক্ষতা ইংল্যান্ড তো বটেই, পুরো দুনিয়ার কাছেই ঈর্ষণীয়।

সাম্প্রতিক অতীত ব্যাপারটাতে ইংলিশরা আপত্তি করতে পারে। অন্তত ওয়ানডের ক্ষেত্রে তো অবশ্যই। বিশ্বকাপের গ্রুপ ম্যাচে ইংল্যান্ড হেরেছে, সেটা ধরলে গত ১১ ম্যাচের মধ্যে একমাত্র হার। কিন্তু সমস্যা হলো এই একটা হারই আবার জানায় অস্ট্রেলিয়া সময়মতো জেগে ওঠে। আর তাই এজবাস্টনে যে ইংল্যান্ড গত ১০টি ম্যাচের সব জিতেছে সেটাও এমন কোনো কার্যকর তথ্য নয়। বিশ্বকাপ আর অস্ট্রেলিয়া যখন এক হয়, তখন সে অন্য ব্যাপার। এবারই তো, গত ঝামেলার মধ্যে গত কয়েক বছর, মনেই হয়নি এত দ্রুত দাঁড়িয়ে যাবে। অথচ বিশ্বকাপ আসতেই সব ঠিকঠাক। একেক সময় মনে হয় অস্ট্রেলিয়া সব প্রতিযোগিতাকে বিশ্বকাপ ধরে খেললে ক্রিকেটে বোধ হয় কোনো দিনই হারত না। আর ইংল্যান্ড! এমন উল্টো গোলার্ধে দাঁড়িয়ে যে বড় প্রতিযোগিতা এলেই সব শেষ। আওয়াজ ওঠাবে, শেষমেশ আওয়াজের নিচে চাপা পড়বে। এবারও যখন একবার পা পিছলাল তখনই মনে পড়ছিল, সেই ইংল্যান্ড। সেই নড়বড়ে অতীত। পা পিছলায়নি। বরং দৃঢ় পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে জানিয়েছে এই দল অন্য রকম।

সত্যি যদি বলি, ফুটবল-ক্রিকেট-হকিসহ বৈশ্বিক কোনো ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কোনো দল মেলেনি যারা মানুষেকে বিনোদন দিতে সক্ষম। জিতেছে হয়তো এক-আধবার কিন্তু আনন্দদায়ী খেলাটার সঙ্গে ওদের বিরোধ সব সময়ের। সিস্টেম-প্রক্রিয়া-সনাতনি চিন্তার ব্যূহে ঢুকে থেকে শেষ পর্যন্ত খেলাটা খেলে মেশিনের মতো। স্যার আলফ রামসে ‘উইংলেস ওয়ান্ডারের’ মাধ্যমে একটা নতুন চিন্তা যোগ করেছিলেন, এর বাইরে কি আর খুব কিছু আছে? আছে। এই ইংল্যান্ড দলের ব্যাটিং। টি-টোয়েন্টিজাত শটমুখী বিজ্ঞান এমনভাবে সমন্বিত করেছে, কেতাবি ঢঙের ব্যাটসম্যানদের ভুলে উদ্ভাবনী শক্তির সাহসীদের দলে নিয়ে ওয়ানডে ব্যাটিংয়ের ব্যাকরণকে লিখেছে নতুনভাবে। ৫০০ করতে পারেনি, তবু খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। গত কয়েক বছরে ৪০০ তো এত বেশি করেছে যে ওটাই এই দলের সাধারণ স্কোর যেন। এই ইংল্যান্ড তাই ওদের প্রথা আর ধারা থেকে বের হওয়া নতুন প্রবাহ। নতুন চিন্তা। আমরা সাধারণত মনে করি ইংল্যান্ড খেলা আবিষ্কার করে সেই গরিমা নিয়ে পড়ে থাকে। আর পিছায়। এবার জানা যাচ্ছে, এর ভেতরের শোধন-পরিশোধনেও মন দিয়েছে তারা।

এই ইংল্যান্ড তাই অকারণ অহংয়ের সেই আদি ইংল্যান্ড নয়। এই ইংল্যান্ড মানুষের মনের খোরাক জোগানোর দল। সেই শক্তির জয় হলে তো মন্দ হয় না। চার বছরের পরের টুর্নামেন্টে, মাঝের চার বছরের সেরা দলের তো কিছু পাওনা হয়।

অস্ট্রেলিয়া দিতে নারাজ। হুংকার দিচ্ছে বার্মিংহামে এসে। শুরু করে দিয়েছে কথার প্যাঁচে ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলার কৌশল। সেদিন কোচ ল্যাঙ্গার খেলোয়াড়দের নিয়ে খালি পায়ে এজবাস্টনে হেঁটে আসলে কী করতে চাইলেন সেই গবেষণায় ইংল্যান্ডের যথেষ্ট সময় যাচ্ছে। এসব করেই অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডসহ সবাইকে ফাঁদে ফেলেছে। রুটস দেখলাম বিষয়টা বোঝার মতো করে বলছেন, ‘আমরা জানি এ সবই ওদের স্টাইল। ম্যাকগ্রা আগে ৫-০ বলে চাপ তৈরি করত না, ও রকমই চেষ্টা করছে।’

অস্ট্রেলিয়া ওদের পথেই আছে। বিশ্বকাপে এসে সেরা ফর্মে। মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে আগের ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেওয়া। কিন্তু সমস্যা হলো, এবারের ইংল্যান্ড তো আর সেই ইংল্যান্ড নয়। বদলানো। সাহসী। চিন্তাশীল।

অস্ট্রেলিয়া আছে তাদের চিরকালীন মেজাজে। ইংল্যান্ডকে বলতে পারি নতুন চেহারার সমকালীন দল।

লড়াইটা তাহলে চিরকালীনের সঙ্গে সমকালীনের। পরীক্ষিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাহসী নতুন চিন্তার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা