kalerkantho

সোমবার । ২২ জুলাই ২০১৯। ৭ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৮ জিলকদ ১৪৪০

সব বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশের জয়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৪ জুন, ২০১৯ ২৩:১৮ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সব বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশের জয়

মোহাম্মদ নবী ও গুলবাদিন নায়েবের স্বপ্নটা সত্যি হলো না! বাংলাদেশকে নিয়ে ডুবতে চেয়ে উল্টো সাকিবের ঘূর্ণি যাদুতে অতল সমুদ্রে ডুবতে হলো আফগানিস্তানকে। বাংলাদেশের ২৬২ রানের জবাবে ২০০ রানেই ডুবে গেল আফগানিস্তান। 
 
বাংলাদেশ সেমিফাইনালের পথে এগিয়ে গেল ৬২ রানের জয় নিয়ে। ক্রিকেটে মাঠের খেলার মতো মনস্তাত্ত্বিক খেলাকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। তাই ম্যাচের আগেই প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে হারাতে বাংলাদেশকে নিয়ে বলেছিলেন নবী ও নায়েব। কিন্তু তাদের এই কথা সাকিবের ঘূর্ণিতে মোচড় নিয়ে যে আফগানিস্তানকেই ডুবিয়ে দেবে এটা কে জানতো? 
 
বাংলাদেশের জয়ে আফগানদের পাশাপাশি আরো একজন কষ্ট পেতে পারেন! তিনি আজকের ম্যাচের থার্ড আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করা আলিম দ্বার। আজ বাংলাদেশের প্রতিপক্ষের তালিকায় আফগানরা ছাড়াও এই আলিমদারও ছিলেন! নাহলে বল নিশ্চিত মাটি ছোয়ার পরও কীভাবে তিনি লিটন দাসের ওই আউটটি দিলেন? এই প্রসঙ্গে আলোচনা সহসাই শেষ হচ্ছে না। 
 
আজকের এই পরাজয়ে সাকিবের প্রতি কিছুটা অভিমান করতে পারেন আফগানরা। বিশ্বের দ্বিতীয় প্লেয়ার হিসেবে যে অর্ধশতক ও পাঁচ উইকেট নিয়ে একাই আফগানিস্তানকে বিধ্বস্ত করলেন সাকিব! বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার মাঠে নামা মানেই যেন নিত্য নতুন সব রেকর্ডের বন্যা বয়ে যাওয়া! বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের মালিকের আসন পুনরুদ্ধার করেছেন, বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে প্রথম নিয়েছেন পাঁচ উইকেট। বিশ্বের প্রথম খেলোয়ার হিসেবে এক হাজার (মোট ১০১৬ রান) রানের পাশাপাশি নিয়েছেন ৩০ (মোট ৩৩ টি) উইকেট। এই অলরাউন্ডারের কল্যাণেই কিনা আজ সারাদিন সাউদাম্পটনের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে রেখেছিলো বাংলাদের্শী সমর্থকেরা।
 
ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের যাত্রায় পুরো ইংল্যান্ডকেই মিরপুর বানিয়ে ফেলা বাংলাদেশি সমর্থকরা আজও ছিলেন চিরাচারিত উচ্ছল-প্রাণোজ্জ্বল। খেলা মানেই মাঠে উপচেপড়া দর্শকের উচ্ছ্বাসে চারপাশে প্রকম্পন। ইংল্যান্ড যে বিশ্বকাপের মতো এত বড় একটি আয়োজন করছে তা বাংলাদেশ কিংবা ভারতের দর্শকরা না এলে বোধহয় বোঝা যেত না। 
 
যেমন আজ হঠাৎ টিভি সেটের সামনে খেলা দেখতে বসলে খেলা ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে হচ্ছে নাকি মিরপুরের শের ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এ নিয়ে হতভম্ব হতে পারে যে কেউ। সেকি উচ্ছ্বাস, সেকি প্রাণোচ্ছলতা! দর্শকদের এই উল্লাস যেন বাংলাদেশের হারিয়ে যেতে বসা বোলিংয়ের ধারকে আরো ক্ষুরধার করে দিয়েছি। তাতে সাকিবের নেতৃত্বের তছনছ হয়ে গেছে আফগানিস্তানের ব্যাটিং দূর্গ। 
 
১০ ওভার বোলিং করে ২৯ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে সেনাপতির দায়িত্ব যথার্থই পালন করেছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।
 
তাতে আট ওভার বোলিং করে ৩২ রান দিয়ে দুই উইকেট নেওয়া মুস্তাফিজুর রহমান, ৩৩ রান দিয়ে এক উইকেট নেওয়া মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ও ছয় ওভার বল করে ২৫ রান দিয়ে এক উইকেট নিয়ে সাকিবকে যথার্থ সাপোর্ট দেন। উইকেট না পেলেও মেহেদী হাসান মিরাজ ও অধিনায়ক মাশরাফি বিন মতুর্জার বোলিংও ছিলো চোখে পড়ার মতো।
 
বাংলাদেশের করা ২৬২ রানের জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে বিনা উইকেটে ৪৯ রান তুলে আফগানিস্তান যখন চোখ রাঙ্গাচ্ছিলো ঠিক তখন ই সাকিবরে আঘাত। ১১ ওভারে এসে নিজের প্রথম ওভারেই ২৪ রানে ফেরান রহমত শাহকে। ৩১ বলে ১১ রান করা হাসমতুল্লাহ শহিদীকে ফেরান মোসাদ্দেক। ওপেনিংয়ে নেমে মাটি কামড়ে ধরে ব্যাট করে যাওয়া গুলবাদিন নাইবকে ফেরাতে অধিনায়ক মাশরাফি যে খেল দেখালেন তা দীর্ঘদিন মনে থাকবে ক্রিকেট ভক্তদের। সাকিবের বলে শর্ট মিড অফে লিটনকে নিয়ে এসেছিলেন মাশরাফি। নাইবের সাজোড়ে চালানো একটি শটে এক চোখের পলকে দুর্দান্ত একটি ক্যাচ নেন লিটন। আফগান অধিনায়ক ৭৫ বলে ৪৭ রান করে সাজঘরের পথ ধরেন। 
 
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানকে ফেভারিট তাকমা দেয়া নবী অবশ্য আজ পুরোপুরি ফ্লপ। ওই ওভারেই শূন্য রানে মোহাম্মদ নবীকে বোল্ড করেন সাকিব। সাকিবের ঘূর্ণি ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গোলে সরাসরি আঘাত হানে স্ট্যাম্পে। রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরের পথ ধরেন নবী। ততক্ষণে বাংলাদেশকে নিয়ে ডুবার স্বপ্নও ফিকে হওয়ার পথে। ইনিংসের ৩৩তম সাকিবের বলকে মিড উইকেট দিয়ে ছক্কা হাঁকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বসেন সাবেক আফগান অধিনায়ক আজগর আফগান। সাব্বির রহমানের ক্যাচে পরিণত হয়ে ৩৮ বলে ২০ রান করে সাঁজঘরে ফেরেন তিনি। এরপর সরাসরি থ্রোতে উইকেটরক্ষক ইকরাম আলি খিলকে সাজঘরে ফেরত পাঠান লিটন দাস। 
 
তবে সপ্তম উইকেটে পাল্টা প্রতিরোধের আভাস দেন সামিউল্লাহ শিনওয়ারি ও নাজিবউল্লাহ জাদরান। দুজন মিলে বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়ে ফেলেন ৫৬ রানের জুটি। তাদের প্রতিরোধ ভাঙতে ফের বল হাতে হাজির হন সাকিব। ইনিংসের ৪৩তম ওভারে সাকিবকে উড়িয়ে মারার চেষ্টা উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে আসেন নাজিবউল্লাহ। সুযোগের অপেক্ষায় থাকা মুশফিক বল গ্লাভসে জমিয়ে উইকেট ভাঙতে সময় নেননি একদমই। ১৮৭ রানে সাত উইকেট হারিয়ে ফেলে চোখে ষর্ষে ফুল দেখতে থাকা আফগানদের বিরুদ্ধে বাকি কাজটা সেরে ফেলেন মোস্তাফিজুর ও সাইফউদ্দিন।
 
এর আগে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের শুরু থেকেই জন্ম হয়েছে বিতর্কের। লিটন দাসের আউটসহ গোটা ম্যাচ জুড়ে বেশ কয়েকবার ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আম্পায়াররা। এরপর মুশফিক-সাকিব-মোসাদ্দেকদের দারুণ ব্যাটিংয়ে আফগানদের বিপক্ষে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৬২ রান তুলেছে বাংলাদেশ। কাছে গিয়েও সাকিব-মাহমুদ উল্লাহর মতো বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরি করতে পারেননি মুশফিকুর রহিম। তার ৮৩ রানের ইনিংসই ভিত গড়ে দিয়েছে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডের। শেষের দিকে মোসাদ্দেক পূরণ করেছেন তার দায়িত্ব। খেলেছেন দারুণ এক ক্যামিও ইনিংস।
 
সাউদাম্পটনের রোজ বোলে বৃষ্টি বিঘ্নিত টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ওপেনিং করতে নামলেন লিটন দাস। এতদিন প্রথম বলটি সবসময় তামিম খেলতেন; আজ খেললেন লিটন। কিন্তু তাকে ঘিরেই শুরু হলো বিতর্ক। 
 
মুজিব-উর-রহমানের বলে শর্ট কাভার থেকে ক্যাচ নেন হাশমতউল্লাহ শহিদি। ফিল্ড আম্পায়ার নিশ্চিত ছিলেন না আউট নিয়ে। তাই ডাকা হয় তৃতীয় আম্পায়ার। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায়, বলটি শহিদির হাত ছুয়ে মাটি স্পর্শ করেছে। শেষ পর্যন্ত 'বেনিফিট অব ডাউট' আইন না মেনেই লিটনকে (১৬) আউট দেন টিভি আম্পায়ার আলিম দার।
 
লিটন দাসের বিতর্কিত আউটের পর জুটি বেঁধে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মিশনে ছিলেন তামিম ইকবাল এবং বিশ্বসেরা অল-রাউন্ডার সাকিব আল হাসান। দুইজনের জুটিতে এসে গিয়েছিল ৫৯ রান। তখনই ছন্দপতন। মোহাম্মদ নবির বলে বোল্ড হয়ে যান ৫৩ বলে ৩৬ রান করা তামিম ইকবাল। রশিদের বলে সাকিবের বিপক্ষেও এলবিডাব্লিউয়ের আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন আম্পায়ার। তবে রিভিউ নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য করে বাংলাদেশ। মুশফিকের সঙ্গে দারুণ জুটি জমে গিয়েছিল সাকিবের। এরপর চলতি বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন সাকিব।
 
৬৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি করার পর ৪ বাউন্ডারিতে ৫১ রানেই মুজিব উর রহমানের দ্বিতীয় শিকার হন বিশ্বসেরা অল-রাউন্ডার। মুশফিকের সঙ্গী হন সৌম্য সরকার। ভাঙে ৬১ রানের তৃতীয় উইকেট জুটি। পাঁচে নামা সৌম্য সরকার ভুমিকা রাখতে পারেননি। মুজিবের বলে এলবিডাব্লিউ হয়েছেন ৩ রানে। রিভিউ নিয়েও সিদ্ধান্ত পাল্টানো যায়নি। ভায়রা ভাই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান মুশফিক। ৫৬ বলে ক্যারিয়ারের ৩৫তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। জুটিতে ৫৬ রান আসার পর গুলবাদিন নাইবের বলে ২৭ রানে আউট হয়ে যান মাহমুদউল্লাহ।
 
উইকেটে এসে মুশফিককে দারুণ সঙ্গ দেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। তার ব্যাটে ছুটে স্ট্রোকের ফুলঝুরি। বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মুশফিক। ওভারও কমে আসছিল। ৪৯তম ওভারে রান তোলার তাড়া থেকেই দৌলত জারদানকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে মোহাম্মদ নবির তালুবন্দি হন ৮৭ বলে ৪ চার ১ ছক্কায় ৮৩ করা মুশফিক। গুলবাদিন নাইবের করা ইনিংসের শেষ বলে বোল্ড হওয়ার আগে মোসাদ্দেক খেলেন ২৪ বলে ৩৫ রানের ক্যামিও ইনিংস। নির্ধারিত ৫০ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ২৬২ রান।
 
আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই জয়ে এখন সেমি ফাইনালের আশা জিইয়ে রাখল বাংলাদেশ। সামনের ম্যাচের জন্য প্রস্তুতির আগে চোখ রাখতে হবে আগামিকাল অনুষ্ঠিতব্য ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের প্রতিও। বাংলাদেশের সেমি ফাইনালের স্বার্থেই ওই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সমর্থনে থাকবে পুরো বাংলাদেশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা