kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

ভালোবাসায়-ঘৃণায় রশিদ খান

সাইদুজ্জামান, সাউদাম্পটন থেকে    

২৫ জুন, ২০১৯ ০৯:৪৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভালোবাসায়-ঘৃণায় রশিদ খান

বাবা কৌতুক করছেন, ছবি তোলার জন্য রশিদ খানকে কত টাকা দেবে? বছর দশের কিশোর মুহূর্ত না ভেবে লাফিয়ে বলছে, ‘টেন পাউন্ডস!’ টিফিনের জমানো টাকা আর কতই বা হবে আফগান কিশোরের। পরশু বিকেলে হ্যাম্পশায়ার বৌলের গায়ে ওঠা হিলটন হোটেলের সামনে পিতা-পুত্র এবং আফগান তারকাকে ঘিরে এমন এক আবহ তৈরি হয়েছিল যে, ভিড় ক্রমশ বড় হয়েছে। যে রশিদ খান লেগস্পিনে চমকে দেন বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানকে, তিনিও দেখি মুগ্ধ ওই আফগান কিশোরের এনার্জি দেখে!

হ্যাম্পশায়ার হিলটনের আশপাশে খাওয়ার ভালো জায়গা নেই। তাই ডিনারে যেতে ট্যাক্সির অপেক্ষায় লবিতে নেমেছিলেন রশিদ, সঙ্গে হজরতুল্লাহ জাজাই ও হামিদ হাসান। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট এখন পরিচয়ের দেয়াল তুলে দিয়েছে। তাই রশিদ খানের কাছে বাংলাদেশের ফটো সাংবাদিক নিছকই আগন্তুক নন। জাজাইও হেসে বলেন, ‘ঢাকা ডায়নামাইটস!’

সেই কবে দেশ ছেড়ে লন্ডনের আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা কিশোর রশিদ খানকে গতকালই প্রথম হাতের কাছে পেয়েছে। তবে ক্রিকেটের প্রতি বাবার আগ্রহ আর টিভির কল্যাণে রশিদকে এক লহমাতেই চিনে ফেলে। স্বভাবতই এ লেগি তার সবচেয়ে পছন্দের ক্রিকেটার। এবং আফগান কিশোর নিশ্চিত যে, সোমবারে জিতবে তার দেশই! তারকা এবং তাঁর খুদে ভক্তের এমন দৃশ্য বিরল বলেই কিনা, উপস্থিত বাংলাদেশি সাংবাদিকরা সবাই অবাক। কিশোরের উচ্ছলতা এবং রশিদ খানের ‘ডাউন টু আর্থ’ আচরণ—দুটোই সমান সম্মোহনী ক্ষমতার অধিকারী।

আফগানিস্তান দলের অন্দরমহল নিয়ে নানা রটনা ছড়িয়েছে বিশ্বকাপে। নিয়মিত অধিনায়ক আসগর আফগানকে সরিয়ে বিশ্বকাপের ঠিক আগে গুলবাদিন নাইবকে অধিনায়ক করা দিয়ে এর শুরু। নতুন অধিনায়কের ‘বিরোধী দলে’র সংখ্যাই নাকি বেশি। স্বয়ং রশিদ খানের টুইটে তেমন ইঙ্গিতও রয়েছে, ‘ক্রিকেট বোর্ড কিংবা অধিনায়কের জন্য নয়, আমি ক্রিকেট খেলি আফগানিস্তানের জন্য।’ একবার রেস্টুরেন্টে ছবি তোলা নিয়ে ভক্তদের সঙ্গে বিবাদও হয়েছে কয়েকজন আফগান ক্রিকেটারের। বলার অপেক্ষা রাখে না, আফগান ক্রিকেট প্রশাসকদের কর্মকাণ্ডে মোটেও খুশি নন কোচ ফিল সিমন্স। সব সময় ক্রিকেটারদের পক্ষ নেন বলেই নাকি এ ক্যারিবীয়কে কোচ পদে নিয়োগ দেয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। এর সঙ্গে মাঠের হতোদ্যম নৈপুণ্যের জেরে দূর থেকে আফগান টিমের অসুখী সংসারের ছবিই কল্পনায় দেখা যাচ্ছিল।

গতকাল হোটেল থেকে স্টেডিয়ামে আসার পথে ট্যাক্সিচালকের কাছ থেকে জানা গেল আরো বিস্ফোরক মন্তব্য। তিনি আফগান। তবে নিজ দেশে পরবাসীর অসম্মান সুদূর সাউদাম্পটনে থিতু হওয়ার পরও ক্ষুব্ধ করে তাঁকে, ‘সত্যি বলতে কি, আফগানিস্তানের ক্রিকেট দলটাকে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না।’ তাঁর এহেন ‘দেশবিরোধিতা’র কারণ, ‘ওরা তো পাখতুন ছাড়া আর কাউকে দলে নেয় না! পুরো দল একজোট এ ব্যাপারে। অন্য সম্প্রদায়ের ভালো ক্রিকেটারকে কোনো দিনও আফগানিস্তান দলে নেওয়া হবে না।’ ট্যাক্সিচালকের নিজে তাজিক সম্প্রদায়ের। তাই কাবুল থেকে মাত্র ১৫ মাইল দূরের অধিবাসী হয়েও আফগানিস্তানে প্রাপ্য সম্মান পান না তিনি, অন্তত তাঁর ক্ষোভের কারণ এটাই। একই কারণে তিনি মুগ্ধ বাংলাদেশকে দেখে, ‘অথচ তোমাদের দলে দুজন হিন্দু খেলছে। ইংল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকা দলে মুসলিম খেলছে। কিন্তু আফগানিস্তান দলে তুমি কোনো দিন পাখতুনদের ছাড়া কাউকে দেখবে না!’

হ্যাম্পশায়ার বৌল সংবাদকর্মীদের জন্য পাঁচতারা সুবিধা নিয়ে তৈরি। নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি নেই। হিলটন হোটেলের লিফটের বাটনে ‘থ্রি’তে চাপ দিলেই পৌঁছে দেবে প্রেসবক্সে। চেয়ার-টেবিল আর ইন্টেরিয়র হোটেল মানের সঙ্গে মানানসই। সবচেয়ে বড় সুবিধা ট্যাক্সিতে এসে নামা যায় এক্কেবারে হিলটনের পোর্টিকোতে।

এক দিন আগে, না, মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে প্রবেশপথের বাইরে রশিদ খানের এক কিশোর ভক্তকে দেখে মন ভরে গিয়েছিল। অথচ কাল ঠিক একই জায়গায় নামিয়ে দেওয়া এক আফগানের কাছে রশিদ খান অ্যান্ড কোং স্রেফ একদল ভিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভাড়া দিয়ে নামার সময় ‘গুডলাক’ জানাতে ভোলেননি আফগান ট্যাক্সিচালক!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা